পুনরায়: অসমে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন হিমন্তবিশ্ব শর্মা। ১২ মে, গুয়াহাটি। ছবি: পিটিআই।
১২ মে, ২০২৬। রেকর্ড-সংখ্যক আসনে বিজয়ী হয়ে, অসমে দ্বিতীয় বার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন হিমন্তবিশ্ব শর্মা। এ রকম নিশ্চিন্ত এবং নিশ্চিত বিজয়ের স্বাদ বিজেপি গোবলয়েও ক’বার পেয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ১২৬ সদস্যের বিধানসভায় ভারতীয় জনতা পার্টি ৮২টি আসন জিতে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬৪ আসনের সীমাই অতিক্রম করেনি, তাদের সহযোগী দল অসম গণ পরিষদ (এজিপি) এবং বড়োল্যান্ড পিপল’স ফ্রন্ট, ১০টি করে আসন জেতায় ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট’ (এনডিএ) খুব সহজে ১০০ আসনের গণ্ডি পার করেছে। অন্য দিকে, গৌরব গগৈকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ছয়দলীয় ‘অসম সম্মিলিত মোর্চা’র আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২১, কংগ্রেস একক ভাবে ১০টি আসন হারিয়ে তাদের আসনসংখ্যা ২৯ থেকে ১৯-এ নেমে এসেছে।
অসমে এ বার বিধানসভা ভোটে হিমন্তবিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপির লড়াই বিশেষ দু’টি কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এক, হিমন্তবিশ্ব শর্মা অসমের মুসলমান-প্রধান অঞ্চলগুলিকে প্রায় বাদ দিয়ে ভোটের প্রচারে স্পষ্ট বলেছিলেন, এই নির্বাচনে বিজেপি অন্তত ১০০টি আসন পাবে, যেখানে বাস্তবে বিজেপি জয়ী হয়েছে ১০৩টি আসনে। দুই, অসমে মিঁয়া মুসলমান ভোটারদের সঙ্গে কংগ্রেসের দলীয় তকমা জুড়ে, রাজনৈতিক এবং কৌশলগত দিক থেকে বিজেপি দু’ধরনের জাতি এবং ধর্মগত স্পষ্ট মেরুকরণ করতে পেরেছে। কিন্তু অসমে ভোটের আগে বিজেপির এই সার্বিক জয়ের ছবি কি কল্পনা করা গিয়েছিল? অসমের মতো বহু-সাংস্কৃতিক রাজ্যে, ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানি’ রাজনীতির মডেল বা ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তার কারণ কী? উত্তর ভারতের গোবলয়ে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী মত এবং হিন্দুত্বের ধারণা কী ভাবে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে শক্ত জমি তৈরি করতে পারল?
২০২৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির জয়ের পথ যে প্রশ্নাতীত ভাবে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল, তা-ও নয়। এক, সাধারণ মানুষের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে অসন্তোষ ছিল, কংগ্রেস যাকে সাধারণ মানুষের ‘পকেট কাটা’ বলে প্রচার করেছিল। দুই, অসমে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, বিশেষ করে চা-বাগান এবং গ্রামীণ এলাকায় চাকরির অভাব নিয়ে ক্ষোভ ছিল, যার ফলে শিল্পায়ন বা বেসরকারি ক্ষেত্রে কাজ পাওয়ার জন্য বিরোধীরা সরব ছিলেন। তিন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন প্রবর্তনের পরে, অখিল গগৈ ও লুরিনজ্যোতি গগৈ সিএএ-র মাধ্যমে ‘অসমিয়া অস্মিতা’ বিপন্ন হওয়ার ভয় দেখান, যার ফলে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় এক দিকে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, অন্য দিকে বরাক উপত্যকায় এনআরসি লিস্ট থেকে বাদ পড়া হিন্দু বাঙালিদের সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়ে সংশয় ছিল। চার, নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৪ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা যাওয়ায়, জনমানসে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তাতে ‘গোদের উপর বিষফোড়া’র মতো যোগ হয়েছিল, উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে অসমে জমি অধিগ্রহণ, কার্বি আংলং ও ডিমা হাসাও স্বশাসিত জেলা এবং বড়োল্যান্ড স্বশাসিত পরিষদ, মানে অসমের তিনটে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলের খাস জমি কিছু কর্পোরেট সংস্থাকে হস্তান্তরের পরিকল্পনা। সুযোগ বুঝে কংগ্রেসের নেতৃত্বে নির্বাচনী জোট প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তৈরি করেছিল।
কিন্তু এত সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, হিমন্তবিশ্ব শর্মার দক্ষ নির্বাচনী কৌশল অসমে তৃতীয় বার পদ্মফুল ফোটাতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এমন ভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা করেছেন, যাতে তাঁর পরাজয় কাঠামোগত ভাবে প্রায় অসম্ভব করে তোলা যায়। এই কৌশলগত পদক্ষেপের মধ্যে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ছিল, ডিলিমিটেশন বা সীমানা নির্ধারণ। ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশন অসমের বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলির যে পুনর্গঠন করেছে, তাতে জনতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিজেপির ক্ষমতা ধরে রাখাকে সহজ করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন ভাবে সীমানা টানা হয়েছে যাতে বিজেপি-বিরোধী ভোটব্যাঙ্ক (বিশেষত সংখ্যালঘু ভোট) ভাগ হয়ে যায়। হিমন্তবিশ্ব শর্মা এই প্রক্রিয়াকে ‘খিলঞ্জিয়া’ (ভূমিপুত্র) অসমিয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার হাতিয়ার হিসাবে তুলে ধরেছেন। সীমানা নির্ধারণের ফলে প্রায় ৯৫-১০০টি বিধানসভা আসন এমন ভাবে সাজানো হয়েছিল, যেখানে হিন্দু অসমিয়া এবং জনজাতিভুক্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে। হিমন্তবিশ্ব শর্মা প্রচার করেছিলেন, এই সীমানা নির্ধারণ না করলে অসমের বিধানসভা ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’দের দখলে চলে যেত। এই বয়ান সরাসরি ব্যালট বাক্সে বিজেপির পক্ষে প্রতিফলিত হয়েছে। কার্বি আংলং, ডিমা হাসাও এবং বড়োল্যান্ড স্বশাসিত জেলাগুলোতে তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্তদের জন্য সংরক্ষিত আসনের রদবদলও বিজেপির পক্ষে কাজ করেছে। বিজেপি তাদের ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে,অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলেও জনজাতিভুক্তদের বিশেষ অধিকার ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। হয় বিজেপি আঞ্চলিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করেছে, অথবা আসনের বিন্যাস এমন ভাবে করেছে, যাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সমীকরণ বিজেপির জোটসঙ্গীদের পক্ষে থাকে।
এই নির্বাচনের আগে হিমন্তবিশ্ব শর্মা মূলত ‘মিঁয়া’ বা অভিবাসী মুসলিমদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযানগুলিকে প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসাবে নয়, বরং অসমের ‘খিলঞ্জিয়া’ বা ভূমিপুত্রদের জমি ও অধিকার রক্ষার লড়াই হিসাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি প্রচার করেছিলেন, সরকারি জমি, বনভূমি এবং মঠের জমি জবরদখল মুক্ত করা অসমিয়া পরিচিতি রক্ষার জন্য অপরিহার্য, না হলে নাকি অসমের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।
উচ্ছেদ অভিযানে বুলডোজ়ারের ব্যবহার ও কঠোর আইনি অবস্থান তাঁকে এক জন দৃঢ়চেতা নেতা হিসাবে পরিচিতি দিয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় ফিরে এলে তাঁর সরকার তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’দের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আরও ৫ লক্ষ বিঘা জমি দখলমুক্ত করবে। সুপ্রিম কোর্টের রায় বনভূমি উচ্ছেদে রাজ্য সরকারকে আইনি সমর্থন দিয়ে তাঁর নীতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানের ফলে কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ-এর মতো বিরোধী দলগুলোর শক্ত ঘাঁটি বা ভোটব্যাঙ্ক নষ্ট হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে ভোটারদের স্থানান্তরের ফলে বিরোধী শক্তির মেরুদণ্ড দুর্বল হয়েছে, যা পরোক্ষ ভাবে বিজেপিকে নির্বাচনী সুবিধা দিয়েছে। এই ধরনের মেরুকরণ হিন্দু ভোটারদের একটা বড় অংশকে বিজেপির পতাকার তলায় একত্রিত হতে সাহায্য করেছে। মিঁয়া মুসলিমদের ভোট আগে কংগ্রেস এবং বদরুদ্দিন আজমলের এআইইউডিএফ-এর মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। যদিও ২০২৪ এবং ২০২৬ সালে কংগ্রেস এই ভোটের এক বড় অংশ নিজের দিকে টানতে সফল হয়েছে। কিন্তু হিন্দু-প্রধান এবং জনজাতীয় এলাকায় কংগ্রেসের এই ‘মিঁয়া বান্ধব’ ভাবমূর্তি ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে সামগ্রিক ভাবে তাদের ক্ষতি করেছে।
এ বারের ‘হিমন্ত ম্যাজিক’-এর পিছনে কাজ করেছে আর একটি বিষয়, অসমের ‘ডেভলপমেন্ট’ এবং ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ (ডিবিটি), যার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে গিয়েছেন। ২০২১ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে শর্মার সরকার ৪০-এরও বেশি প্রকল্প পরিচালনা করেছে, যা অসমের ৭৫ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সফল হল অরুণোদয় প্রকল্প, যার ফলে ৩৮-৪০ লক্ষ পরিবারের মহিলারা মাসে নগদ টাকা পাচ্ছেন। মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি এই আর্থিক সহায়তা, মহিলা ভোটারদের মধ্যে বিজেপির এক বিশ্বস্ত ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছে।
অসমের নির্বাচনে চা-শ্রমিকরা প্রায় ৩৫-৪০টি আসনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন, কিন্তু এত বছর অসমে বসবাসের পরেও তাঁদের কাছে জমির পাট্টা ছিল না, তাঁদের মজুরিও ছিল অত্যন্ত কম। নির্বাচনের আগে রাজ্য সরকার চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৫০০ টাকার করার প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রায় ৩.৫ লক্ষ চা-শ্রমিক পরিবারকে জমির পাট্টা বা মালিকানা দেওয়ার উদ্যোগ করে। হাজার হাজার অসমিয়া ভূমিপুত্রকে ‘মিশন বসুন্ধরা’র মাধ্যমে দ্রুত পাট্টা দেওয়া হয়েছে। এটি খিলঞ্জিয়া ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য তৈরি করেছে। তাই এক দিকে মিঁয়া মুসলমানদের উচ্ছেদ করে জমি দখলমুক্ত করা, এবং অন্য দিকে ভূমিপুত্রদের সেই জমির আইনি অধিকার দেওয়া, এই দ্বিমুখী কৌশল তাঁকে আদিবাসী ও অসমিয়া ভোটারদের মধ্যে ‘ত্রাতা’ হিসাবে তুলে ধরেছে।
ইতিহাসগত ভাবে, অসমিয়াদের শত্রু হিসাবে বিবেচিত হতেন তথাকথিত অ-অসমিয়া তিন বহিরাগত সম্প্রদায়। কিন্তু, এ বারের ভোটে সেই সমীকরণ একেবারে পাল্টে গেছে। বিজেপির ‘জাতি-মাটি-ভেটি’ (জাতি, মাটি, ঘর) রক্ষার স্লোগান প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যে, একমাত্র বিজেপির অধীনেই অসমের ভূমিপুত্ররা সুরক্ষিত থাকবে। অসমে এক সময় ‘অসমিয়া অস্মিতা’ ছিল প্রধান রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। কিন্তু হিমন্তবিশ্ব শর্মা সুকৌশলে এই আঞ্চলিক আবেগকে ‘বৃহত্তর হিন্দু পরিচিতি’ ও ‘সনাতনী সভ্যতা’ রক্ষার লড়াইয়ের সঙ্গে মিশিয়েছেন। সফল হয়েছেন বোঝাতে যে, বিজেপি ছাড়া অসমিয়াদের অস্তিত্ব বিপন্ন।
ইতিহাস বিভাগ, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়