এক মাস আগের ঘটনা। পুরুলিয়া জেলার পাড়া থানার প্রত্যন্ত গ্রাম চাপুড়ি’তে ৩৭ বছরের এক জনজাতিভুক্ত মহিলা ডাইনি সন্দেহে নৃশংসভাবে খুন হন। মহিলার ভাশুর, ভাশুরের স্ত্রী, দেওর-সহ মোট ছ’জন এই খুনে অভিযুক্ত। ওই থানার অন্য এক গ্রামে সাম্প্রতিক কালে ডাইনি সন্দেহে খুন হয়েছেন। বীরভূমের গ্রামেও জনজাতিভু্ক্ত নারী খুন হয়েছেন এবং মানসিক প্রতিবন্ধী এক তফসিলি নারীকে ডাইনি সন্দেহে উলঙ্গ করে গ্রাম ঘোরানো হয়েছে বছর দুই আগে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাইনি সন্দেহে যাঁদের দাগিয়ে দেওয়া হয়, তাঁরা নিম্নবর্গের শ্রমজীবী, বয়স্ক, বিধবা ও অবিবাহিতা নারী। ডাইনি সন্দেহে অত্যাচারের নানা নৃশংস রূপ— বেত্রাঘাত, ধর্ষণ বা অঙ্গচ্ছেদ ইত্যাদি। মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে বেঁচে যাওয়া বহু মহিলা গলায় দড়ি দিয়ে বা বিষ খেয়ে অথবা কখনও গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন; কখনও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। প্রাণে বেঁচে যাওয়া অসংখ্য নারীকে একঘরে হয়ে এবং ক্রমাগত হুমকির মধ্যে জীবন কাটাতে হয়।
সপ্তদশ শতকে, ইউরোপ জুড়ে ‘উইচ-ক্র্যাফট’ সন্দেহে বহু মানুষকে বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ঔপনিবেশিক নিউ ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড বা নরওয়ে জুড়ে ডাইনি-অভিযোগে বিচার, অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ডের অন্ধকারময় ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরনো। শিক্ষার প্রসার ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বহু দেশ থেকে এই কুপ্রথা মুছে গেলেও, ভারতবর্ষ-সহ সাহারা, পাপুয়া নিউ গিনি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার একাধিক দেশে এখনও ডাইনি সন্দেহে অত্যাচার আছে। ডাইনি সন্দেহের পিছনে থাকে পরিবারে কারও অসুখ হওয়া, ফসল নষ্ট, গবাদি পশুর মৃত্যু কিংবা অজানা রোগের প্রাদুর্ভাব ইত্যাদির মতন ঘটনা। কখনও, সম্পত্তি-জমি দখল করা বাব্যক্তিগত কোনও স্বার্থসিদ্ধি অথবা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে ডাইনি প্রতিপন্ন করা হয়। ডাইনি অপবাদকে সিলমোহর দেয় স্থানীয় মতলববাজ ওঝা’রা।
অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, নিরক্ষরতা এবং শরীরস্বাস্থ্য, রোগব্যাধি সম্বন্ধে অজ্ঞতা ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে বহুকাল ধরে ডাইনি নির্যাতন টিকে আছে। ‘সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত নেতৃত্বে থাকা ‘মাঝি–বাবা’রা অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাসক দলের অধীনে থাকেন বলে, অত্যাচারিত গ্রামবাসীরা নিজেদের সমাজে ন্যায়বিচার পান না, অন্য দিকে পুলিশের কাছে যেতেও সাহস পান না।’ পুরুলিয়ার সাম্প্রতিক ডাইনি সন্দেহে খুনের ঘটনায় এমন কথা ‘আদিবাসী অধিকার মঞ্চ’-এর অল ইন্ডিয়া ও পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে সরকারি কোনও সচেতনতামূলক প্রচার নেই; তাই আদিবাসী সমাজের কিছু অংশ থেকে এই কুপ্রথা দূর হচ্ছে না।
ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ভারতবর্ষের ঝাড়খণ্ড, অসম, বিহার, ছত্রিসগঢ়, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ডাইনি প্রথার ব্যাপক প্রচলন। এ ছাড়াও, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের প্রান্তিক এলাকায় বিশেষত জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে এই কুপ্রথা আজও রয়েছে। ভারতবর্ষে ডাইনি-বীভৎসতা নিষিদ্ধ করার কোনও কেন্দ্রীয় আইন নেই। কয়েকটি রাজ্যে ডাইনি নৃশংসতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন প্রণয়ন ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আছে। যদিও সেই সব রাজ্যে আইনের প্রয়োগ বহু ক্ষেত্রেই দুর্বল। তাই, আইন প্রয়োগেও অপরাধ কমেনি। তবে, পশ্চিমবঙ্গে এই জাতীয় কোনও আইন এখনও পর্যন্ত নেই।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৬৬৩ জন নারীকে ডাইনি অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে— গড়ে বছরে ৯৫ জন। শুধু ঝাড়খণ্ডেই ২০১৫-২০২০’র মধ্যে ডাইনি প্রথা প্রতিরোধ আইনের অধীনে ৪,৫৫৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়— অর্থাৎ দিনে গড়ে দু’টির বেশি ঘটনা। তবে, রিপোর্ট করা সংখ্যার বাইরেও বহু না-রিপোর্ট হওয়া ঘটনা থাকে। কারণ, দূরবর্তী এলাকায় ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা পুলিশের কাছে রিপোর্টই হয় না বা কখনও নিজেদের সমাজের মধ্যে মীমাংসা করে নেওয়া হয়।
একবিংশ শতাব্দীতেও বহু আদিবাসী বা নিম্নবর্ণের দরিদ্র এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছয়নি। প্রকৃতির চেয়েও যাঁদের কাছে নিজেদের দেবতা বেশি শক্তিশালী, মাধ্যাকর্ষণের চেয়েও শয়তানই সত্য ও সর্বব্যাপী, সেই সব জায়গায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম আয়োজন আশু প্রয়োজন। এই উদ্যোগে তফসিলি জাতি ও জনজাতি গোষ্ঠী থেকে উঠে আসা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক, অধ্যাপক, প্রশাসক, গবেষক, ডাক্তার প্রমুখের অংশগ্রহণ অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে। স্থানীয় নিম্নবর্গীয় তফসিলি জাতি ও জনজাতি গোষ্ঠী থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
পাশাপাশি, ওই এলাকায় বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী এবং সংগঠনের জেলা সদস্যদের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন অত্যাবশ্যক। আঞ্চলিক ভাষায় ছবি, কার্টুন, পটচিত্র, নাটক, শর্টফিল্ম, ভিডিয়ো ইত্যাদি দেখিয়ে রোগ-অসুখ কেন হয়, কী করে রোগ সেরে ওঠে এবং স্বাস্থ্য সচতনতার প্রাথমিক কথা সহজ ভাবে জনজাতি গোষ্ঠীর ছোটবড় সবাইকে শোনাতে হবে।
বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। এত সমাজসেবী, বিজ্ঞান-ক্লাব, বিজ্ঞান পড়ুয়া ও শিক্ষক, অধ্যাপক দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও সমাজ নিয়ে এত পত্রপত্রিকা, আলোচনা, লেখালিখি চলছে। তবু স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও ডাইনি সন্দেহে নির্যাতন ও খুনের যুগ শেষ হয় না! কুসংস্কার দূর করা ও বিজ্ঞান সচেতনতার প্রয়াস না করলে, এই অন্ধকার শেষ হতে বহু প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে।