বহুত্ববাদের পরিসর ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে

পদ্মাবতীর সেটে রাজপুত করণী সেনার হামলা। চলছে ভাঙচুর। —ফাইল চিত্র।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হল কথোপকথন। ডায়ালগ। সক্রেটিস পদ্ধতি বলি আমরা। কিন্তু বৈদিক যুগে ভারতীয় পরম্পরায় গুরুশিষ্যের আলোচনাও ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেই কথোপকথন, যা সব সময়েই উভমুখী, একমুখী নয়, তা কি এই যুগে এই সমাজে অপসৃয়মান ঘটনা?

এই ক’দিন আগেই দিল্লির মিনি কলকাতা চিত্তরঞ্জন পার্কে চিত্তরঞ্জন ভবনের মেম্বারস লাউঞ্জে সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক আশিস নন্দীর কথা শুনছিলাম। এই আলোচনা সভায় আশিসবাবু বললেন, পঞ্চাশের দশকে আমেরিকায় এ ব্যাপারে একটি সমীক্ষা হয়। এই সমীক্ষা থেকে জানা যায়, শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ কথোপকথনে সক্রিয়। রাস্তাঘাটে, লিফটে, বাজারে-ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে মানুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু ৯০-এর দশকে আবার যখন মার্কিন মুলুকে একই রকম সমীক্ষা হল, তখন দেখা গেল, তার রিপোর্টে বলা হচ্ছে, শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ কথোপকথনে বিশ্বাস করছে না। সবটাই এক একমুখী প্রক্রিয়া। হয় রেডিও, নয়তো টিভি বা অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়ার সঙ্গে চলছে এক একমুখী সংযোগ। আশিসবাবু মনে করেন এই পরিবর্তন বিংশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দীতে নিয়ে এসেছে মানুষের নানা সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা।

প্রথমে মানুষ শিকার হত, স্কিজোফ্রেনিয়ায় বহির্মন ও অন্তর্মনের সংঘাত হত। তারপর এখন তার বদলে এসেছে হতাশা। সমাজে কি তবে উন্মাদের সংখ্যাও এই কারণে বাড়ছে? শুচিবায়ুগ্রস্ততা থেকে মানসিক নিঃসঙ্গতা!

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন মেমোরিয়াল সোসাইটির কর্ণধার জয়ন্ত রায়চৌধুরী এই বাঙালিপাড়ায় একটি মেম্বারস লাউঞ্জ তৈরি করে প্রবাসী বাঙালিদের এই কথোপকথনের একটি পরিসর তৈরি করেছেন। ‘এক এবং দশ’ সাহিত্য পাঠচক্র-র কর্ণধার হিমাদ্রী দত্ত এখানে নিয়মিত বিবিধ বিষয়ে চা-কফি সহযোগে আড্ডার ব্যবস্থা করেছেন। সে দিন আশিস নন্দী ছিলেন প্রধান বক্তা। কিন্তু উপস্থিত ছিলেন আর এক তারকা বঙ্গললনা তসলিমা নাসরিন। ভাল লাগছিল প্রবাসে বাঙালি অন্তত এই পারস্পরিক কথোপকথনের পরিসরটি তৈরি করেছে। বাঙালিদের অধিকাংশ অ্যাসোসিয়েশনে দেখি আলোচনার পরিবর্তে দাদাগিরি এবং বাণিজ্য স্বার্থ। এখনও পর্যন্ত এই মঞ্চে সেটা দেখিনি।

আলোচনা সভার ফাঁকে আশিস নন্দী এবং তসলিমা নাসরিন। —নিজস্ব চিত্র।

আশিসবাবু বলছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে সাড়ে ২২ কোটি মানুষের হত্যা হয়েছে হিংসার কারণে। আর অদ্ভুত ঘটনা হল, এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ হত্যা হয়েছে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ’৪৩-এর মন্বন্তরে মৃত্যু হয় তখন ৩০ লক্ষ মানুষের। বিশ্বযুদ্ধে মৃত্যু হয় দশ-পনেরো কোটি। গণহত্যার তথ্য নিয়ে রাসেল অনেক কাজ করেছেন বলে জানালেন আশিসবাবু।

পৃথিবীর প্রথম সংবিধান রচনা করেছিলেন জেফারসন। সেই জেফারসনের বাড়িতেই অনেক ক্রীতদাস ছিলেন। এমনকী, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি দাসেদের যৌন উৎপীড়নও করতেন। ‘জেফারসন ইন প্যারিস’ নামে একটি ছবিও তৈরি হয়। আসলে অতীতে মানুষ যখন মানুষের ওপর অত্যাচার করে হিংসা চালায় তখন সেই কাজের বৈধতা প্রদানের জন্য মনে করা হয় দাস Subject বা হল মনুষ্যতর জীব Subhuman। মানুষকে Subhuman বলে চিহ্নিত করা হলে মানুষ মানুষের ওপর অত্যাচার করার বৈধতা পায়। দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, এ ভাবে একদা আফ্রিকায় দাসেদের ওপর আমেরিকানরা অত্যাচার চালাতে পেরেছিল। ম্যাকিয়াভেলি মানুষকে Poor brutish small nasty বলাতেও এই হিংসা প্রয়োগের বৈধতা পাওয়া যায়।

আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সুইডেনবাসী শান্তনু দাশগুপ্ত। তাঁর সঙ্গে আশিসবাবুর বাদানুবাদও হল। আশিসবাবু বলছেন এখন ধর্মের চেয়েও বিজ্ঞানের নামে হিংসা হচ্ছে বেশি। শান্তনুবাবু বললেন, বিজ্ঞান দায়ী নয়, বিজ্ঞানী বা কিছু মানুষ, তাঁদের রাজনীতি দায়ী। তসলিমা শান্তনুবাবুকে সমর্থন করলেন। তসলিমা বললেন, যে ভাবে হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা সোচ্চার হন সে ভাবে ভারতে ইসলাম মৌলবাদীদের সমালোচনা হয় না। এর ফলে সাম্প্রদায়িক হিংসা আরও বাড়ছে।

অমর্ত্য সেন বলেছেন, আসলে মানুষের অনেকগুলি সত্তা। অন্য মানুষের সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার না করলেই হিংসা। সব হিংসায় রক্তপাত দেখা যায় না। অনেক হিংসা অদৃশ্য। এই যে আমাদের দেশে গত আড়াই বছরে মোদীর রাজত্বে বহুত্ববাদের পরিসর ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে। এখানেও চালু হয়েছে একমুখী আলোচনা। একে ডায়ালগ বলে না। ওহে শোনো, আকবরকে রানাপ্রতাপ হারিয়েছিলেন। টেক ইট ফ্রম মি। পদ্মিনী ঐতিহাসিক চরিত্র। এ সবই এখন বিকল্প তথ্য? এ হল Post truth era?

অমর্ত্য বলেছেন, এ হল সত্যের বিকৃতির সময়। এই সময়কে Post truth বলা মানে এই সময়টাকে বেশি গৌরবপ্রদান করা। পোস্ট মডার্নিজম, পোস্ট-রেনেসাঁ, পোস্ট ইউক্লিড— এ সবের অর্থ বিয়ন্ড মডার্নিজম বা রেনেসাঁ বা ইউক্লিডদশান। সত্যের ঊর্ধ্বে কিছু থাকতে পারে না। অসত্য সত্য পরবর্তী অধ্যায় হতে পারে না। আশিসবাবু অবশ্য বলছিলেন মানুষের প্রবৃত্তির মধ্যেও জৈব কারণে হিংসা আছে। সেই ব্যাখ্যায় সব সময় বহু পরিচিতির প্রতি অসহিষ্ণুতাকেই একমাত্র হিংসার প্রধান কারণ বলা যায় না।

আশিসবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বিংশ শতাব্দীর কাছ থেকে প্রাপ্তির হিসেব নিকেশ করে একবিংশ শতাব্দীর পথে যাত্রাকালে আপনি কি হতাশ? আশিসবাবু বললেন, তিনি হতাশ।

তসলিমা অবশ্য ভিন্ন সুরে বললেন, না তিনি আজও আশাবাদী। দাঙ্গা আসলে কমছে। নারীদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ বাড়ছে। তবে কি শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর নয়? ও আলোর পথযাত্রী আপনার মত কী?

(এখন থেকে ‘শাহি সমাচার’ বুধবারের পরিবর্তে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হবে।)