রাজনেতারা চান, সবসময় তাঁর পক্ষেই লেখা হবে


’৮৪ সালে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেছিলাম । তিন তিনটি দশক অতিক্রান্ত। এখন মনে হচ্ছে, যেন থামতে পারি সমে এসে! থামতে জানা এক বিরাট শিল্পকলা।

আরে, আপনারা সাংবাদিক, আপনারা তো উকিলের মতো, আপনারা তো অবসর নেন না! এখন আমার বয়স ৫৬। ৬০ বছরে অবসর নেব না? আপনি তো এক্সট্রা ইনিংস খেলবেন! জানি না, অবসরগ্রহণের সময় যখন সত্যি সত্যি আসবে তখনও যে কোনও গৃহী মানুষের মতো বাসনাকামনার অক্টোপাসে জড়িয়ে বলব কি না, এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না! কিন্তু এখন মনে হয়, নিত্য দিনের সক্রিয় সাংবাদিকতা করে আর যাই হোক, গভীর ভাবে অধ্যয়ন করা যায় না!

কখনও কখনও সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক, সিটিজেন সাংবাদিকতা দেখে মনে হয়, সাংবাদিকতার মৃত্যু হল না তো! আবার এই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমই তো আমরা অনেক ভাল কিছুও জানতে পারি। এতে সমাজের অনেক কল্যাণও হচ্ছে। ‘দ্য ওয়্যার’ নামক ওয়েবসাইটে করণ থাপারের একটা ভিডিও ইন্টারভিউ নিয়েছেন সিদ্ধার্থ বরদারাজন। করণ সেখানে বলেছেন, আজকাল প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনও আলোচনা, কোনও চ্যালেঞ্জ নেই। ইন্টারভিউতে কোনও সাপ্লিমেন্টারি প্রশ্ন নেই। একনাগাড়ে প্রধানমন্ত্রী বলে যাচ্ছেন, অনেকটা জনসভার বক্তৃতার মতো! হায়! এটাই কি আধুনিক সাংবাদিকতা?

আমার খুব মন খারাপ। আজ আমি যাহা বলিব সত্য বলিব। দিল্লিতে আমি এসেছি ’৮৭ সালে। এখনও মনে পড়ে প্রথম যে দিন পান্ডারা পার্কে আডবাণীজির বাড়ি গিয়েছিলাম।

কমলাজি কী যে স্নেহ আর ভালবাসা দিয়ে আমাকে বেঁধে দিয়েছিলেন! আমি একদিন বললাম, আডবাণীজি, আমি কিন্তু মেড ইন কলকাতা ইউনিভার্সিটি। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র। মরিস কর্নফোর্থ পড়ে বড় হয়েছি। কী করে বিজেপির সমর্থক হই?

আডবাণী বললেন, কেন? স্বপন, চন্দনও তো বাঙালি! ওরা কী করে বিজেপি সমর্থক? আমি বললাম, ওরা সেন্ট স্টিফেন্স। অক্সফোর্ড। দেখুন, অক্সফোর্ড থেকেও হিন্দুত্ববাদী বেরোতে পারে! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসম্ভব! আডবাণী হেসে বলেছিলেন, কোই বাত নেহি বেটা, লেকিন বিজেপি রাজনীতি ভি পত্রকারকে নাতে তুমহে সমঝনা চাহিয়ে!

ঠিক বলেছিলেন তিনি। আমি দেখেছি নরেন্দ্র মোদীকে কী ভাবে সমর্থন করেছেন তিনি। এখন সে সব কথা বলার সময় নয়। কিন্তু এটুকু বলবই, সাংবাদিকদের বিরাট সমস্যা, সংবাদ সংগ্রহের জন্য রাজনেতাদের কাছে আসতে হয়। কিন্তু রাজনেতারা চান, আমরা সবসময় তাঁর পক্ষেই লিখব! সমালোচনা করা চলবে না!

যেমন ধরুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রতিপক্ষরা ফেসবুক, টুইটে তাঁর বিরুদ্ধে কী না বলে! আমি ১৯৮৪ থেকে তাঁকে দেখছি। তখন আমি বরুণ সেনগুপ্তের ‘বর্তমান’ কাগজে। কিন্তু তিনি যখন রেলমন্ত্রী, তখন বিভিন্ন সময়ে তাঁর সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখা লিখেছি। সে রকম লেখা বেরোলেই ক্ষিপ্ত হয়ে যেতেন দিদি। তখন ‘বর্তমান’ কাগজে প্রতি শনিবার আমার কলম বেরোতো। দিল্লির রাজনীতি। তাতে লিখলাম মমতার রাজনীতির দুর্বলতা। ঘটনাচক্রে সে দিন দিল্লিতে মমতার ফ্ল্যাটে আমার লাঞ্চ করার কথা। মেনু ছিল খিচুড়ি। তখন ওঁর সহকারী ছিলেন সোনালী গুহ, পরে যিনি বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হলেন। সোনালী আমাকে ফোন করে বললেন, ‘‘জয়ন্তদা, আজ আর খেতে আসবেন না। আপনার লেখা শুনে সকাল থেকে খুব রেগে আছে।’’ আমাদের সাংবাদিকদের আর এক সমস্যা হল, আমি কোনও সমালোচনামূলক লেখা লিখলে সেটা সেই রাজনেতাকে আমার আগেই অন্য সাংবাদিকরা জানাবেন। সে দিন সোনালীকে বললাম, আমি কিছু জানি না, আমার খুব খিদে পেয়েছে। খিচুড়ি খাবো বলে বসে আছি। আমি আসছি। গেলাম রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালের উল্টো দিকে এম এস ফ্ল্যাটে মমতার কাছে। প্রথম দিকটায় একটু রাগ রাগ ভাব ছিল। পরে দেখলাম, একদমই স্বাভাবিক। আগে মমতা রেগে যেতেন বেশি, কিন্তু তাৎক্ষণিক রাগ পড়তেও বেশি সময় লাগত না।

সাংবাদিক এবং রাজনেতার জীবনে পারস্পরিক সম্পর্কে এই রৌদ্র-ছায়া চলতেই থাকে। এখন তো মনে হয়, আমাদের জীবনটাও সেমি পাবলিক লাইফ। লিখলাম, বাজপেয়ী কী ভাবে আমাদের সঙ্গে নিয়ে বিদেশ যেতেন, সে সব দিনের অভিজ্ঞতা। মোদীজি এসে সাংবাদিকদের তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে এক ফেসবুক বন্ধু বললেন, এ বার বুঝলাম, মোদীর বিরুদ্ধে জয়ন্ত ঘোষাল কেন এত সোচ্চার? তথাগত রায় রাজ্যপাল, তা মহামহিম এই নগণ্য সাংবাদিকের ওপর করা সে মন্তব্যটি দিলেন টুইট করে! এখন আমি কী করে বোঝাই, আমরা যে বিদেশ যেতাম সেটার জন্য সরকার নয়, ব্যাপক খরচ দিত আমাদের কোম্পানি! এটা বিনি পয়সারও ভোজ ছিল না! তাই প্রশ্নটা বেড়ানো নয়, বিষয়টা হল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এখনও মিডিয়া প্রতিনিধি দল নিয়েই যাতায়াত করেন। তিনি এত মিডিয়া বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও!

আসলে একমুখী টুইট, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ, ফেসবুক, ওয়েবসাইট— এ সবে রাজনেতা সেটাই জানান যেটুকু তিনি জানাতে চান। কিন্তু প্রয়োজন কথোপকথন, প্রশ্ন-উত্তর।

খবর সংগ্রহের জন্য রাজনেতাদের ঘনিষ্ঠ হওয়া সাংবাদিকতার পুরনো অভ্যাস। আমি বরুণ সেনগুপ্তর ক্ষেত্রে দেখেছি, একইসঙ্গে প্রমোদ দাশগুপ্ত এবং অতুল্য ঘোষ, দু’জনের সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক রাখতেন। সে দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটা সম্ভব ছিল। আজকাল রাজনৈতিক পরিবেশটা অসহিষ্ণু হয়ে গেছে। কোনও সাংবাদিক মমতার ঘনিষ্ঠ হলে তাঁর পক্ষে অধীর চৌধুরী বা সূর্যকান্ত মিশ্রর ঘনিষ্ঠ হওয়া কেন সম্ভব হবে না?

আজকাল নতুন প্রজন্মের কার্যপদ্ধতিটা আরও আলাদা। তাঁরা ব্যক্তিগত সম্পর্ক চাইছেনই না! তাঁরা নেট-এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের মায়াজালে না জড়িয়ে স্বাধীন ভাবে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা করছেন। একদম ব্যক্তিগত সম্পর্ক না রাখা এক চরম অবস্থান। তবে সাংবাদিক জীবনের শেষে লগ্নে এসে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ‘ক্রোনি সাংবাদিকতা’ আর করব না।

অল্প বয়স যখন ছিল তখন মন্ত্রী বা রাজনেতাদের গাড়িতে ওঠা, তাঁদের সঙ্গে ওঠা-বসা— এ সব মনে হত সাংবাদিক হিসেবে বড় পাওয়া। আমি যদি আপনার পক্ষে লিখি আপনি আমাকে আপনার সঙ্গে দেশে-বিদেশে নিয়ে যাবেন। আপনার ব্যাপারে সমালোচনা করলে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকেও আমন্ত্রণপত্র আসা বন্ধ হয়ে যাবে! এমনকি, বিদেশ ও অন্য মন্ত্রক আপনাকে কোনও আমন্ত্রণ জানাবেই না! এটা ঠিক নয়। কিন্তু এখন মনে হয় আমাকে যদি সরকারি অনুষ্ঠানে না ডাকা হয় তবে তাতে তো কোনও অসম্মান নেই!

আমার সম্মান আমার লেখায়, আমার খবরে, আমার প্রকাশে। রাজসভার কবিকে রাজার সঙ্গে জনসংযোগ রক্ষা করতে হয় বলে কি করতে হয় ‘ক্রোনি’ সাংবাদিকতা!

এই বয়সে কোনও দল কোনও নেতার জন্য সে সাংবাদিকতা করতে চাই না!

করলে সে হবে এক মস্ত বড় অভিশাপ!