ছুতমার্গ কাটিয়ে যোগাসনে ঋতুকালীন স্বাস্থ্যরক্ষার পাঠ

কসরত: কর্মশালায় মহিলাদের সঙ্গে মেঘনা। নিজস্ব চিত্র

পরপর আসন পাতা। সার বেঁধে বসে যোগাসন করছেন মাঝবয়সি মহিলারা। অন্তত ৪০ জন। তাঁদের যোগাসন দেখাচ্ছেন এক বিদেশিনি।

এ দৃশ্যে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। অবাক হতে হয় ওই মহিলাদের নিয়ে। যাঁদের বেশির ভাগের বয়স ৪৫-৫০। মেনোপজ এসে গিয়েছে। অস্ত্রোপচারে বাদ গিয়েছে জরায়ু। জড়তা ভেঙে তাঁরা এগিয়ে এসেছেন মেঘনা নোরিয়েনের কাছে।

বাঘা যতীনের একটি ক্লাবে সম্প্রতি এমনই এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। গত ২৮ মে, সোমবার ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল মেনস্ট্রুয়াল ডে।’ তার আগের দিন অর্থাৎ, ২৭ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঋতু সংক্রান্ত নানা কর্মসূচি চালাল একটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর কলকাতা শাখা। গোটা বিশ্ব জুড়ে কাজ করে এই গোষ্ঠী। ৩৭৬টি শহরে তাদের সাত হাজার সদস্য। এই গোষ্ঠীর বেশির ভাগ সদস্য তরুণ প্রজন্মের। কলকাতায় ওঁরা ঋতুকালীন সব রকম কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা ঝেড়ে ফেলার জন্য তথ্যচিত্র প্রদর্শনী (ডায়ানা ফ্যাবিয়ানোভা পরিচালিত ‘দ্য মুন ইনসাইড ইউ’), আলোচনা, গর্ভ যোগাসন (womb yoga), অনলাইনে প্রচার— পাঁচ দিন ধরে এমন অনেক কিছুই করেছেন।

ওঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যাঁর দেখাশোনা করেন এক সময়ে পেনসিলভ্যানিয়ার বাসিন্দা মেঘনা। নিজের শহর ছেড়ে এসে তিনি এখন কাজ করেন উত্তর কলকাতার বস্তিতে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের বদলে নরম সুতির কাপড়ে তৈরি প্যাড অনলাইনে বিক্রি করেন। আর বস্তিতে সব বয়সি মহিলাকে শেখান ঋতুর সময়ে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের প্রক্রিয়া। তামিলনাড়ুর প্যাডম্যান অরুণাচলম মুরুগনন্থমের মতো তাঁকে অনেকে চেনে ‘প্যাড উওম্যান’ বলে!

‘‘ইদানীং ঋতুকালীন নানা সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু মেনোপজে পৌঁছনো বয়স্ক মহিলাদের সমস্যা নিয়ে খুব একটা কথা হয় না,’’ বলছিলেন আন্তর্জাতিক ওই গোষ্ঠীর কলকাতা শাখার তরফে শ্রীলেখা ঘোষাল। তাই তাঁরা এই পাঁচ দিনের মধ্যে একটি দিন রেখেছিলেন এমন মহিলাদের জন্যই।

গর্ভ যোগাসন কিছুটা আয়ত্ত করে এই সব গৃহবধূদের প্রত্যেকে একটা কথাই বললেন— কেউই জানতেন না, মেনোপজের পরে এত কিছু করা সম্ভব। কর্মশালা শেষ হওয়ার পরে মেঘনার কাছে তাঁরা জেনে নিলেন আরও অনেক অজানা তথ্য। চাঁদের অবস্থান বদলের সঙ্গে শারীরিক ওঠাপড়ার গল্প। এ সময়ে কখন বিশ্রাম নিতে হবে, কখন শরীর সম্পূর্ণ সচল। সব জেনে তাঁরা বললেন, গর্ভ যোগাসনের এমন কর্মশালা আবারও হোক, যাতে ঋতুচক্রের নানা ধাপেই আসনের মাধ্যমে সুস্থ রাখা যায় নিজেদের। গর্ভ যোগাসন করিয়ে তৃপ্ত মেঘনাও। এ ধরনের কর্মশালা করে আরও বেশি সংখ্যক মহিলাকে সচেতন করতে আগ্রহী তিনি।

‘শরীর খারাপ’, ‘বাজে রক্ত’— এই সব পরিচিত ভ্রান্ত শব্দবন্ধ থেকে বেরিয়ে বাঙালি মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে এমন উদ্যোগ চলবে, জানালেন শ্রীলেখাও।