প্রতীকী ছবি।
প্রেম টিকিয়ে রাখতে মোবাইল আসক্তির এক ভয়ঙ্কর টানাপড়েনই কি ডেকে আনল প্রথম শ্রেণির ছাত্রীর মৃত্যু? নদিয়ার কৃষ্ণনগরের এক মিশনারি হস্টেলে সাত বছরের কিশোরীর খুনের তদন্তে নেমে এ বার এমনই এক সূত্র খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ জানতে পেরেছে, ধৃত দুই নাবালিকার মধ্যে এক জনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কৃষ্ণনগরে বাড়িতে থাকাকালীন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সেই প্রেমিকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখত সে। কিন্তু হস্টেলের চার দেওয়ালে বন্দি হতেই সেই সম্পর্কে আকস্মিক ছেদ পড়ে। নিয়মের বেড়াজাল টপকে চুরি করে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওই সাত বছরের খুদেই কি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল? সেই বাধা সরিয়ে দিতেই নৃশংস খুন কি না, তা-ই এখন তদন্তকারীদের আতশকাচের তলায়।
তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ঘরছাড়া ও পরিবার-বিচ্ছিন্ন অভিযুক্ত ওই কিশোরীর সঙ্গে এক তরুণের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কৃষ্ণনগরে নিজের বাড়িতে থাকার সময় পরিবারের অলক্ষ্যে ফোনে দিন-রাত কথা চলত সেই প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু মাস ছয়েক আগে যখন তাকে এই আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়, তখন থেকেই ওলটপালট হয়ে যায় চেনা ছন্দ। কড়া অনুশাসনের হস্টেলে মোবাইল রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও গোপনে প্রেমিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালাত ওই কিশোরী। পুলিশের অনুমান, ঘটনার দিন বা তার আগে অভিযুক্ত কিশোরীদের এই ‘গোপন কায়দা’ কোনও ভাবে দেখে ফেলেছিল প্রথম শ্রেণির ওই খুদে ছাত্রী। হস্টেলের কড়া নিয়মের দুনিয়ায় ওই একরত্তি শিশু প্রেমের সম্পর্কের গোপন কথা ফাঁস করে দেওয়ার বড়সড় বাধা হচ্ছিল বলে অনুমান পুলিশের। সেই পথের কাঁটা সরাতেই ঠান্ডা মাথায় এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ঘটনার পর থেকেই ওই মিশনারি স্কুলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তদন্তের পরিধি আরও বাড়িয়ে এ বার স্কুলের অন্দরমহল ও বহিরাগত সংযোগের সূত্রগুলি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কৃষ্ণনগরের তদন্তকারী আধিকারিকেরা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন এবং স্কুলের পরিকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মূল ফটক ছাড়াও স্কুলে অন্য কোনও গোপন বা অলক্ষ্যে থাকা ঢোকা-বেরোনোর পথ আছে কি না, তা-ও সরেজমিনে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যে স্কুলের এবং হস্টেলের সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরার গত কয়েক দিনের ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং সেই ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় প্রেমিকের কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার দিন বা তার আগে স্কুলের আশপাশে তার কোনও রকম গতিবিধি বা আনাগোনা ছিল কি না, সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্র মারফত তা নিশ্চিত করতে চাইছে পুলিশ।
তদন্তকারী এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, তদন্তের সবক’টি দিকই তাঁরা খোলা রাখছেন। বয়ঃসন্ধির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা যেমন রয়েছে, তেমনই ওই নাবালিকার প্রেমের সম্পর্ক এবং হস্টেলের মোবাইল-বিবাদের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করার কাজও সমান তালে চলছে।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার ভোরে হস্টেলের শৌচাগার থেকে প্রথম শ্রেণির ছাত্রীর দেহ উদ্ধার হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, স্নান করতে গিয়েছিল সাত বছরের মেয়েটি। তার পিছন পিছন সেখানে ঢোকে নবম শ্রেণির দুই ছাত্রী। তার পর মেয়েটির মাথা ধরে বালতির জলে চুবিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে শ্বাসরোধ করে মারার চেষ্টা করা হয়। পরে মেয়েটির মৃত্যু নিশ্চিত করতে ব্লেড দিয়ে নাবালিকার এক হাতের শিরা কেটে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।