নারীর অনুকূলে সমাজ-সংস্কৃতি বদলাচ্ছে, কিন্তু বাধাও বিপুল
Women Empowerment

কার উত্তরাধিকার, কতখানি

কৌমভিত্তিক শিশুপালনের ফলে প্রাইমেট মায়েরা সব দ্বৈত-বৃত্তি মা। নির্ভরযোগ্য বিকল্প-মাকে বাচ্চার দায়িত্ব দিয়ে মা খাদ্যসংগ্রহে যেতে পারে। সেটা বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্যেও। আজও শিকারি-সংগ্রাহক মানবগোষ্ঠীগুলি এ ব্যাপারে নমনীয়।

অনুরাধা রায়
শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৬:৩২

চলে গেল আর একটি নারী দিবস। মনে এল কিছু কথা। আসলে, কয়েকটা বিষয় বুঝে নিলে মেয়েদের শোষণ ও নিপীড়ন অবসানের নারীবাদী প্রকল্পের সুবিধেই হওয়ার কথা। যেমন, নারীকে সন্তান উৎপাদন ও প্রতিপালনের যন্ত্র ভাবা মানব সংস্কৃতিতে দৃঢ়প্রোথিত। শক্তিস্বরূপিণী, মমতাময়ী, আত্মত্যাগিনী হিসেবে নারীর গৌরবগাথাকে বলা যায় সান্ত্বনা পুরস্কার— তারও ভিত্তি নারীর মাতৃভূমিকা। এই ভাবে, একটা বৈশিষ্ট্য যা নারীকে পুরুষের থেকে পৃথক করেছে সেটাই তার সামগ্রিক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। উল্টো দিকে, নারীত্বকে পুরোপুরি সামাজিক নির্মাণ বলেন অনেক নারীবাদী। ইদানীং নৃবিজ্ঞানী, শারীরবিজ্ঞানী, প্রাইমেটোলজিস্টরা (যাঁরা বাঁদর, লেমুর প্রভৃতি প্রাইমেটদের নিয়ে চর্চা করেন) আমাদের বোঝাতে চাইছেন নারীত্বের জৈবিক ভিত্তি, বিবর্তনিক ইতিহাস। নারীর দেহ-মনে মাতৃত্বের প্রস্তুতির উপর প্রকৃতি-প্রদত্ত গুরুত্ব এই প্রতর্কেও স্পষ্ট। কিন্তু পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট যে, পিতৃতন্ত্র ব্যাপারটা নিতান্ত অস্বাভাবিক, বিবর্তনিক যৌক্তিকতার বিরোধী। এটা স্পষ্ট ভাবে মনে রাখা ভাল।

আমাদের অব্যবহিত বিবর্তনিক পূর্বসূরি প্রাইমেটদের সমাজে পুরুষ-প্রতাপ, যথেচ্ছ যৌনাচরণ, সন্তানের পিতৃত্ব অনিশ্চিত। শিম্পাঞ্জির মতো আগ্রাসী পুং-প্রাইমেট প্রায়ই ঈর্ষার বশে শিশুহত্যা করে। মানুষ-প্রাইমেট অবশ্য পুরুষতন্ত্রকে করেছে পিতৃতন্ত্র, চালু করেছে বিবাহ প্রথা; যেখানে পুরুষ যথেচ্ছ বহুগামী হতে পারে, কিন্তু নারীর সতীত্ব আবশ্যিক। পিতৃত্ব নিশ্চিত হওয়ায় কাকের মতো কোকিল ছানা বড় করতে হয় না পুরুষকে। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রাইমেট হয়ে এমন বিপরীতধর্মী সামাজিক অনুশাসন মানুষ কী করে তৈরি করল? আসলে বহু বছর ধরে শিকারি জীবন যাপনের ফলে বাঘ-সিংহের মতো প্রাণীর অনেক বৈশিষ্ট্যও মানুষের মধ্যে বর্তেছে। পুং-প্রাণী শিকার শেষে দোসর ও সন্তানের কাছে ফেরে খাদ্য নিয়ে, স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে থাকে এক ধরনের দেহাতীত বন্ধন, পুরুষেরও থাকে সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ, যা বানর প্রজাতিগুলির মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না।

তবু বানর-বর্গীয় প্রবণতাগুলিও মানুষের মধ্যে বিলক্ষণ আছে এবং বিবাহবন্ধন এই প্রবণতাগুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। তা ছাড়া প্রেম আর সন্তানের প্রতি আকর্ষণকে সিলমোহর দেওয়ার জন্য তো বিবাহপ্রথা তৈরি হয়নি। হয়েছিল নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে, পুরুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ততটা নয়। একপত্নীক বিয়ে অবশ্য মর্যাদা পেয়েছে আধুনিক যুগে। এটাও ঠিক যে, অনেক পুরুষই সন্তানকে ভালবাসে, হয়তো সন্তানপালনে মায়ের সঙ্গে সমান অংশীদারিতে বিশ্বাস করে। এমনকি অন্যের সন্তানকেও সযত্নে বড় করতে পারে কোনও পুরুষ, কারণ মানুষ (শুধু নারী নয়) হৃদয়বত্তাতেও সুমহান! কিন্তু শিম্পাঞ্জি সমাজের মতোই মানুষ-পিতা প্রায়ই নির্ভরযোগ্য নয়।

তা ছাড়া বাবাকে সন্তানের দায়িত্ব দিয়ে পিতৃতন্ত্র মাকে যেটুকু সুবিধা দিল, তার জন্য নারীকে মূল্যও দিতে হল অনেক— অবদমন, অচরিতার্থতা। গত দু’-এক শতকে সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে কিছু সুবিধা আদায় করা গিয়েছে। কিন্তু মোটের উপরে ইতিহাস জুড়ে পিতৃতন্ত্র— মা ও শিশু দু’জনেরই স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে গেছে। নৃতত্ত্ববিদ-প্রাইমেটবিদ সারা হার্ডি-র মতে, স্ত্রী-শিম্পাঞ্জিরা বরং মানুষীর চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকে। আলফা-মেল শাসিত সমাজেও কোনও আলফা-ফিমেলের তত্ত্বাবধানে পারস্পরিকতার মধ্যে থাকে। অনেক মেয়ে মিলে বাচ্চার দেখাশোনা করে। মানব সভ্যতা কঠিন কঠোর পিতৃতন্ত্র তৈরি করে নারীকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে (যদিও পিতৃতন্ত্রের মধ্যেও মেয়েদের মধ্যে সহমর্মিতা লক্ষণীয়)।

কৌমভিত্তিক শিশুপালনের ফলে প্রাইমেট মায়েরা সব দ্বৈত-বৃত্তি মা। নির্ভরযোগ্য বিকল্প-মাকে বাচ্চার দায়িত্ব দিয়ে মা খাদ্যসংগ্রহে যেতে পারে। সেটা বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্যেও। আজও শিকারি-সংগ্রাহক মানবগোষ্ঠীগুলি এ ব্যাপারে নমনীয়। অনেক মেয়ে স্বেচ্ছায় অন্যের বাচ্চাকে স্তন্যদানের দায়িত্ব নেয় মায়ের সুবিধার্থে। অথচ, আমাদের অভিজ্ঞতায় ‘জীবিকা বনাম মাতৃত্ব’ এই ধারণার প্রভাবে কর্মজীবী মায়েরা সন্তানের দিকে ‘যথোচিত’ নজর দিতে না পেরে অপরাধবোধে ভোগেন। বিবর্তন কিন্তু বলে, নারীর দ্বৈত ভূমিকাই স্বাভাবিক, এবং এটাকে এতটাই দ্বন্দ্বদীর্ণ ভাবার— বলা ভাল, দ্বন্দ্বদীর্ণ করে তোলার কারণ নেই। বাবা ও অন্যদের সহযোগিতায় মা সন্তান ছাড়া অন্য দিকে মন দিতে পারবে, তাতে শুধু নিজের নয়, হয়তো সন্তানেরও লাভ হবে— এটাই বিবর্তনের দাবি।

এটা আরও স্বাভাবিক এই জন্য যে, মানুষীর সবচেয়ে মুক্ত মাতৃত্ব। গর্ভবতী হয়ে সন্তানের জন্ম দেওয়াই মাতৃত্বের একমাত্র পথ নয়। যে কেউ মা হতে পারে কম-বেশি সময় বা বরাবরের জন্য। বানর-মা নিজের বাচ্চা হারিয়ে কুকুরছানা বড় করছে, কুকুর-মা মা-হারা সিংহশিশুদের দুধ খাওয়াচ্ছে— এমন দৃষ্টান্তও তো প্রচুর। প্রাইমেট মেয়েদের স্নেহপ্রবণতা খুবই প্রকট। প্রাইমেটোলজিস্ট ফ্রানস দে ওয়াল-এর পর্যবেক্ষণ— বাচ্চা শিম্পাঞ্জিদের পুতুল দিলে মেয়েরা তাকে কোলে নিয়ে আদর করে, ছেলেরা সেখানে প্রায়ই পুতুল ভেঙে ফেলে, বা বাগিয়ে ধরে অন্যদের তাক করে। ওদের তো ‘জেন্ডারড’ সংস্কৃতি নয়, তবুও। আশ্চর্য নয়, মা যশোদা থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-উপন্যাসে গোরার পালিকা মা, শরৎসাহিত্যে বিন্দু, মেজদিদি, রামের বৌদির মতো বিকল্প-মা, মহাশ্বেতা দেবীর ‘স্তনদায়িনী’ আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বল সব চরিত্র। আজকের বাস্তবেও ঠাকুমা, কাকিমা, প্রতিবেশিনী, আয়া বা ডে-কেয়ার স্বাভাবিক ভাবেই শিশুর জন্য ভালবাসা ও নিরাপত্তার উৎস হতে পারে।

উল্টো দিকে, জন্মদাত্রী হলেই যে বাচ্চাকে ভালবাসবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। মায়ের ভালবাসা অবশ্যই সত্যি। কিন্তু ‘মেটার্নাল ইনস্টিংক্ট’ যাকে বলে, তা সহজাত ও স্বয়ংক্রিয় নয়। মা হওয়ার প্রক্রিয়ায় ক্রমে তা তৈরি হয়ে ওঠে— “সযত্ন লালনেরও লালিত হওয়া প্রয়োজন”। কোনও কোনও মায়ের ক্ষেত্রে, বা তেমন পরিস্থিতিতে, তৈরি না-ও হতে পারে। মা ও শিশুর মধ্যে স্বার্থসংঘাত লক্ষ্য করেছেন ট্রিভার্স, হ্যামিল্টন প্রমুখ বিবর্তনিক জীববিজ্ঞানী। অসংখ্য শিশুত্যাগ শিশুহত্যা ঘটেছে ইতিহাসে, প্রায়শই সমাজবিধি অনুযায়ী। কানীন সন্তান বা স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের ঔরসজাত সন্তান মায়ের কাছে অবাঞ্ছিত। মহাভারতের কর্ণ, শকুন্তলা স্মর্তব্য। যে সন্তান দুর্বল, বাঁচবে না, বংশরক্ষায় কাজে লাগবে না, অনেক সময় মা-ই তাকে মেরে ফেলেন। এটাই বিবর্তনের নিষ্ঠুর লজিক, যা সক্রিয় মানুষের মধ্যেও। লিঙ্গ-বৈষম্যভিত্তিক শিশুহত্যা তো আমাদের দেশে আজও হয়। আসলে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় শুধু সন্তান উৎপাদন নয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখা, সঙ্গে মায়ের নিজেরও ভাল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। নারীর ভাল থাকাকে জটিল করে তুলেছে সমাজ-সংস্কৃতির দাবি। হাজার হাজার বছর পুরুষের অধীনে থেকে নারীও পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে শামিল।

বিজ্ঞানকে ঠিকমতো বুঝে নিয়ে সে দিকেই সভ্যতার অগ্রসরতা কাম্য। প্রাইমেট-সহ অনেক প্রাণীর মধ্যে যদি বা মেয়েদের উপর পুরুষদের আধিপত্য দেখা যায়, জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ মানুষকে যে সেটাই অনুসরণ করতে হবে, তার মানে নেই। অসংখ্য অবাঞ্ছিত সন্তানের জন্ম দেওয়া, তার পর তাদের অবহেলা বা হত্যা করা যে ‘সভ্যতা’ নয় এবং মেয়েদের মাতৃভূমিকা ছাপিয়ে স্বরূপে বিকশিত হতে দেওয়া যে জরুরি, সেটা বুঝে জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করেছে মানুষ। যদিও তাতে অনেকেরই আপত্তি, তার সঙ্গে জড়িত থাকে গর্ভপাতের বিরুদ্ধে যুক্তিও।

নারীর অনুকূলে সমাজ-সংস্কৃতি বদলাচ্ছে বটে, কিন্তু বিপুল বাধা। যেটুকু এগোনো গেছে, তার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও প্রচুর। কিন্তু ভাল খবর হল, নারীর অবদমন মানুষের অনিবার্য ও স্থায়ী প্রবণতা নয়। বিবর্তনবিদরা বলছেন, আমাদের ঘনিষ্ঠতম বিবর্তনিক সম্পর্ক শিম্পাঞ্জি আর বনোবো— এই দুই প্রাইমেট প্রজাতির সঙ্গে। শিম্পাঞ্জিরা যদি পুরুষতান্ত্রিক হয়, তাদের মধ্যে যদি আগ্রাসন ও হিংস্রতা বেশি থাকে, বনোবোরা কিন্তু মাতৃতান্ত্রিক এবং খুবই শান্তিপ্রিয়। কার উত্তরাধিকার আমরা কতটা বহন করি, ঠিক জানি না। তবে হোমো সেপিয়েন্সদেরও একদা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিল এবং অন্তত পুরনো প্রস্তর যুগ পর্যন্ত স্ত্রী-পুরুষ সাম্য বজায় ছিল, নারীর মেধা ও কর্মকুশলতা অ-প্রতিহত ছিল বলেই মনে হয়। জানি, প্রগাঢ় প্রাচীন পিতৃতন্ত্র আজ এক ধাক্কায় ভেঙে ফেলা মুশকিল, কিন্তু নিছক সংস্কার ও পুনর্গঠনে সন্তুষ্ট না থেকে তার মূলগত সমস্যাটা বুঝে নেওয়া ভাল। শুধু নারীর নয়, গোটা মানব সভ্যতার মঙ্গলের জন্য।

আরও পড়ুন