লন্ডন মেট্রোর এক হাজার যাত্রীর উপর সমীক্ষায় প্রায় ৭০% যাত্রী জানান, জনসমক্ষে অন্যের স্পিকারে গান শোনা, সিনেমা চালানোয় তাঁরা বিরক্ত হন। এবং সেই বিরক্তির রেশ বহু সময় ধরে রয়ে যায়। মানসিক শান্তির বিঘ্ন ঘটে। এই গবেষণার উপর ভিত্তি করেই লন্ডন মেট্রোতে হেডফোন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রচার চালানো হচ্ছে। গণপরিবহণে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থাকলেই জানা, এ দেশেও এই সমস্যা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মেট্রো, বাস, ট্রেন— কোথাও মুক্তি নেই। দূরপাল্লার ট্রেনে রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না পাশের যাত্রীর রিল অথবা অন্য কিছু দেখার শব্দে— এমন অভিজ্ঞতা অহরহ। প্রসঙ্গত এসে পড়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন। আমি ফোনে কী দেখছি তা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু সেই দেখার ‘শব্দ’ যখন অন্যের কানে পৌঁছয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত পরিসরে আটকে থাকে না। স্বস্তিতে ভ্রমণের অধিকার এবং ইচ্ছা অবশ্যই সকলের রয়েছে। যখন ভরা ট্রেনে বা বাসে কেউ স্পিকারে ভিডিয়ো চালান, তখন তিনি স্পষ্টত অন্যদের সেই অধিকার ক্ষুণ্ণ করেন। পরিণামে, এমন শব্দ-সন্ত্রাস অলক্ষ্যেই মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা এই সমস্যাকে নিছক ‘বিরক্তি’ হিসাবে দেখছেন না, এর মূলে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক ক্ষতির প্রমাণ পেয়েছেন। উঠে আসছে ‘কগনিটিভ ডিসট্রাকশন’ ও ‘হাফালগ’ থিয়োরি। যখন আমরা অন্যের কথোপকথনের অর্ধেক অংশ বা ভিডিয়োর অসংলগ্ন শব্দ শুনি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই অসম্পূর্ণ তথ্য মেলাতে গিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চাপ অনুভব করে। এটাই ‘হাফালগ’ তত্ত্ব। ভিডিয়োর শব্দ অনিয়মিত হলে, যেমন রিল স্ক্রলের সময় বার বার শব্দের মাত্রা, সুর বদলানো, চার পাশের মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা প্রায় ৪০% কমে যায়, যাকে বলে ‘কগনিটিভ ডিসট্রাকশন’। ফলে দ্রুত মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা অহেতুক মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। ‘রিল সংস্কৃতি’ এই সমস্যাকে আরও জটিল করছে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস-এর ২০২৪-এর গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যাঁরা জনসমক্ষে উচ্চ শব্দে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে সহমর্মিতার অভাব রয়েছে। যাঁরা শব্দের শিকার হন, তাঁদের রক্তচাপ, মানসিক উদ্বেগের মাত্রা সাময়িক ভাবে বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদেও সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কেন মানুষ হেডফোন ব্যবহার করতে চান না, তার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। একটি কারণ অবশ্যই অসচেতনতা। ভাবেন, “আস্তেই শুনছি”, কিন্তু পাশের জনের জন্য সেই ‘আস্তে’ শব্দও যন্ত্রণার কারণ। ডিজিটাল আসক্তিও এমন আচরণের মূলে। স্ক্রিনে মানুষ এতই মগ্ন হন যে, চার পাশের জগৎ সম্পর্কে ভাবার অবকাশ থাকে না। দীর্ঘ ক্ষণ ইয়ারফোন কানে রাখতেও অনেকে স্বস্তি পান না। নিজ পছন্দ অন্যদের উপর চাপিয়ে দেওয়ায় অনেকে এক রকম মানসিক শ্রেষ্ঠত্বও অনুভব করেন।
অনেক দেশেই এই সমস্যাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি দেশে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও হয়েছে। জাপানের ট্রেনগুলিতে ‘ম্যানার মোড’ অলিখিত আইনের মতো। সেখানে স্পিকারে ভিডিয়ো চরম অভব্যতা হিসাবেই গণ্য। ট্রেনে চড়ার সময় সাধারণত কেউ ফোনে কথা বলেন না। বললেও, উচ্চৈঃস্বরে নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সিঙ্গাপুরে জনসমক্ষে শব্দদূষণকে ‘পাবলিক নুইসেন্স’ (জনস্বার্থে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী আচরণ) হিসাবে গণ্য করা হয়। এর জন্য জরিমানার নিয়ম আছে। নিউ ইয়র্ক সিটি সাবওয়েতে জোরে গান, ভিডিয়োয় নিষেধাজ্ঞা, জরিমানার নিদানও আছে।
দেশেও কোথাও কোথাও তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ২০২১-এ ‘বেঙ্গালুরু মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন’ মোবাইলে জোরে গান শোনা বা সিনেমা দেখায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পরে ‘কর্নাটক স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন’ও জানিয়েছিল, এমন করলে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। ২০২৩-এ মুম্বইতে ‘বেস্ট’ সংস্থা সিদ্ধান্ত নেয়, যাত্রীরা মোবাইলে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে পারবেন না। বাসে ভিডিয়ো দেখা বা গান শোনার জন্য ইয়ারফোন বাধ্যতামূলক। দিল্লি, চেন্নাই, কোঝিকোড়ের মতো শহরে গণপরিবহণে উচ্চৈঃস্বরে গানবাজনার বিরুদ্ধে আইন-বিধি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও কেন্দ্রীয় মোটরযান আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় হর্ন বাজানো, গণপরিবহণে জোরে গান বাজানো বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু ফোনে সশব্দে রিল, ভিডিয়ো দেখা অন্যের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলেই যাত্রীদের মত।
আইন করেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন আইন বাস্তবায়নের সক্রিয়তা এবং সদিচ্ছা। পরিবার, বিদ্যালয়ে শিশুদের শেখানো প্রয়োজন, জনসমক্ষে উচ্চশব্দ করা সামাজিক অপরাধ। হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহার করা নাগরিক দায়িত্ব— সচেতনতামূলক প্রচার দরকার।
প্রযুক্তি আমাদের বিনোদন দিচ্ছে। তাই বলে মানবিক মূল্যবোধ যেন কেড়ে না নেয়। গবেষণার সতর্কবাণী, এই অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। জনসমক্ষে হেডফোন ছাড়া ভিডিয়ো দেখা আধুনিকতা নয়, বরং এই আচরণ শিষ্টাচার, সহানুভূতির অভাবেরই প্রকাশ। সম্মিলিত সচেতনতায় এই শব্দ-সন্ত্রাসের অবসান হোক।