Samik Bhattacharya

ব্যবস্থা আইনি পথেই, ‘কৌশল’ শাসক দলের

অষ্টাদশ বিধানসভার শুরুর দিন, স্পিকার নির্বাচনের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, ২০২১-এর ভোট পরবর্তী ‘সন্ত্রাসে’র ঘটনায় যাঁদের নাম আছে, তাঁদের ‘সরাসরি জেলে ভরা হবে’।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৯:০২
Share:

শমীক ভট্টাচার্য। — ফাইল চিত্র।

ভোট-প্রচারের সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব ফলপ্রকাশের পরে ‘ডিজে বাজানো’র হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। উল্টো দিকে, বিজেপির দুই শীর্ষ নেতাকে এক কর্মী বলেছিলেন, ‘ফল বেরোনোর ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত নেতাদের বলব, ফোন বন্ধ রাখতে। ওই সময়টা কর্মীদের।’ কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পরে দেখা গেল, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বার বার শান্তির কথা বলেছেন। তবে তোলাবাজি, ২০২১-এর ভোট পরবর্তী হিংসার মতো নানা অভিযোগে রাজ্য জুড়ে তৃণমূল নেতাদের ধরপাকড় চলছে। শাসক শিবির সূত্রের বক্তব্য, এই ‘কৌশলে’র মাধ্যমে বিজেপি আসলে জোড়া বার্তা দিচ্ছে— এক, আইন হাতে না-তুলে না নিয়েও ‘অভিযোগের’ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। দুই, ক্ষমতায় এসেও দলীয় নেতৃত্ব কেন পুরনো শাসকের ' অত্যাচারের ক্ষেত্রে নরম ' মনোভাব নিচ্ছেন, এই প্রশ্ন তুলে বিজেপির নীচের তলার একাংশের যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তাকেও প্রশমন করা যাচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিজেপির আইনজীবী নেতাদের (যাঁরা অনেকে নবনির্বাচিত বিধায়ক) ‘সক্রিয়তা’ও দেখা যাচ্ছে।

অষ্টাদশ বিধানসভার শুরুর দিন, স্পিকার নির্বাচনের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, ২০২১-এর ভোট পরবর্তী ‘সন্ত্রাসে’র ঘটনায় যাঁদের নাম আছে, তাঁদের ‘সরাসরি জেলে ভরা হবে’। এই আবহে পুরনো অভিযোগ, মামলাকে আইনি-ব্যবস্থার আওতায় এনে পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিচ্ছেন বিজেপির আইনজীবী নেতারা। আইনজীবী তথা বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী বলেছেন, “পুলিশ আগে তৃণমূলের কথায় চলেছে। বিরোধীদের অভিযোগ শোনেনি। আমরা কিছু ক্ষেত্রে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি, কিছু অভিযোগের চিঠি রেখে দিয়েছি। অন্যায়ের শাস্তি হবে।” একই সুরে আর এক আইনজীবী তথা বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারির অভিযোগ, “২০২১-এর ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের ঘটনায় পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই এফআইআর নেয়নি। এখন তা নিচ্ছে। আইনি পথেই সমাধান হবে।” মুখ্যমন্ত্রীর ভবানীপুরের নির্বাচনী এজেন্ট তথা আইনজীবী সূর্যনীল দাসও বলেছেন, “অনেক নথিভুক্ত মামলা ছিল, সেগুলি ফের উঠবে।”

গত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গে ভোট-পরবর্তী হিংসার ছবি বন্ধে এ বার গোড়া থেকেই তৎপর ছিলেন ‘নতুন শাসক’ বিজেপির নেতৃত্ব। রাজ্যের মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া শনিবারও বলেছেন, “কাউকে দু’টো থাবা মারলে, কারও বাড়ির টালি বা জানলার কাচ ভাঙলে প্রকৃত প্রতিশোধ নেওয়া হয় না। বরং, যাঁরা অত্যাচার করেছেন, তাঁদের ক্ষমা করে দিলে, সেটাই সব চেয়ে বড় প্রতিশোধ। ক্ষমার দংশন সারা জীবন তাঁদের তাড়া করবে।” এর সঙ্গেই, তাঁর সতর্ক অবস্থান, “দীর্ঘ দিন যাঁরা কষ্ট পেয়েছেন, তাঁরা আবেগতাড়িত হতে পারেন। কিন্তু নতুন সরকার প্রতিহিংসার রাজনীতি চায় না। উন্নয়নই লক্ষ্য।”

সূত্রের দাবি, দলের তাবড় নেতৃত্বের ‘আইন হাতে তুলে না-নেওয়া’র বার্তা নিয়ে ‘চাপা ক্ষোভ’ তৈরি হয়েছিল বিজেপির কর্মী-মহলে। এই জায়গা থেকেই সক্রিয় হয় নবগঠিত সরকারের পুলিশ-প্রশাসন। পুরনো মামলার সঙ্গেই এত দিন ‘সযত্নে রেখে দেওয়া’ ২০২১-এর ‘সন্ত্রাসে’র নানা অভিযোগপত্র ফের সামনে আনা হচ্ছে। নতুন করে এফআইআর দায়ের হচ্ছে। নানা স্তরের তৃণমূল নেতাদের আইনি পদ্ধতিতে গ্রেফতারও হতে দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র তথা আইনজীবী দেবজিৎ সরকারের বক্তব্য, “ফৌজদারি মামলা কখনও তামাদি হয় না। অপরাধী যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না-কেন, মামলা শুরু করে তাঁর শাস্তি হবেই।”

এই ধারাতে প্রশাসনিক ‘সক্রিয়তা’ দিয়ে জন-‘আবেগ’কে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি তৃণমূলের ওয়ার্ড সভাপতি স্থানীয় বাজারে গেলে দোকানদারেরা এত দিন যে ‘তোলা’ দিয়েছিলেন, তা ফেরত চান। চলে ‘হেনস্থা’ও। খবর পেয়ে ওই নেতাকে উদ্ধার এবং পরে গ্রেফতার করে পুলিশ। যুব তৃণমূলের এক নেতার ঘরে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল বিজেপির কয়েক জনের বিরুদ্ধে। নেতা এলাকা ছেড়ে পালান। পরে তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং তোলাবাজি-সহ নানা অভিযোগে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। এমন একের পর এক ঘটনা দেখে ‘খুশি’ বিজেপির স্থানীয় স্তরের নেতা-কর্মীরাও। তাঁদেরই এক জনের বক্তব্য, “তৃণমূল যা অতীতে করেছে, আমরাও সেটা করলে, মানুষের কাছে খারাপ বার্তা যেতে পারে। বরং, যাঁরা অত্যাচার করেছেন, তাঁদের আইনি ভাবেই হাতের বদলে ভাতে মারার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

জোর দেওয়া হচ্ছে দলীয় শৃঙ্খলাতেও। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নির্দেশে তৃণমূলের দলীয় দফতর দখল ও তোলাবাজিতে অভিযুক্ত বিধাননগরের সুকান্তনগর এলাকার চার জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পরে পুলিশ তাঁদের গ্রেফতারও করেছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন