(বাঁ দিকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুভেন্দু অধিকারী (ডান দিকে) —ফাইল চিত্র।
বিধানসভা ভোটে পর্যুদস্ত হওয়ার তিন সপ্তাহ পর নয়া অভিযোগ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি আবার দাবি করেছেন, তৃণমূল বিধানসভা ভোটে হারেনি। মানুষ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের হারানো হয়েছে। বিজেপিকে সাহায্য করেছে নির্বাচন কমিশন। এমনকি, ভবানীপুরেও তাঁকে জোর করে হারানো হয়েছে। এ নিয়ে আদালতে যা বলার বলবেন। রবিবার ফলতা উপনির্বাচনের ফলঘোষণার দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বিঁধে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ভবানীপুরে কী ভাবে জিতেছেন? সেটা আদালতে বলব। আপনার যদি সাহস থাকে তো ফরেনসিক রিপোর্ট করান। ইভিএমের রিপোর্ট চাই আমাদের।’’
তৃণমূলনেত্রীর অভিযোগ, ক্ষমতাবলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের উপর সন্ত্রাস চালাচ্ছে বিজেপি। তৃণমূলের নেতা-কাউন্সিলরদের গ্রেফতার করছে অধিকারীর পুলিশ। লুট হয়েছে তৃণমূলের প্রায় ২ হাজার কার্যালয়। মমতার কথায়, ‘‘যদি চেয়ার বলে, আমি আড়াই হাজার লোককে জেলে পুরব, তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের জন্য আলাদা জেল তৈরি হয়েছে... আমি তো মনে করি, তার আগে জেলে যাওয়া উচিত। সারদা থেকে নারদা, কোথায় নেই তিনি? আজ যাঁরা অর্ডার দিচ্ছেন, তাঁরাই তো আউট অফ অর্ডার!’’
ভোটের ফলপ্রকাশের ২০ দিন পর সমাজমাধ্যমে মমতার বার্তা, ‘‘চার তারিখে কাউন্টিং (গণনা) হয়েছে। আজ ২৪ তারিখ। এই ২০ দিন মুখ বুজে সহ্য করেছি। শুধু আমি নয়, বাংলার মানুষ থেকে তৃণমূলের কর্মীরা সহ্য করছেন। অনেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন। ১২ জন মানুষ মারা গিয়েছে। আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন। সকলকে জোর করে পদত্যাগপত্র লিখিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইলেক্টেড বডিগুলোকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কলকাতা কর্পোরেশনের মতো বড় কর্পোরেশনের জল, রাস্তা-সহ বিভিন্ন উন্নয়নের কাজে বাধা আসছে।’’
‘মুখ্যমন্ত্রী’ শুভেন্দুর সমালোচনা করে মমতা বলেন, ‘‘আমিও প্রশাসন চালিয়ে এসেছি। আমরা উর্দিধারীদের কখনও বলিনি এই সব কাজ করতে। আমরা ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মোড়ে মোড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজিয়েছিলাম। আজ একটা মিটিং করতে গেলে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। প্রতি দিন আমাদের নির্বাচিত কাউন্সিলরদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। মিউনিসিপ্যালিটির ঘরগুলো গুন্ডারা দখল করছে। আড়াই হাজারের বেশি পার্টি অফিস লুম্পেনেরা দখল করেছে পুলিশকে সামনে রেখেই। পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গেলে বলছে, ইনস্ট্রাকশন আছে!’’
মমতা আবার অভিযোগ করেছেন, এ বার বিধানসভা নির্বাচন সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ ভাবে হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘‘প্রথম কথা, কোনও রাজ্যে লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি হয়নি। শুধু এ রাজ্যেই হয়েছে। জেনেশুনে ৬০ লক্ষ লোকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। আমরা লড়াই করে ৩২ লক্ষের নাম তুললেও ২৭ লক্ষ এবং পরে বিজেপি আরও সাত লক্ষ নাম জমা দিয়েছিল। তার পর রিগিং হয়েছে। আমাদের কাছে স্পেসিফিক খবর আছে, সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিশনের অফিস থেকে ‘ডেটা হ্যাকিং’ করা হয়েছে। খবরগুলো এক এক করে কানে আসছে। বিজেপির লোকেরা সিআরপিএফের ড্রেস পরে কাউন্টিং হলে ঢুকে গিয়েছে। পরিকল্পিত ভাবে মিডিয়া দিয়ে আগেভাগে ২০০ আসনে জিতিয়ে দেওয়া...সকলেই জানেন।’’ তৃণমূলনেত্রীর সংযোজন, ‘‘যিনি এখন চেয়ারে বসেছেন, তাঁর তো ওই চেয়ারে বসারই কথা নয়। ভোটলুট করে রাজশাসনে বসেছেন। তিনি কী করে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বুঝবেন। তৃণমূল কংগ্রেস দেখলেই কয়েকটা লুম্পেন চোর-চোর বলে বেড়াচ্ছে। এরা বাংলার লোক নয়, বহিরাগত। ক্ষমতায় এসে বুলডোজ়ার চালিয়ে মানুষের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে!’’
তিনি যে বিধানসভার প্রার্থী ছিলেন, সেই ভবানীপুরেও ভোট লুট হয়েছে বলে আবার অভিযোগ করেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘আপনারা এজেন্টদের আইডি কার্ড কেড়ে নিয়েছেন। আমার কেন্দ্রে আমি যখন খবর পেয়ে গেছি... আমি ১৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলাম।’’ নাম না-করে শুভেন্দুকে নিশানা করেন তিনি। বলেন, ‘‘ যিনি এখন গদিতে বসেছেন, তাঁর নাম করতে আমার ভাল লাগে না। তাঁকে আমরা অনেক দিন ধরে চিনি। তিনি নিজে বসে লুট করছিলেন। আমাকে ঘাড়ধাক্কা দিতে দিতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ মমতার দাবি, ‘‘হারের জায়গায় জেতা, জেতার জায়গায় হারা, এই পাশাটাই উল্টেছে প্রায় দেড়শো সিটে। সেটা না হলে আমরা ২২০ থেকে ২৩০ আসন পেতাম।’’
শুভেন্দুর প্রশাসনকে নিশানা করেছেন মমতা। তাঁর দাবি, তৃণমূল আমলের প্রকল্পের সমালোচনা করে এখন সেগুলোই নাম বদলে রাখা হচ্ছে। আবার তাঁর আমলে সরকারের কাজকে এখনকার বলে দাবি করছে বিজেপি। মমতা বলেন, ‘‘আপনারা গড়তে পারেন না। আপনারা শুধু ভাঙতে জানেন। আমরা গড়ে এসেছি। অনেক কিছু বন্ধ করে দিয়েছেন। মে মাসে কেউ লক্ষ্মীর ভান্ডার পায়নি। পরের মাস থেকে দু’ মাস, তিন মাস দেবে। তার পর অন্ধকার অন্ধকারেই থেকে যাবে।’’ মহার্ঘ ভাতা প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘‘বলা হয়েছিল, পয়লা এপ্রিল থেকে সরকারি কর্মচারীরা ডিএ পাবেন। মে মাস হল, আপনারা বললেন সপ্তম পে কমিশন আপনারা করলেন। আমরা বাজেটে ঘোষণা করেছিলাম। এ জন্য ক্যাবিনেট রয়েছে। এগুলো সব ধার্য হয়েছিল। আমাদেরই করে যাওয়া জিনিসগুলোকে নানা নাম দিচ্ছেন।’’