ইতিহাসের কয়েকটি পাতা হঠাৎ উঠে এল চোখের সামনে। চোখ ঠেকে গেল ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’ নামের একটি লেখায়। লেখাটি আছে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর রচনা সংগ্রহে।
বাংলা ভাষার সুপাঠ্য একটি ব্রতকথা। উৎসর্গ পত্রে লেখা, এটি ১৯০৬ সনের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত। “‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’ বঙ্গের গৃহলক্ষ্মীদিগের করকমলে অর্পণ করিলাম।” ভূমিকা হিসেবে লেখা আছে, “গত পৌষের বঙ্গদর্শন হইতে ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’ পুনর্মুদ্রিত হইল। বঙ্গব্যবচ্ছেদের দিন অপরাহ্ণে জেমো-কান্দি গ্রামের অর্দ্ধসহস্রাধিক পুরনারী আমার মাতৃদেবীর আহ্বানে আমাদের বাড়ীর বিষ্ণুমন্দিরের উঠানে সমবেত হইয়া-ছিলেন; গ্রন্থোক্ত অনুষ্ঠানের পর আমার কন্যা শ্রীমতী গিরিজা কর্তৃক এই ব্রতকথা পঠিত হয়। বন্ধুবর্গের অনুরোধে ইহা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করিলাম। সম্প্রতি এডুকেশন গেজেটে ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’র সংস্কৃত অনুবাদ বাহির হইতেছে দেখিয়া আনন্দিত হইলাম। শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, চৈত্র ১৩১২।”
কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রামেন্দ্রসুন্দর পরিবারের এই প্রচেষ্টার মূল ওতপ্রোত ও সম্পৃক্ত ছিল আরও কিছু আন্দোলনে, যা বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এক সুতোয় জড়ানো। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে ‘রাখিবন্ধন’ উৎসব যেমন। সে আহ্বানের অন্যতম সমর্থক বা সহ-উদ্যোক্তা রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। এই বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত অধ্যাপক, যিনি বাঙালির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের অন্যতম কারিগর— তাঁর সক্রিয়তার গল্প আজ বিস্মৃত হলেও, ইতিহাস সাক্ষী। এই রাখিবন্ধনকে ঘিরেও অনেক কাহিনি আছে। পক্ষেবিপক্ষে টিপ্পনীও। অবন ঠাকুরের কলমে আছে ওই দিনের রসময় বর্ণনা।
‘অরন্ধন’-এর ডাকটিও কুশলী। বাঙালির ঘরের মেয়েদের কাছে গ্রহণযোগ্য, কাছের। নিজ সংস্কৃতির নিকট, পুরনো উপাদানে তৈরি। প্রতিবাদী প্রয়োগপদ্ধতিটি নব্য। আত্মীয়বিয়োগের দিনে যেমন ঘরে হাঁড়ি চাপে না, দেশকে দু’ভাগ করার মতো ঘটনাও এক বিয়োগব্যথা, পারিবারিক দুর্বিপাকের মতো। এই স্পষ্ট বার্তা দেয়— আবেগী বার্তা। বঙ্গভঙ্গ-সিদ্ধান্ত এমন এক রাষ্ট্রীয় কাজ যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কাঁটাতার তুলে দিতে চায়। তাকে বিরোধ করার জন্য এমন উদ্ভাবনের প্রয়োজন হয়েছিল সাক্ষাৎ জনপ্রিয় একটা প্রতীক হিসেবেই। এই সূত্রে, ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার পরে তাঁর স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল বইতে উল্লেখ করেন ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথার’ও। সেখানে এই মন্তব্যও পাই যে, হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের জন্য একটি আন্তরিক প্রয়াস হলেও এই ক্ষুদ্র প্রচারপুস্তিকাটি হিন্দু ধর্মীয় পুরাণ, ঐতিহ্য ও লোককথার রঙেই বেশি করে রাঙানো ছিল। স্বদেশি আন্দোলনে বারে বারেই সংখ্যাগুরুর এই ‘দ্বিচারিতা’ এসে পড়েছে, এ কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আগ্রহ অন্যত্র জাগে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের দিকে উদ্দিষ্ট একটি লেখন, যা আসলে ধর্মসমন্বয়ের বার্তা রূপে গ্রামে প্রচারের জন্য রচিত, যা আসলে ইতিহাসের নির্মোহ পর্যালোচনা। বাংলার হিন্দু, পরে হোসেন শাহ প্রমুখ সুলতানি আমলের শাসক, তার পর মোগল সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে ইংরেজের শাসন অবধি বঙ্গলক্ষ্মীর ‘চঞ্চলতা’র ইতিহাসের ছলে বস্তুত বিগত কয়েক শতাব্দীতে বাংলার ভৌগোলিক অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের কাহিনি বর্ণনা। সেই বর্ণনার মধ্যে স্পষ্ট যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি। গল্পচ্ছলে বলা এমন কথা যা অতি সাধারণ পুরনারীদের মধ্যেও একটা বার্তা দেবে, কোনও দ্বিধা সংশয় রাখবে না। চালিত করবে সমন্বয় ও ঐক্যের দিকে।
“চিরদিন সমান যায় না। লক্ষ্মী চঞ্চলা; তিনি আবার চঞ্চল হ’লেন। বাঙলার ধন দেখে ধান দেখে মোছলমান বাঙলায় এলেন। তখন বাঙলার রাজা ছিলেন, তাঁর নাম ছিল লক্ষ্মণ সেন। তাঁর রাজ্য গেল। মোছলমান বাঙলার রাজা হ’লেন। হিঁদুর জাতিধৰ্ম্ম নষ্ট হ’তে লাগল। হিঁদুর ঠাকুরঘর ভেঙে মোছলমান মসজিদ্ তুলতে লাগলেন। অর্দ্ধেক হিঁদু মোছলমান হ’ল। হিঁদু-মোছলমানে এক গাঁয়ে এক ঠাঁয়ে বাস ক’রে মারামারি-কাটাকাটি করতে লাগল। লক্ষ্মী ভাবলেন, হায়!... তখন বাঙলাতে গৌড়ের পাঠান-বাদশা রাজা ছিলেন, তাঁর নাম ছিল হোসেন শাহ। লক্ষ্মী তাঁকে স্বপ্ন দিলেন, ...আমাকে বুঝি বাঙলা ছাড়তে হ’ল। আমি বাঙলার লক্ষ্মী, আমার হিঁদুও যেমন মোছলমানও তেমনি; হিঁদু মোছলমান ভাই-ভাই যখন মারামারি কাটাকাটি করতে লাগল, আমি বাঙলা ছেড়ে চল্লেম। পাঠান রাজা কেঁদে বল্লেন— মা, তুমি যেতে পাবে না। আমি হিঁদু-মোছলমান সমান দেখব, তাদের ভাই-ভাই এক ঠাঁই করব। তুমি বাঙলা ছেড়ে যেয়ো না। লক্ষ্মী বল্লেন— আচ্ছা, তাই হবে; আমি এখন থাকব। দিল্লীতে মোগল বাদশা হবেন। দিল্লীর বাদশা বাঙলার রাজা হবেন; সেই রাজা হিঁদু-মোছলমান সমান দেখবেন, তখন হিঁদু-মোছলমান ভাই-ভাই হবে, ঝগড়া-বিবাদ মিটে যাবে। রাজা ঘুম ভেঙে দরবারে বসলেন। দরবারে ব্রাহ্মণ এসে রাজাকে মহাভারত শোনালে। মোছলমান রাজা ব্রাহ্মণকে মান্য ক’রে রাজমন্ত্রী করলেন। হিঁদু গিয়ে মোছলমানের পীরতলায় সিন্নি দিতে লাগল। এমন সময় মহাপ্রভু নদীয়ায় অবতার হ’লেন। তিনি যবন-ব্রাহ্মণ সবাইকে ডেকে কোল দিলেন। পাঠানের পর দিল্লীর মোগল বাদশা বাঙলার রাজা হ’লেন। তিনি হিঁদু মোছলমানকে সমান চোখে দেখতে লাগলেন। হিঁদু মোছলমান ভাই-ভাই হ’ল, ঝগড়া-বিবাদ মিটে গেল। বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলা জুড়ে বসলেন। ধনে ধানে দেশ পূর্ণ হ’ল।”
এর অল্প পরে, ওই লেখায়, গল্পচ্ছলে ইংরেজ শাসনের ভয়াবহতাকে তুলে আনেন। “সাত সমুদ্র পার হ’য়ে খৃষ্টান ইংরেজ সদাগর বাঙলায় বাণিজ্য করতে এসেছিল। দিল্লীর বাদশা তাদের আদর ক’রে নিজের রাজ্যমধ্যে জায়গা দিয়েছিলেন। বাঙলার ধন দেখে, ধান দেখে তাদের লোভ হ’ল। লক্ষ্মী তখন আলমগীরের বংশের দিল্লীর বাদশাকে ছেড়েছেন। বাদশা ইংরেজকে বাঙলার দেওয়ান ক’রে দিলেন। বাদশার দশা দেখে বাদশাকে খাজনা দেওয়া বন্ধ করে তারাই হ’ল বাঙলার রাজা। তারা এসেছিল সদাগর, হয়েছিল বাদশার দেওয়ান, হ’য়ে গেল দেশের রাজা। রাজা হ’ল; কিন্তু রাজ্যে বাস করল না। বাঙলা দেশের ধন নিয়ে, ধান নিয়ে সাত সমুদ্র পারে আপন দেশে চলল। সাগরের জাত কিনা, মেজাজ ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অতিশয় ধূর্ত। তারা চোর ডাকাত দমন করল, মিষ্টি মিষ্টি কথা কইতে লাগল, আবার নিজের দেশ হ’তে খেলনা এনে, পুতুল এনে প্রজার মন ভুলাতে লাগল। লক্ষ্মী যখন চঞ্চলা হন, তখন মানুষের বুদ্ধি লোপ হয়। বাঙলার লোকের বুদ্ধিলোপ হ’ল।...”
এই ভাবে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত এগিয়ে আসে ব্রতকথা। “ইংরেজ রাজার তখন একটা ছোকরা নায়েব ছিল।... সে বলে, এরা বড় ঘ্যানঘ্যান করছে; থাক্, এদের দু’দল ক’রে দিচ্ছি; এক দিকে থাক্ মোছলমান, আর এক দিকে থাক হিঁদু। এরা ভাই-ভাই এক ঠাঁই থেকে বড় বিরক্ত করছে। এদের ভাই-ভাই ঠাঁই-ঠাঁই ক’রে দাও, এদের জোট ভেঙ্গে দাও। এই ব’লে তিনি বাঙালীকে দু-দল ক’রে দিলেন, এক দিকে গেল হিঁদু, এক দিকে গেল মোছলমান।”
এর ফল, লক্ষ্মীর সিদ্ধান্ত, বাংলা ভাগ হলে তিনি বাংলা ছেড়ে যাবেন। কী ভাবে তখন বাঙালি তাকে আটকায়, কী ভাবে ঘরে ঘরে অরন্ধন পালন করে, রাখিবন্ধন করে ‘হিঁদু মোছলমানে’। পুরোটাই কাহিনির ঢঙে লেখা হয়। পরিশেষে মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা— “মা লক্ষ্মী, কৃপা কর। কাঞ্চন দিয়ে কাঁচ নেবো না।... পরের ভিক্ষার ধন হাতে তুলবো না। পরের দুয়ারে ভিক্ষা করবো না। মোটা অন্ন ভোজন করবো, মোটা বসন অঙ্গে নেবো।... পড়শীকে খাইয়ে নিজে খাবো। ভাইকে খাইয়ে পরে খাবো। মোটা অন্ন অক্ষয় হোক। মোটা বস্ত্র অক্ষয় হোক। ঘরের লক্ষ্মী ঘরে থাকুন। বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলায় থাকুন।”
এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রচারের জন্যই তৈরি হয়েছিল। এর বিপুল জনপ্রিয়তা উল্লেখ করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর। তাঁর মা ও কন্যার কথা তুলেছেন। অন্য পুরনারীদের সঙ্গে নিয়ে ‘নতুন’ বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা পাঠ করাকে চালু করতে চেয়ে বলেছিলেন, প্রতি বছর আশ্বিনে বঙ্গবিভাগের দিনে এই ব্রত যেন পড়েন মেয়েরা। নারী অভিমুখী এই প্রচেষ্টার মধ্যে, সামাজিক আচারে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার মধ্যে এক গভীর ভাবনা আর কুশলতা খুঁজে পাই আজ। আজকের দিনে, এটা ভাবলে, আমাদের মনে, বহু স্তরে, দোলা লাগেই। বিশেষত, সবচেয়ে বড় কথা, ব্রতকথাটি সেই সমাজে প্রচলিত অন্য অন্য ব্রতকথার ধারায় রচিত, কিন্তু একটি বিশেষ পরীক্ষানিরীক্ষা আর পুনর্নির্মাণের ছক তাতে রয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য বঙ্গভঙ্গ রোধ ও হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ লোপের কথা বলা। “আমরা ভাই ভাই এক ঠাঁই/ ভেদ নাই ভেদ নাই।”
সেই সময় রবীন্দ্রনাথের মতো মহাসমুদ্রের পাশাপাশি রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মতো পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে আলোকিত বাঙালি কৃতী অধ্যাপকও (ভুললে চলবে না, ১৮৯৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর) নিজেদের বাঙালিয়ানার শিকড়ে খুঁজেছিলেন স্বজাতির মুক্তি। হয়ে উঠেছিলেন নানা অভিনব ভাবনার উৎস। বহুবিধ বিচ্ছুরণে ধরতে চেয়েছিলেন বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারকে বাংলা ভাষার সরসতায়। আর জাতীয়তাবাদের আলোতে, বাঙালি স্বজাতীয়তার প্রতিষ্ঠায়, বার বার সমাজ, দর্শন, পুরাণ, উপকথা, ছড়া বা লোকসাহিত্যকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন এই সৃষ্টিশীল মেধাবী বাঙালি। বিদেশি শাসকের বাংলা ভেঙে টুকরো করতে চাওয়াকে আটকাতে উদ্ভাবন করেছেন এক নতুন পুনর্নির্মাণ কৌশল।
ইতিহাসের এই পাঠ কোথাও হারিয়ে বসেছিল। পড়ে বিস্ময় লাগে।