বহু বছর পরে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ফের ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার শিল্পায়ন, লজিস্টিক করিডর, অভ্যন্তরীণ জলপথে বাণিজ্য, সেমিকন্ডাক্টর জোগানশৃঙ্খল এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট নীতি’তে কলকাতার সম্ভাব্য ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। নীতি আয়োগের নেতৃত্বে অশোককুমার লাহিড়ীও পশ্চিমবঙ্গকে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এই নতুন আশাবাদের আড়ালে রয়েছে এক কঠিন বাস্তব। আর্থিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জড়তা— এই তিনের ভারে পশ্চিমবঙ্গ এখনও ন্যুব্জ। জনসংখ্যা, মেধাসম্পদ এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নিরিখে রাজ্য দীর্ঘ দিন ধরেই জাতীয় গড়ের নীচে।
এই পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ রাজ্যের শিল্পভিত্তির দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়। বর্তমানে শিল্পের অংশ রাজ্যের অর্থনীতির মাত্র ২৪%, যেখানে মহারাষ্ট্রে তা প্রায় ৩৩%, এবং গুজরাতে ৪০ শতাংশেরও বেশি। পরিষেবাক্ষেত্র অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও তার বড় অংশ অসংগঠিত, ফলে স্থিতিশীল করভিত্তি তৈরি হয়নি। এর প্রভাব যেমন বৃদ্ধির হারে পড়েছে, তেমনই পড়েছে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতার উপরে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুপাতে ঋণের পরিমাণ দীর্ঘ দিন ধরেই চড়া— প্রধান রাজ্যগুলির মধ্যে পঞ্জাবের পরেই তার স্থান। গত এক দশকে আর্থিক ঘাটতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও, সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বজায় রাখতে গিয়ে মূলধনি ব্যয় চাপে পড়েছে। রাজ্যের আয়-ব্যয়ের কাঠামো তাই এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তবু সমস্ত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গের কিছু অসামান্য কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ শ্রমশক্তি, শিক্ষার ঐতিহ্য, নগর কেন্দ্র এবং বন্দর পরিকাঠামো— এই সব মিলিয়ে রাজ্যের হাতে এমন সম্পদ রয়েছে, যাতে অনেক রাজ্যই ঈর্ষা করতে পারে। এক সময়ে কলকাতা ছিল পূর্ব ভারতের বাণিজ্যদ্বার, এমনকি সমগ্র বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলেরও অন্যতম প্রবেশপথ। ভারতের বহু শীর্ষ শিল্পপতি, লগ্নিকারী, বিজ্ঞানী ও বণিকগোষ্ঠীর শিকড় এই রাজ্যে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাফল্যের ভিত গড়ে তোলা বহু প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নীতির ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবু বাংলাদেশের সীমান্ত, নেপাল, ভুটান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সান্নিধ্য পশ্চিমবঙ্গকে এখনও এমন এক অবস্থানে রেখেছে, যার সম্ভাবনা আজও পূর্ণ ভাবে কাজে লাগানো হয়নি। যে কোনও ভবিষ্যৎ সরকারকে তাই একই সঙ্গে দু’টি কাজ করতে হবে— আর্থিক স্বাস্থ্য পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই কাজ এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে। এর দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত টাকার অবমূল্যায়ন, মূল্যবৃদ্ধি এবং জাতীয় বৃদ্ধির হারকে ধাক্কা দিতে পারে— যার প্রভাব পড়বে আর্থিক চাপের মুখে থাকা পশ্চিমবঙ্গের উপরেও।
দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের পুনরুত্থানের জন্য শিল্পভিত্তিকে পুনর্গঠন করা অপরিহার্য। ‘ইজ় অব ডুয়িং বিজ়নেস’ কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না; সেটিকে প্রশাসনিক বাস্তবে রূপ দিতে হবে। জমির ব্যবহার পরিবর্তন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে যে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, তা কমাতে হবে। বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলীয় বাণিজ্য করিডরের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
পুর-সম্পত্তির মূল্যায়ন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণও অত্যন্ত প্রয়োজন। এই কাজে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রগুলির সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে হবে, যাতে মেধাবীদের বেঙ্গালুরু বা বিদেশমুখী হতে বাধ্য না-হতে হয়। বিদ্যুৎ বণ্টনে ক্ষতি কমানো এবং ভর্তুকি কাঠামোকে যুক্তিসঙ্গত করাও জরুরি। বণ্টনজনিত ক্ষতি আজও ভর্তুকি, বকেয়া এবং সম্ভাব্য দায়ের মাধ্যমে অর্থনীতির উপরে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার আর্থিক সংহতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
একই সঙ্গে, জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের সামাজিক গুরুত্ব স্বীকার করেও মনে রাখতে হবে যে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিকাঠামো, শিক্ষার মান এবং জনস্বাস্থ্যের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। ভূগর্ভস্থ জলের উপরে ক্রমবর্ধমান চাপও এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কৃষি, শিল্প এবং নগর সম্প্রসারণের সম্মিলিত প্রভাবে আগামী দিনে এই সঙ্কট আরও তীব্র হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যকর নজরদারি আজই শুরু করা প্রয়োজন। আর্থিক সংযম মানেই যে সরকারের সঙ্কুচিত ভূমিকা, তা নয়। বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনপরিষেবার মতো ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যয় বৃদ্ধিই প্রয়োজন।
বাংলার বহু প্রবীণ মানুষের কাছে আর্থিক নিরাপত্তাই সব নয়। তাঁদের মানসিক নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে সন্তানরা তাঁদের কাছাকাছি আছে কি না, তার উপরে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা যখন কাজের সন্ধানে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা বিদেশে চলে যায়, তখন পশ্চিমবঙ্গ শুধু মেধাই হারায় না; হারায় তার সামাজিক বুননেরও একটি অংশ। পরিবারের কাছে পাঠানো অর্থ সংসার চালাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু দূরত্ব ঘোচাতে পারে না। প্রয়োজনে সন্তানের পাশে থাকার নিশ্চয়তা, সঙ্কটের সময়ে পরিবারের উপরে নির্ভর করার সুযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনে নীরব সহায়তা— এর কোনওটাই অর্থ পাঠিয়ে পূরণ করা যায় না। এই কারণেই শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যথেষ্ট নয়। রাজ্যে এমন মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে হবে, যাতে শিক্ষিত শ্রমশক্তির কাছে এই রাজ্যে থেকে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে।
স্বল্পমেয়াদে কয়েকটি অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। রাজ্যের উচিত সমস্ত আর্থিক দায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা— যার মধ্যে সরকারি সংস্থা ও বিশেষ ঋণপ্রদানকারী সংস্থার মাধ্যমে নেওয়া বাজেট-বহির্ভূত ঋণও থাকবে। অধিক স্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। বাজেট প্রণয়নকেও আরও বাস্তবসম্মত করতে হবে। অতিরিক্ত আশাবাদী রাজস্ব অনুমান এবং অস্পষ্ট ব্যয়শিরোনামের অতিরিক্ত ব্যবহার এড়ানো জরুরি। হিসাবের দ্রুত সমন্বয়, ব্যবহার শংসাপত্র (ইউসি) ও কনটিনজেন্ট বিল (সিবি)-এর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং স্বচ্ছ নিরীক্ষা সরকারি ব্যবস্থার উপরে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। বহু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই এখনও হিসাব পেশ করতে বিপুল বিলম্ব করে, সংস্থার মোট ঋণের হিসাবটিকে অস্বচ্ছ রাখে, এবং জবাবদিহির দায়বদ্ধতাকে বিপুলাংশে এড়িয়ে চলে। এই সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অডিটের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকি এড়ানো যায়। লাভজনক সংস্থাগুলি তাদের লাভের একটি ন্যায্য অংশ রাজ্য সরকারকে দেবে কি না, তাও ভাবা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, মূলধনি ব্যয়কে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ধার করা অর্থ ব্যয় হওয়া উচিত রাস্তা, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, জলব্যবস্থা, শিল্পপার্ক এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে— এমন বিনিয়োগে, যা রাজ্য ও তার মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনে। এমনকি অপেক্ষাকৃত ছোট পদক্ষেপও কার্যকর হতে পারে।
আশার কথা যে নতুন সরকারের বাজেটে সে দিকে যথোপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকাঠামোর প্রতি বাড়তি মনোযোগ এ বারের বাজেটের বৈশিষ্ট্য।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত শৃঙ্খলা, আর্থিক সততা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এখনও রাজ্যের গতিপথ বদলে দিতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা— এমন ধারাবাহিকতা, যা একটি বাজেট, একটি প্রকল্প বা কোনও একক সরকারের মেয়াদ ছাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়।
অর্থনীতি বিভাগ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, দিল্লি