মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পনেরো বছরের শাসনকাল পূর্ণ হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গে টানা দ্বিতীয় দীর্ঘতম শাসনের নিরিখে কংগ্রেসকে ছুঁতে হলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জিততে হবে তৃণমূলকে। আর বামফ্রন্টের দীর্ঘতম শাসনের রেকর্ড ভাঙতে হলে শুধু ২০২৬ নয়, জিততে হবে তার পরবর্তী দু’টি বিধানসভা নির্বাচনেও, প্রত্যাশিত ভাবে যেগুলি ২০৩১ ও ২০৩৬ সালে আয়োজিত হবে।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসঙ্ঘ গঠনের সূত্রপাত আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দক্ষিণ কলকাতার বাসভবনে— স্বাধীনতার অনতিবিলম্বে, তাঁর পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। কিন্তু নির্বাচনী প্রাঙ্গণে, ১৯৫২-র প্রথম লোকসভা নির্বাচনে ২টি আসনে এবং বিধানসভায় ৯টি আসন জয়ের পর, জনসঙ্ঘের দ্বিতীয় বার সাফল্য আসে আরও চারটি নির্বাচন পর— ১৯৭৭ সালে, জনতা জোটের অংশ হিসাবে। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর জনসঙ্ঘের পূর্বতন সদস্যরা গঠন করেন বিজেপি। নির্বাচনে, বিজেপি অন্যান্য প্রদেশে— মূলত দেশের উত্তর এবং পশ্চিম প্রান্তে— ধীরে ধীরে সাফল্য লাভ করলেও, পশ্চিমবঙ্গ ব্যতিক্রমই থেকে যায়।
এ রাজ্যে বিজেপির আসনসংখ্যা ২০১৪ পর্যন্ত লোকসভায় দু’টি কিংবা তার কমে, এবং ২০১৬ অবধি বিধানসভায় তিন বা তার কমে সীমাবদ্ধ থাকে। রাজ্যে বিজেপির পালে হাওয়া লাগে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে— নির্বাচিত সাংসদের সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে ১৮-তে পৌঁছয়। আর বিধানসভায়, ২০২১-এ আসনসংখ্যা তিন থেকে বেড়ে হয় ৭৭। তার পর ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে জয়ী আসনের সংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১২-তে পৌঁছয়— প্রশ্ন হল, তা কি রাজনীতির গতানুগতিক চাপানউতোর, না একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষণ? আর মাস চারেকের মধ্যেই উত্তর পাওয়া যাবে।
রাজনৈতিক প্রবণতার দিক থেকে একটি বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ কার্যত গোটা দেশেই ব্যতিক্রম— দীর্ঘ সময় ধরে একই রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার ঐতিহ্য রয়েছে এই রাজ্যের। ইংরেজিতে যাকে বলে অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি— অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ— পশ্চিমবঙ্গেও কাজ করে, তবে সাধারণত তা স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় এক থেকে দেড় দশক, বা তারও বেশি সময় পরে। স্বাধীনতার পরে রাজ্যের মানুষ কংগ্রেসকে দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর শাসনের সুযোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত তিরিশ বছর সময়কালে শুধু ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যে তিন বার মুখ্যমন্ত্রী বদল, এবং দু’দফা রাষ্ট্রপতি শাসন বাদ দিলে বাকি সময়টা কংগ্রেসের শাসন ছিল। জরুরি অবস্থার পর দু’মাসেরও কম সময় ছিল রাষ্ট্রপতি শাসন। তার পর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকারকে নির্বাচিত করেন। প্রথমে জ্যোতি বসুর অধীনে ২৩ বছরেরও বেশি সময়, এবং পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অধীনে ১০ বছরেরও বেশি সময়, সিপিএমের শাসনকাল মোট ৩৪ বছর ধরে বিস্তৃত ছিল।
অতঃপর প্রশ্ন, তিন দফা শাসনের পর কি মানুষ ফের তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতায় ফেরাবেন? কঠিন প্রশ্ন। তবে কয়েকটি তথ্য এ প্রসঙ্গে মূল্যবান। প্রথমত, লক্ষ্মীর ভান্ডার, সবুজ সাথী, নিজশ্রী, দুর্গাপূজার জন্য লক্ষাধিক টাকা বরাদ্দ করার মতো অগণিত প্রকল্পের মাধ্যমে ‘মা-মাটি-মানুষ’এর সরকার জনকল্যাণ এবং মানুষের মন জয়— দু’টিই এক সঙ্গে করার চেষ্টা করেছে। অনুমান করা চলে, তৃণমূল নির্বাচনে এর প্রতিদান আশা করছে। পাশাপাশি অন্য প্রশ্নও উঠবে— দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী উন্নয়নের স্বার্থে এই সরকার কী করেছে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের অভাবের জন্য এত পরিযায়ী মানুষ গ্রাম এবং শহর থেকে ভিন রাজ্যে যাচ্ছেন কেন, ইত্যাদি। উঠতে পারে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এই সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা সংক্রান্ত প্রশ্নও।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অপশাসনের অভিযোগ মানুষের মনে কতটা দাগ কেটেছে? তৃণমূল বার বার মানুষকে বুঝিয়েছে যে, দুর্নীতি ও অপশাসন অন্যান্য রাজ্যেও রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঙালি অস্মিতা-সম্পন্ন মানুষের কাছে এটা কি যথাযথ উত্তর হিসাবে গ্রহণযোগ্য?
তৃতীয়ত, তৃণমূল সরকার পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের অভাবের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই বিজেপি-পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের উপর ন্যস্ত করেছে। এমনকি, উত্তরবঙ্গের বন্যার সমস্যার অনেকটা দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে ভুটানের উপরে! পশ্চিমবঙ্গের মানুষ জানতে চাইবেন, এটা কতটা গ্রহণযোগ্য। প্রশ্ন করতে পারেন যে, তামিলনাড়ুর মতো দক্ষিণের রাজ্যগুলি বিজেপি-বিরোধী দল দ্বারা পরিচালিত হয়েও কী করে উন্নয়নের পথে তুলনামূলক ভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে?
চতুর্থ, রাজ্যের মানুষের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শাসন সম্বন্ধে কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। বিজেপি কি সাম্প্রদায়িক শাসন কায়েম করবে? খাদ্যাভ্যাসের উপরে কোনও নিষেধবিধি প্রয়োগ করবে কি? দুর্নীতি এবং অপশাসনের হাত থেকে বিজেপি মানুষকে কতটা অব্যাহতি দিতে পারবে, সে বিষয়েও একটা অজানার ভয় কাজ করতে পারে। এই ধরনের ‘অজানা’র ভয়কে তৃণমূল উস্কে দিতে চাইবে, তা প্রত্যাশিত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অজানার ভয়কে প্রশমিত করতে বিজেপি কতটা সফল হবে?
এ বার নির্বাচনী পাটিগণিত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে, বিজেপির আসন এক অঙ্কের সংখ্যা অতিক্রম করেনি। ২০২১ সালে সেই সংখ্যা পূর্ববর্তী তিন থেকে ৭৭-এ পৌঁছয়। রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসনে জয়। আসনসংখ্যা এক বার ২৫ গুণের বেশি বৃদ্ধির পর পরবর্তী নির্বাচনে আবার দ্বিগুণ করা কি সম্ভব? পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে সে প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করা যায়।
এই রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম উদয় হয় ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৬০টি আসনে জিতে। পরবর্তী ২০০৬-এর নির্বাচনে সেই জয়ের আসনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে দাঁড়ায় ৩০-এ। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিহাস সৃষ্টি করেন ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের সংখ্যা ৩০ থেকে ছ’গুণের বেশি বাড়িয়ে ১৮৪ করে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ২০১১ সালে তৃণমূলের আসনসংখ্যা তার আগের নির্বাচনের তুলনায় ছ’গুণ বেড়েছিল বলেই বিজেপি ২০২৬ সালে আসন দ্বিগুণ করতে পারবে, এটা স্বতঃসিদ্ধ নয়। কিন্তু, বঙ্গ রাজনীতিতে বিরোধী দলের আসনসংখ্যা যে বিপুল ভাবে বাড়ানো সম্ভব, সেটাও একই রকম অনস্বীকার্য।
২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ভোট পড়েছিল ৩৮.৯৩%— ২০০৬-এর তুলনায় ভোট বেড়েছিল ১২.২৯ শতাংশ-বিন্দু। পাশাপাশি, বামফ্রন্টের ভোট ২০০৬-এর ৩৭.১৩% থেকে কমে ২০১১-য় দাঁড়িয়েছিল ৩০.০৮%— অর্থাৎ, ভোট কমেছিল ৭.০৫ শতাংশ-বিন্দু। এ বার ২০২৬-এর নির্বাচনে কংগ্রেস এবং সিপিএমের পুনরুত্থান না হলে, তৃণমূল-বিরোধী ভোট বিজেপির খাতায় জমা পড়বে, এমন সম্ভাবনা অমূলক নয়।
২০২৬-এর নির্বাচন একই সঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপির অগ্নিপরীক্ষা, কারণ ৫ শতাংশ ভোট সুইং হলে আসনসংখ্যা বিপুল ভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। ৫% সুইং যদি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে হয়, তবে তৃণমূল যে আসনগুলি ১০ শতাংশের কম ভোটে জয়ী হয়েছিল, সেই ৭৮টি আসনে বিজেপি জয়লাভ করে তার মোট আসনসংখ্যাকে নিয়ে যাবে ১৫৫-তে— পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। আর, ভোট সুইং যদি উল্টো দিকে হয়, তা হলে বিজেপি যে ৫৯টি আসনে ১০ শতাংশের কম ভোটে জয়ী হয়েছিল, সেই আসনগুলি যাবে তৃণমূলের খাতায়। তাদের মোট আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ২৭৪। পশ্চিমবঙ্গ নিজের জন্য কোন ভবিষ্যৎ বেছে নেয়, সেটাই দেখার।
বিধায়ক, বিজেপি, পশ্চিমবঙ্গ