—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
আগামী ২০৪৭-এর মধ্যে দেশের সমস্ত মানুষকে যখন বিমার আওতায় আনার জন্য জোরদার প্রচার চালাচ্ছে মোদী সরকার, তখন দীর্ঘ দিন ধরে স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়াম মেটানোর পরে চিকিৎসা খাতে খরচের দাবি পেশ করে প্রত্যাখাত হলেন এক গ্রাহক। বিমা কর্তৃপক্ষের অবশ্য দাবি, প্রকল্পের শর্ত মেনেই তাঁরা গ্রাহকের দাবি খারিজ করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে উত্তাল হয়েছে সমাজমাধ্যম। বিমার দাবি খারিজ হওয়া নিয়ে অনেকের মন্তব্য, এমন ঘটলে তো লোকে স্বাস্থ্য বিমা করতে ভয় পাবেন। এই ধরনের প্রকল্পের উপর থেকে সাধারণ মানুষের ভরসাই চলে যাবে।
ঘটনাটি হল— লখনউয়ে এক গ্রাহক স্টার হেলথ অ্যান্ড অ্যালায়েড ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির থেকে তাঁর মায়ের জন্য স্বাস্থ্য বিমার প্রকল্প কিনেছিলেন। দীর্ঘ দিন ধরে বছরে ৫০,০০০ টাকা করে প্রিমিয়াম মিটিয়েছেন। ভরসা ছিল মা অসুস্থ হলে তাঁর চিকিৎসার খরচ নিয়ে ভাবতে হবে না। বিমা সংস্থা তা মিটিয়ে দেবে। কিন্তু সম্প্রতি সেই দাবি খারিজ করেছে বিমা সংস্থা। কারণ হিসেবে জানিয়েছে, গ্রাহক প্রকল্প কেনার সময় পুরনো শারীরিক সমস্যার তথ্য গোপন করেছিলেন। গ্রাহকের অভিযোগ, সুরাহার আশায় তিনি তাঁর বিমা এজেন্টের স্মরণাপন্ন হলে শুনতে হয়, ‘‘আপনি তো পলিসি কেনার আগে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি।’’ বিমার টাকা না দেওয়ার এই ঘটনা সামগ্রিক ভাবে স্বাস্থ্য বিমার উপর গ্রাহকের ভরসা কমাবে বলে সমাজমাধ্যমে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মহল। এ নিয়ে কিছু দিন ধরেই দেশ জুড়ে চলছে চর্চা।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে স্টার হেলথ জানিয়েছে, ‘‘এটা ঠিক যে, স্বাস্থ্যের সঙ্গে আবেগ জড়িত থাকে। তবে লখনউয়ের ওই গ্রাহকের দাবি খারিজ করার বিষয়টি যে ভাবে আমাদের বিরুদ্ধে তুলে ধরা হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করছি। অভিযোগে অনেক তথ্যই উল্লেখ করা হয়নি। দাবির সঙ্গে জড়িত চিকিৎসার নথি খতিয়ে দেখা গিয়েছে, যে-রোগের চিকিৎসার খরচ চাওয়া হয়েছে, তা বিমা করানোর আগে থেকেই রোগীর ছিল। মেডিক্যাল রিপোর্টে সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। অসুখটি যে ছিল না, তা প্রমাণ করার নথি একাধিক বার চাওয়া সত্ত্বেও জমা দেওয়া হয়নি।’’ যদিও একাংশের প্রশ্ন, অসুখ হওয়ার প্রমাণ দেওয়া গেলেও, তা না থাকার প্রমাণ কেউ কী ভাবে দিতে পারে? কেউ কেউ এই সংক্রান্ত কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দাবি করেছে কর্তৃপক্ষের থেকে।
সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য, স্বাস্থ্য বিমা থাকা সত্ত্বেও গ্রাহক প্রয়োজনের সময় তার সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। এ ব্যাপারে এক এজেন্ট সংগঠনের সর্ব ভারতীয় প্ল্যানিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সৌমেন চৌধুরী বলেন, ‘‘অনেক সময়েই তুচ্ছ কারণে বিমা সংস্থা দাবি খারিজ করে দেয়। এমন নজিরও রয়েছে, যে রোগের চিকিৎসার জন্য দাবি পেশ করা হয়েছে, সেটি প্রকল্প কেনার আগে থেকে (প্রি-এগজ়িস্টিং) ছিল না। কিন্তু অন্য কোনও রোগ আগে থেকে ছিল এবং সেটি প্রকল্প কেনার সময় জানানো হয়নি— এই যুক্তিতে বিমার টাকা দেওয়া হয়নি।’’ সৌমেন এবং বিমা বিশেষজ্ঞদের দাবি, ওই সব ক্ষেত্রে বিমা অম্বুডসম্যানের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন গ্রাহক। নিজের যুক্তি এবং তথ্য পেশ করে দাবি আদায় করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য বিমা সংস্থার এক কর্তা বলেন, ‘‘প্রধান সমস্যা হচ্ছে, অনেক সময়ে প্রকল্প বিক্রির সময় গ্রাহককে উপযুক্ত প্রশ্ন করে তাঁর স্বাস্থ্যের ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে নেওয়া হয় না। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে দাবি মেটানো নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়।’’ মেডিক্লেম পলিসি কেনার সময় কিছু বিষয় গ্রাহকের মাথায় রাখা জরুরি বলেও জানান তিনি। যেমন— কোনও অসুখ বা অপারেশন আগে হয়েছে কি না, তা জানাতে হবে। স্বাস্থ্যের কোনও সমস্যা যতই কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হোক, জানিয়ে রাখতে হবে। তা হলে সংস্থা প্রিমিয়াম নেওয়ার পরেও আঙুল তুলে দাবি খারিজের সুযোগ পাবে না। মদ বা সিগারেটের নেতা অতিরিক্ত হলে জানানো দরকার। গ্যাস, হজম ইত্যাদির জন্য নিয়মিত কোনও ওষুধ খেলেও, সেই তথ্য বিমা সংস্থার হাতে দিয়ে তার পরে বিমার প্রকল্প কিনলে ভাল। সাধারণত ১৪টি বিশেষ রোগের দাবি প্রকল্প কেনার পরে দু’বছর পার না হলে পাওয়া যায় না। তবে অনেক সংস্থা ওই শর্ত শিথিল করে রাখে। তবে তা প্রকল্পে লিখিত ভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। যে সব রোগের ব্যাপারে জানানো হবে, সাধারণত সেগুলির দবি মেটানো হয় প্রকল্প কেনার ৩৬ মাস পরে। তবে কোনও সংস্থা শর্ত শিথিল করলে, তার উল্লেখ থাকতে হবে প্রকল্পে। সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য, তবে যা-ই হোক না কেন, পলিসি কেনার পরে অসুখ হলে সে ব্যাপারে দাবি কখনওই খারিজ করা যাবে না। চিকিৎসার টাকা তখন দিতে বাধ্য বিমা সংস্থা। এমনকি ওই অসুখ পলিসি কেনার আগে হয়ে থাকলেও, গ্রাহকের তা না জানা থাকলে বিমা সংস্থা দাবি খারিজ করতে পারবে না।