রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। স্কুলশিক্ষা, উচ্চশিক্ষা দফতরে নতুন মন্ত্রীরা নিযুক্ত হয়েছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে নতুন বাজেটে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও যথেষ্ট নয়। ক্রমশ সমস্যার সমাধান মিলবে, এমন আশা করছেন ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবকরা। ইতিমধ্যেই এ রাজ্যে পিএম-শ্রী স্কুল প্রকল্প চালু করতে কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দেশের কয়েকটি অবিজেপি রাজ্য সরকার, যার মধ্যে তৃণমূল-শাসিত পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম, এই প্রকল্পে সায় দেয়নি বলে তাদের সমগ্র শিক্ষা অভিযানের টাকা কেন্দ্র আটকে দিয়েছিল। পালাবদলের পরে ওই প্রকল্প চালু করার সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে কেন্দ্র।
পিএম-শ্রীর উদ্দেশ্য হল দেশ জুড়ে ১৪৫০০ মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা, যার থেকে লাভবান হতে পারবে ২০ লক্ষ শিক্ষার্থী। এই প্রকল্প কার্যকর করার মেয়াদ ২০২২-২৩ থেকে ২০২৬-২৭ পর্যন্ত। অর্থাৎ রাজ্যের হাতে অবশিষ্ট রয়েছে আর মাত্র কয়েক মাস। তার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু স্কুল এ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে। সরকারের দাবি, এ সব স্কুলে উন্নত শেখার মান, আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশের উপর জোর দেওয়া হবে, যাতে সেগুলি হয়ে উঠতে পারে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ -র ‘শো-কেস’। এই সব লক্ষ্য কার্যকর হবে মেনে নিলেও প্রশ্ন থাকে, দেশের ২৪.৮ কোটি স্কুল পড়ুয়ার মধ্যে ২০ লক্ষ সংখ্যাটা কি খুব নগণ্য নয়? বাকি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কী? এই মডেল স্কুলগুলির বাইরে সারা দেশে যে লক্ষ লক্ষ স্কুল আছে সেগুলোর হাল ফিরবে কী করে?
কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের স্কুলশিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগের একটি উদ্যোগ ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্প। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্প উদ্বোধন করতে গিয়ে “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস”-এর সঙ্গে “সবকা প্রয়াস”-এর সঙ্কল্প নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রকল্পটির ঘোষিত উদ্দেশ্যেই আছে, একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানী, সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, স্বনিযুক্ত ও বেতনভোগী পেশাজীবী, গৃহপালনকারী মহিলা, ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য প্রমুখ দেশের যে কোনও সরকারি বা সরকারি-সহায়তাপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। “আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবকরা পরিকাঠামোর জন্য উপকরণ প্রদান করতে পারবেন, শিক্ষণে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতা ভাগ করে নিতে পারেন। যাঁদের কথা এখানে বলা হয়েছে তাঁরা প্রয়াসী হলে কেউই আপত্তি করতে পারেন না। কিন্তু এই প্রয়াসের উপরই যদি স্কুলশিক্ষার মরণ-বাঁচন নির্ভর করে তা হলে দুশ্চিন্তা না করে উপায় নেই। বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প রূপায়িত হয়েছে এমন ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে এক-শিক্ষক বা দুই-শিক্ষক স্কুলের সংখ্যা, সেগুলিতে ন্যূনতম পরিকাঠামোর অভাব, আতঙ্ক জাগাতে বাধ্য। তা ছাড়া, স্বেচ্ছাসেবকের মোড়কে যাঁদের স্কুলে ‘জ্ঞান ও দক্ষতা ভাগ করে নিতে’ বেছে নেওয়া হবে, তাঁরা কোনও এক বিশেষ রাজনীতিতে দীক্ষিতলোক হবেন না তো? কিশোর-কিশোরীদের মনের উপর কারা প্রভাব বিস্তার করবে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
২০২৩ সালে ভূতপূর্ব শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বিধানভায় বলেছিলেন প্রাথমিকে শূন্যপদের সংখ্যা ১,৮৯,০০০, যার পরে বাস্তবে কোনও নিয়োগ হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এই সংখ্যা ৬০ হাজারেরও বেশি। এই আড়াই লক্ষ শিক্ষক পদ পূরণ করতে কত সময় লাগবে, এখনও অজানা। অগণিত স্কুলে শিক্ষক ছাড়াই অঙ্ক ও বিজ্ঞান বিভাগ চলছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সিমেস্টারও চালু হয়েছে, জাতীয় শিক্ষানীতির বাধ্যবাধকতায়। দীর্ঘ দিনের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা থেকে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ ভেবে আঁতকে উঠি।
এ রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি নতুন সমস্যা, বাবা-মা পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে ভিন রাজ্যে যাওয়ায় সন্তানের স্কুলশিক্ষায় ছেদ। নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। যদি ধরা যায় যে নতুন শিল্প, কলকারখানা এ রাজ্যের নিয়োগচিত্রে পরিবর্তন আনবে, তা হলেও তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অদূর ভবিষ্যতে চিত্রের আমূল পরিবর্তন হবে, তা নিশ্চয়ই সরকারের অতি বড় সমর্থকও প্রত্যাশা করছেন না। শ্রমিকের যাত্রা চলবেই, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মাকে এক সঙ্গে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে হবে। তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা সম্ভব কেবলমাত্র যদি স্কুলে স্কুলে ছাত্রাবাস গড়ে ওঠে। পরিবার-প্রতিবেশে নানা অস্থিরতার জন্য স্কুলের সঙ্গে হস্টেল এখন একান্ত আবশ্যক।
তৃণমূল আমলে দীর্ঘ দিন সরকারি সাহায্যে চলা কলেজগুলির পরিচালন সমিতি নির্বাচন না করে ফেলে রাখা হয়েছিল, যা অগণতান্ত্রিক। বর্তমান সরকার সমস্ত কলেজের পরিচালন সমিতি ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। এক-এক জন প্রশাসকের হাতে ৮-১০টি কলেজের দায়িত্বভার: কতটা সুবিচার তাতে সম্ভব জানা নেই। ভাল হত যদি সরকার পরিচালন সমিতি নির্বাচনের সময়সীমা বেঁধে দিত, যা ২২ মে তারিখের নির্দেশিকায় অনুপস্থিত। এমন প্রশাসক-নির্ভর ব্যবস্থা দীর্ঘ দিন চলা বাঞ্ছনীয় নয়। বিগত দুই সরকারের সময় শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফল এ রাজ্য দেখেছে। আর তা কাম্য নয়।