Adi ganga

দাও ফিরে ঐতিহ্য-নদী

সম্প্রতি আদি গঙ্গা পরিষ্কার রাখার উদ্যোগে কালীঘাটের গঙ্গার ঘাট পরিষ্কার, সেখানে আধা-আধ্যাত্মিক কার্যক্রম দেখা গিয়েছে।

মোহিত রায়
শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৬:২১
রুদ্ধ: আদিগঙ্গার মাঝ দিয়ে মেট্রো রেলব্রিজের স্তম্ভ

রুদ্ধ: আদিগঙ্গার মাঝ দিয়ে মেট্রো রেলব্রিজের স্তম্ভ

হে  শহর, হে ধূসর শহর!/কালীঘাটের ব্রীজের উপর কখনও কি শুনতে পাও/লম্পটের পদধ্বনি...’ সমর সেনের কাছে মাপ চেয়ে,গড়িয়া রেলব্রিজের উপরে সত্যিই শুনতে পাই, ট্রেনের কামরায় গুমগুম ধাতব আর্তনাদ, নীচে বইছে আদি গঙ্গা। শুনতে পাই, কেননা এখানেই আদি গঙ্গার পথ বিভ্রান্ত। আদি গঙ্গার ম্রিয়মাণ ধারা চলেছে পূর্ব দিকে বিদ্যাধরী নদীর খোঁজে। অথচ আদি গঙ্গা গড়িয়া ছুঁয়ে চলে যেত দক্ষিণে, বোড়াল, তাজপুর, কোদালিয়া, বারুইপুর, মজিলপুর, সূর্যনগর হয়ে চলত সাগরপানে। এখন আদি গঙ্গা মানে বর্তমান গঙ্গার হেস্টিংস থেকে বেরিয়ে আসা টালির নালা, মহাতীর্থ কালীঘাট ছুঁয়ে যার আপাতত বিরাম টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া মেট্রোর স্তম্ভরাজির প্রবল প্রহারে। এই টুকরো আদি গঙ্গাকে নির্মল রাখার জন্য চলছে হরেক প্রয়াস, কিন্তু যেন ভুলে যাওয়া হচ্ছে আদি গঙ্গার পূর্ণ প্রবাহের কথা।

সম্প্রতি আদি গঙ্গা পরিষ্কার রাখার উদ্যোগে কালীঘাটের গঙ্গার ঘাট পরিষ্কার, সেখানে আধা-আধ্যাত্মিক কার্যক্রম দেখা গিয়েছে। জনপ্রতিনিধি নাগরিকদের সচেতন করার চেষ্টা করছেন। সবই সাধু প্রয়াস, তবে প্রধান সমস্যা সমাধানে তার বিশেষ ভূমিকা নেই। আদি গঙ্গার দু’টি প্রধান সমস্যা, নদীর জলের মান ও নদীর প্রবাহ।

কলকাতা পুরসভার খাতায় আদি গঙ্গা এখনও টালির নালা। শহরের অন্যান্য নালার মতোই এটি অত্যন্ত নোংরা, দূষিত। এই দূষণ কেবল নাগরিকদের বর্জ্য নিক্ষেপের জন্য নয়, এর প্রধান কারণ দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন নালার বর্জ্য জল নদীতে ফেলা। টালির নালা বা আদি গঙ্গা জোয়ার-ভাটাচালিত নদী, ফলে মিশ্রিত বর্জ্য দুই দিকেই ধাবিত হয়।

এই জল দূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০২৪ সালে কলকাতা পুরসভা কেন্দ্রীয় সরকারের নমামি গঙ্গে কার্যক্রমের অনুমোদন পেয়ে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সহায়তায় আটশো কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সংক্ষেপে এই প্রকল্পের প্রধান কাজগুলি হল— এক, ৫০ কিলোমিটার নতুন নলব্যবস্থা তৈরি করে সব বর্জ্য জলকে নদীতে না ফেলে বর্জ্য জল শোধন কেন্দ্রগুলিতে পাঠানো। দুই, তিনটি নতুন বর্জ্য জল শোধন কেন্দ্র স্থাপন। তিন, নদীপার্শ্বের তেইশটি পাম্পিং স্টেশনের উন্নয়ন। চার, এই নদী খাতের পলি ও বর্জ্যের উত্তোলন (ড্রেজিং)। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর মাসে এই বিপুল প্রকল্পটির দায়িত্ব পেয়েছে গাজ়িয়াবাদের একটি এঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। এদের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ২০২৬-এর শেষে। কিন্তু একেবারে বর্তমান সময়ে এই কাজের খুব একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে খবর নেই। এই প্রকল্পের কাজের কতটা সম্পন্ন হচ্ছে, তার তথ্য জনসমক্ষে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে সর্বস্তরে যে বিপুল দুর্নীতির খবর এখন প্রতি দিন প্রকাশ পাচ্ছে, সেখানে এই আটশো কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও নতুন দুর্নীতির খবর বেরোলে কেউ আশ্চর্য হবেন না।

এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে আদি গঙ্গার জল টালিগঞ্জ পর্যন্ত হয়তো অনেকটাই নির্মল হবে, কালীঘাটে পুজো দিয়ে বা কেওড়াতলায় শবদাহ শেষে গঙ্গার জল মাথায় দিতে আর ঘেন্না করবে না, হেস্টিংস থেকে টালিগঞ্জের দু’পাড়ের মানুষদের এক দূষিত দুর্গন্ধের নালা থেকে নিষ্কৃতি, নদীর জলে ফিরবে জলীয় বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্রের অস্তিত্ব। কিন্তু আদি গঙ্গা কি ফিরল? না। আদি গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, এটি দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্য নদী, এটি মঙ্গলকাব্যের নদী, শ্রীচৈতন্যদেবের নদী।

কলকাতার দক্ষিণে গড়িয়া থেকে দু’-আড়াই কিলোমিটার দূরে কামালগাজি থেকে একটি নদী হঠাৎই শুরু হয়ে গেছে। তার দু’পাশ দিয়ে অনেকটা সুন্দর মোটরপথ। এই নদী সোজা চলে গিয়েছে বারুইপুর পেরিয়ে শাসন কীর্তনখোলা সূর্যপুর, উত্তরভোগ পেরিয়ে মিশে যাচ্ছে গঙ্গা বদ্বীপের নদীর শাখা জালে। এটিই আদি গঙ্গা। ২১ ডিসেম্বর ২০০০-এর একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে একটি মানচিত্র সহযোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগর উন্নয়ন বিভাগ জানিয়েছিল যে, আদি গঙ্গার হেস্টিংস থেকে গড়িয়া ১৫.৫ কিমি পর্যন্ত সংস্কার করে নৌচালনার উপযোগী করে তোলা হবে খুব শীঘ্রই। দক্ষিণবঙ্গের পুরনো দিনের মানুষদের এই আদি গঙ্গার পথে দেশের বাড়ি যাওয়ার কথাও মনে আসবে, শিবনাথ শাস্ত্রী তো এই নদীপথেই দেশে ফিরতেন। আর আধুনিক যুবরাও ভাবতেই পারেন, আর রাস্তার ধুলো নয়, ট্র্যাফিক জ্যাম নয়, আদি গঙ্গায় স্পিড বোট নিয়ে নদীর হাওয়া খেতে খেতে গড়িয়া পেরিয়ে বারুইপুর হয়ে সোজা চলে যাওয়া যায় নদীপথে একেবারে বঙ্গোপসাগরে। মাঝে তিন কিলোমিটার আবার খনন করতে হবে কোনও ভগীরথকে। আদি গঙ্গা শ্রীচৈতন্যময়, এই নদীপথেই এসেছিলেন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান চৈতন্যদেব। তাঁর অবতরণকে স্মরণ করে এখনও কলকাতার বুকেই রয়েছে বৈষ্ণবঘাটা। বারুইপুরে রয়েছে আদি গঙ্গার কটকি ঘাট, যেখানে চৈতন্যদেব নীলাচলের দিকে যাত্রা করেন, আরও দক্ষিণে তাঁর পদচিহ্নে ধন্য ছত্রভোগ। চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যতরী সাগরে যাওয়ার পথও ছিল এই নদী।

এই রকম ঐতিহ্য-নদীকে ধ্বংস করে দিলেন ইতিহাস-ঐতিহ্য পরিবেশ-অজ্ঞ মেট্রো রেলের পরিকল্পনাকার ও ইঞ্জিনিয়াররা। তিনশো স্তম্ভ গাঁথলেন এই ঐতিহ্য-নদীর উপর, রুদ্ধ হল প্রবাহ, বন্ধ হয়ে গেল নদীপথে যাতায়াতের পথ, প্রতিটি স্তম্ভ হল পলি বর্জ্য জমার স্থল। একেবারে শেষে এই ঐতিহ্য-নদী অদৃশ্য হয়ে গেল মেট্রো স্টেশনের নীচে। ভাবুন তো, ব্রিটেনে আভন নদীর বুকে এ সব কেউ করছে। এই পরিকল্পনার প্রতিবাদ করেছিলেন কলকাতার পরিবেশকর্মীরা, আদালতে মামলা হয়েছিল। হাস্যকর বিষয় হল, ভারতে যে কোনও প্রকল্প করতে পরিবেশ ছাড়পত্র লাগে, শুধু রেলওয়ের লাগে না, সে তারা পাহাড় নদী যা-ই ধ্বংস করুক। কেন্দ্রে সরকার পাল্টেছে, কিন্তু রেলওয়ের পরিবেশ ধ্বংসের অধিকার অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

এক বৃদ্ধ মানুষ তাঁর শৈশবে এ নদীতে ডুবে যাচ্ছিলেন। পরিণত বয়সে তিনি দেখলেন সেই টলটলে নদী হয়ে গিয়েছে কালো জলের নর্দমা। সেই রেবতীরঞ্জন ভট্টাচার্য (প্রয়াত) অবসরের পর তাঁর মাতৃসমা এই নদীর জন্য একাই শুরু করলেন এক নিরলস সংগ্রাম। শেষ পর্যন্ত রেবতীবাবুর লেখা একটি পোস্টকার্ড গিয়ে পড়ল কলকাতা উচ্চ আদালতের গ্রিন বেঞ্চে। সে চিঠিকে রিট পিটিশন হিসেবে গণ্য করে বিচারপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করলেন আদি গঙ্গা সংস্কারের মামলা ১৯৯৬-এর শেষে। এক বৃদ্ধ মানুষের প্রায় একক সংগ্রামে আদি গঙ্গা সংস্কারের প্রাথমিক কাজটি শুরু হল। সেই শুরু, কিন্তু তার কয়েক বছর পর শুরু হল মেট্রো রেলের আক্রমণ। দূষিত নদীর বেঁচে ওঠার শেষ আশাটাও প্রায় রইল না।

এ ভাবেই হারিয়ে গিয়েছিল চিয়ংগিচিয়ন নদী— দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সোলের আদি গঙ্গা। চিয়ংগিচিয়ন একটি ছোট নদী, দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সোল শহরের আপন নদী। কয়েকশো বছর আগে একে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল সোল শহর, আধুনিক সোল শহরের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চিয়ংগিচিয়ন হয়ে উঠল দূষিত জলধারা, নদী হল শহরের নর্দমা। তার পর ১৯৭০-এ সেই নর্দমার উপরে বানানো হল রাজপথ, পরে সেই রাজপথের উপর ছয় লেনের বিরাট উড়ালপুল। ২০০০ সালে ভেঙে ফেলা হল সেই উড়ালপুল, আর রাজপথ। এখন আবার মহানগরের মাঝে বইছে ঐতিহ্যবাহী চিয়ংগিচিয়ন নদী, পাড়ে ঘাসের বন, উড়ছে ফড়িং, বসে আড্ডা দিচ্ছে কোরীয় যুবা থেকে বৃদ্ধরা। গিয়েছিলাম, কিছু ক্ষণ বসেছিলাম সেখানে, মনে ভাসছিল আদি গঙ্গার কথা।

আদি গঙ্গার ঐতিহ্যবাহী ধারা ফেরানো কিন্তু খুব দুরূহ নয়। নদীর বুক থেকে মেট্রো রেলের স্তম্ভগুলি সরিয়ে রেলপথকে ধরে রাখবে নদীর দু’পাশে নির্মিত উপযুক্ত স্তম্ভ। এটি এখন নির্মাণ প্রযুক্তির কাজ। তার পর তিন কিলোমিটার খাত খনন করে আদি গঙ্গাকে বাকি ধারার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া।

ষাট-সত্তর দশকের দক্ষিণ কলকাতার আদি গঙ্গা তীরবর্তী মানুষেরা এখনও মনে করতে পারেন নদীর জীবনের শেষ দিনগুলি। কালীঘাটের বাসিন্দা কৃষ্ণা বলছিলেন, রাত আটটার পর কত গল্প-গান হত গঙ্গার চাতালে বসে। দিনের বেলায় যেত খড়ের নৌকা, মাটির হাঁড়ির নৌকা, টালির নৌকা। বর-বৌয়ের নৌকা গেলে হুড়োহুড়ি করে পাড়ে যাওয়ার পালা।

সজীব হয়ে উঠুক মন্দিরের ঘাটগুলি। আদি গঙ্গার ধারা বেয়ে আবার আমরা যাই সাগর-পথে।

আরও পড়ুন