মফস্সলের ক্ষতবিক্ষত রাস্তায় নাচতে নাচতে যাচ্ছে টোটো। যাত্রীরা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে তাঁদের বিরক্তি প্রকাশ করছেন। এই অবস্থায়, স্কুলের কিশোর ছেলেটি তার মাকে প্রশ্ন করে বসে, এই রাস্তাটা কবে ঠিক হবে মা? মুখোমুখি বসা প্রৌঢ় ভদ্রলোক স্মিত হেসে উত্তর দেন— ভোটের আগে বাবা! বালকটি এর পর বলে, তাদের স্কুলের দারোয়ান বলেছে, স্কুলের গেটের সামনে জমা জলের নিত্যদিনের সমস্যার সমাধানও নাকি হবে ভোটের আগে।
অন্ধকার রাস্তা। নিবু-নিবু স্ট্রিট লাইট। মাঝে মাঝেই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। এক দিন হঠাৎ দেখা গেল খুব তোড়জোড়, বিপুল আয়োজন। রাতারাতি বসে গেল উচ্চ বাতিস্তম্ভ, আলোয় ধুয়ে গেল তেমাথার মোড়। চায়ের দোকানে থাকা জনগণেশ নিজস্ব আলোচনায় বুঝে নিলেন, ভোট আসছে।
রাজধানী শহরের রাস্তায়, বিশেষত স্টেশনগামী বাসের গতি এমনিতেই শ্লথ। তার মধ্যে যদি দেখা যায় গতিহীন বাস অনির্দিষ্ট সময় দাঁড়িয়ে, মাইকে স্লোগান বা বক্তৃতা শোনা যাচ্ছে, বাসে বসে থাকা মানুষেরা ফোনে কি হাতঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে, পরবর্তী ট্রেন ও গন্তব্যের সময়ের হিসাব করতে থাকেন। মনে মনে বুঝে নেন, কবে ভোট আসছে।
জ্বর এলে যেমন গা গরম হয়, চোখ-মুখ থমথম করে, ভোট এলে তেমনই ঝলমলিয়ে ওঠে চৌরাস্তার মোড়, গমগম করে পার্টি অফিসগুলো, দেওয়ালে দেওয়ালে চুনকাম হয়। সারা দিনের খবরের চ্যানেলগুলির উপস্থাপনার ধরনও কি বদলায় না? কেবল নিন্দুকে বলে, আপন ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষায়, ক্ষমতা দখলের জন্য দলবদল হয়; রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা বেড়ে চলে, বয়ে চলে অকথা-কুকথার স্রোত। ভোটতন্ত্রে যে-হেতু একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, তাই প্রচার, রেষারেষি, প্রয়োজনে দলবদল, হিংসার প্রয়োগ, বিরোধীকে দমিয়ে দেওয়া বা শাসককে বিদেয় করার চেষ্টা— এই সব কিছুই থাকে। জনতা জানে, এই সব তেমন বড় ব্যাপার নয়, এমন তো হয়েই থাকে।
ভোটব্যবস্থাটি জরুরি, জনতার নির্মিত প্রজাতন্ত্রকে গণতান্ত্রিক ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল প্রয়োজনেই। প্রজাতন্ত্র বললে অনেকে ক্ষুণ্ন হন, এর মধ্যে নাকি প্রাক্-ঔপনিবেশিক গন্ধ আছে। কিন্তু এই যে জনগণ, যাঁরা নিজের কাজটুকু করেন, প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাটুকু নেন, সপ্তাহ-শেষে সহজ বিনোদন উপভোগ করে আবার কাজে ফেরেন— তাঁরা হয়তো সরাসরি দলীয় রাজনীতি করেন না, আবার রাজনীতির থাবা থেকে দূরেও থাকতে পারেন না, এঁরা কি নিরীহ প্রজা নন?
এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রজা আর নাগরিকের মধ্যে নাগরিকের ধারণাটি অনেক আধুনিক। নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক বেশি ‘প্রফেশনাল’: আইন মেনে চলা, আয়কর-সহ অন্যান্য কর নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে দেওয়া— এক কথায় রাষ্ট্রের অনুগত থাকা। প্রজার সঙ্গে দেশের সম্পর্ক, মানুষ ও মাটির সম্পর্ক। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রজা কথাটার অর্থ সন্তান-সন্ততি পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। তবে জনগণকে প্রজা বললে এক দিক থেকে একটা সমস্যা আছে— তাকে পালন করতে হয়, যত্ন করতে হয়। রাজার সঙ্গে প্রজার সম্পর্কও সর্বদা বৈরিতার ছিল না কোনও কালেই। তবে, প্রজা খেপে গেলে যে প্রজাবিদ্রোহ, সেটা ঠিক নাগরিক প্রতিবাদের মতো নয়।
ভোটার তালিকা ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। বিচারাধীন নাগরিকদের নথি খতিয়ে দেখে যুক্ত করা হচ্ছে তালিকায়। মনে রাখা দরকার, এই ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজে নিযুক্ত সব স্তরের সমস্ত আধিকারিক যেমন প্রজা, তেমনই, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তালিকায় নাম না আসায় যাঁরা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁরাও প্রজা। এই প্রক্রিয়ায়, উভয় পক্ষেই যাঁরা আত্মঘাতী হয়েছেন বলে অভিযোগ, তাঁরাও প্রজা। ভোট-পূর্ব বা ভোট-পরবর্তী হিংসায় যে রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ মানুষ জখম অথবা নিহত হন এবং যাঁরা তাণ্ডবলীলা ঘটান— উভয়েই প্রজা, দেশের সন্তান। এই রক্তপাত, এই হিংসা, প্রাণের এই অপচয় রোধ করার জন্য দরকার শাসন, দরকার যত্ন।
ভোট এলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ গতিবিধি লক্ষ করা যায়। নেতা-মন্ত্রীদের বাক্যবাণ শাণিত হয়ে ওঠে। আক্রমণের মাত্রা তীব্র হয়। বিরোধী দল, বিরোধী নেতৃত্ব ছাড়িয়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিও চলে আসে আক্রমণের আওতায়। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির অবস্থা দেখে, এখানে অন্তত আমাদের মনে রাখা দরকার, ভারতে গণতন্ত্র সফল ভাবে এগিয়ে চলার কারণ শুধু ভোটতন্ত্র নয়, বরংনির্বাচন কমিশন, আইনসভা, তদন্তকারী সংস্থা, আদালত, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক, সেনা— এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি জনগণেশের বিশ্বাস ভারতীয় গণতন্ত্রকে মজবুত করেছে।
ভোটতন্ত্রে ক্ষণিক স্বার্থসিদ্ধি, সাময়িক উল্লাস ও উন্মাদনা যেন জনগণেশের সেই বিশ্বাসে আঘাত না হানে, জনজীবনে দীর্ঘকালীন কোনও অনিশ্চয়তা ডেকে না নিয়ে আসে, সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষের তা স্মরণে রাখা দরকার।