ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছিলেন, বিলেতের প্রধানমন্ত্রী ইরান যুদ্ধের শুরুতেই নিঃশর্ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারের যোগদানের খবর এল ঠিকই, তবে তা বড্ড দেরিতে; তত দিনে নাকি, ট্রাম্পের মতে, যুদ্ধজয় হয়েই গেছে।
ট্রাম্পের কটাক্ষ শুনে বিশ্ববাসী হেসেছেন— স্টার্মার তো আর উইনস্টন চার্চিল নন। ঠাট্টা নয়, প্রশ্ন উঠতেই পারে, চার্চিল হলে কী করতেন। তবে, আশি বছর পিছনোর দরকার কী, এই তো সে দিনের কথা, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ার ইরাক যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বুশের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। হাত পুড়িয়েছিলেন বলা ভাল; ইরাক-আফগানিস্তানে বিলেত-আমেরিকার একত্রে যুদ্ধযাত্রার জন্য বিলেতবাসী আজও ব্লেয়ারকে ক্ষমা করেননি।
তাই, শুধু চার্চিল নন, জানতে ইচ্ছে করে আজকের দিনে ব্লেয়ারই বা কী সিদ্ধান্ত নিতেন। কয়েক দিন আগেই ব্লেয়ার বলেছেন, বিলেতের নাকি উচিত ইরান যুদ্ধে আমেরিকার পাশে থাকা। চাণক্যমতে তো বলে— বন্ধু হিসাবে যে সব সময়ে পাশে থাকতেই হয়, তার মধ্যে ‘রাষ্ট্রবিপ্লব’ অন্যতম।
বিলেতের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিরোধী কনজ়ারভেটিভ পার্টির দলনেত্রী কেমি ব্যাডেনখ যুদ্ধের শুরুতেই বলেন, শুধু আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নয়, যুক্তরাজ্যেরও ইরানকে আক্রমণ করা দরকার। বলা বাহুল্য, স্টার্মারের অভিমত ভিন্ন, তিনি চান বিলেতের ‘ডিফেন্সিভ’ ভূমিকা।
বন্ধুত্ব, নৈতিকতা, ইরানের আমজনতার স্বার্থ, তেল ভান্ডারের দখল, ইত্যাদি সরিয়ে রেখে একটি বিষয় সরাসরি আলোচ্য— সত্যিই কি ইরান বিলেতের শত্রু? ইরান কি বিলেতের ‘ইমিডিয়েট থ্রেট’? তা যদি না হয়, তা হলে কিন্তু স্টার্মারের সিদ্ধান্ত মোটেই অযৌক্তিক নয়। ট্রাম্প ও ইজ়রায়েলের নেতারা অবশ্য বলছেন, তাঁরা পদক্ষেপ না করলে, ইরান ‘প্রথম হানা’র জন্য তৈরি হয়েছিল।
নেতাদের সিদ্ধান্ত এই তথ্যটার উপরই তা হলে পুরোপুরি নির্ভর করে। আধুনিক গেম থিয়োরির বিশেষ এক তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে বিশ্লেষণ করা চলে, যা হল তথ্যের আদানপ্রদান বা ‘ইনফরমেশন ট্রান্সমিশন’-এর গেম। সাধারণত গেম থিয়োরিতে আলোচ্য গেম-এ মাত্র দুই বা ততোধিক পাত্রপাত্রী থাকেন; গেমের ‘খেলোয়াড়’ হিসাবে তাঁরা সকলে নানান সিদ্ধান্ত নেন, ফল নির্ধারিত হয়। ১৯৮২ সালে ভিনসেন্ট ক্রফোর্ড আর জোয়েল সোবেল একটা বিশেষ মডেল উদ্ভাবন করেন যেখানে ঠিক তথ্য কাউকে জানানোটাই গেমের একটা সিদ্ধান্ত। তাঁদের মতে গেমটা খেলছেন দু’জনে। এক পক্ষের কাছে তথ্য আছে। তিনি অন্য পক্ষকে সেই তথ্য জানাবেন, তার পর নেতা এক সিদ্ধান্ত নেবেন। এই গেমে কাজ শুধু তথ্যটা জানানো, তবে প্রয়োজনে তিনি ‘স্ট্র্যাটেজিক’ হতে পারেন, নিজের চাল দিয়ে নেতাকে বিভ্রান্ত করতে পারেন, সত্যি বলার দায় তাঁর নেই। কারণ, দু’জনের মতাদর্শ আলাদা হতেই পারে।
‘ক্রফোর্ড-সোবেল’ নামে পরিচিত এই গেমটা চার দশক পরেও যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃত। স্টার্মারের টানাপড়েনের গল্পটা এই মডেলে খাপে খাপে মিলে যায়। বুশ-ব্লেয়ারের ইরাক যুদ্ধের সিদ্ধান্ত শুধু নয়, এর আগে বরিস জনসন লকডাউন করবেন কি না, তাও এ ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনার মারণশক্তিকে উপেক্ষা করে বরিস জনসন বিলেতের বিখ্যাত রেসকোর্সের মতো ‘সুপার স্প্রেডার’ খোলা রেখেছিলেন, ফলে বিলেতের অতিরিক্ত প্রাণহানি হয়।
এ ছাড়াও একটা কথা ভাবছেন নিশ্চয় স্টার্মার। সেটা হল, নিজের ঘর সামলানো। আমেরিকাতে কোনও প্রেসিডেন্ট ভুল করে যুদ্ধ করলেও গদি খোয়ান না। সমীক্ষা বলছে আমেরিকার ৭০ শতাংশ জনগণ এই যুদ্ধ সমর্থন করেন না; তবু, কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে আটকাতে পারে না, হয়তো চায়ও না।
কিন্তু, বিলেতের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে অন্তর্বর্তী নির্বাচন যে কোনও সময় হতে পারে। স্টার্মার জানেন, সামান্য ভুলেই পদ হারাতে পারেন। লেবার দলের ব্যাক-বেঞ্চার, পিছনের সারিতে বসা সাংসদরা এমনিতেই অখুশি স্টার্মারকে নিয়ে।
তবু, মানতেই হবে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টার্মার বিলেতের অর্থনীতির কিছু উন্নতি ঘটিয়েছেন। মূল্যবৃদ্ধির হার বাগে এসেছিল, তেলের দাম কমেছিল, এমনকি দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ইউরোপের তুলনায় বেশি হয়েছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এক ধাক্কায় সব উল্টে দিল। বিশ্ব জুড়ে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গেই হয়তো মূল্যবৃদ্ধির হার বাড়বে, ফলে, ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড আবার হয়তো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় ঊর্ধ্বগামী হবে। আর এই সবের জন্য বাইরের ‘ইকনমিক শক’ বা ইরান যুদ্ধকে দায়ী না করে বিলেতের জনগণ স্টার্মারকেই দুষবেন। সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে লেবারের পরাজয়ে সেই ইঙ্গিতই আছে।
বিলেতের পক্ষে আমেরিকার বন্ধুত্ব অবশ্যই গুরুত্বের। ট্রাম্পকে চটালে শাস্তিও জুটতে পারে; ঠিক যেমন, স্পেন যুদ্ধে যোগদান না করায়, ট্রাম্প তাঁদের উপর শুল্ক চাপালেন। আবার উল্টো দিকে, যুদ্ধে গেলে, বিলেতের জনগণ ক্ষুণ্ণ হবেন। মজার ব্যাপার, লেবার ও স্টার্মারকে হারিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন যে ‘রিফর্ম ইউকে’ নেতা নাইজেল ফ্যারাজ— তিনি কিন্তু ট্রাম্পেরই প্রিয় বন্ধু।
অর্থনীতি বিভাগ, কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি