বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসাবে দেখা চলে। নির্বাচনের ফলাফল যে দিকে গিয়েছে, তাতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সম্ভাব্য পুনর্গঠনের পথও খোলা সম্ভব। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং টালমাটাল অন্তর্বর্তিকালীন পর্যায়ের পরে একটি নির্বাচিত সরকারের উত্থান সে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারে; আঞ্চলিক আস্থা পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতা তারেক রহমান ভারত সম্পর্কে তুলনামূলক ভাবে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন, এবং বাস্তবসম্মত সহযোগিতার উপরে জোর দিয়েছেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শাসনকালে বিএনপি-র ভারত সম্বন্ধে অবস্থানের স্মৃতি বর্তমানকে প্রভাবিত করবে না, তেমন নিশ্চয়তা দেওয়া মুশকিল। কিন্তু, এটাও মনে রাখতে হবে যে, পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তব পরিস্থিতি অনেক সময় ইতিহাসের বিপ্রতীপ পথ তৈরি করে দেয়। বর্তমান মুহূর্ত তেমনই একটি সুযোগের সন্ধিক্ষণ কি না, সে দিকে নজর রাখতে হবে।
একবিংশ শতকের গোড়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট উল্লেখযোগ্য ভাবে বদলেছে। ভারত আজ এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, এবং বৈশ্বিক জোগান-শৃঙ্খলের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলির জন্য ক্রমশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বৃদ্ধি-চালিত শক্তি হিসাবেও তার অবস্থান তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, বেশ কয়েক বছর দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধি অর্জন করার পর বাংলাদেশ এখন আবার অর্থনৈতিক চাপের মুখে। বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১০,০০০ কোটি ডলার; বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার গত চার বছরে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে—২০২১-২২ সালে যা ছিল প্রায় ৪,৬০০ কোটি ডলার, তা ২০২৫-২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২,৯০০ কোটি ডলার। ব্যাঙ্কিং খাতে অনাদায়ি ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক। এই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল কাম্য নয়, অতি প্রয়োজনীয়।
অন্য দিকে, দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব কি না, তা নির্ভর করছে বিএনপি কেবল নির্বাচনী সাফল্যের উপরে নির্ভর করবে, না কি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে, তার উপরে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ৭০টির বেশি আসনে জয়ী হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-অগস্ট মাসের বিক্ষোভ থেকে তৈরি হওয়া জাতীয় নাগরিক দল (এনসিপি) একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও তাদের নির্বাচনী ফল প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত, তবুও যুবসমাজের রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং তার সম্ভাব্য দিগ্নির্দেশ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত বহন করে। আগামী মাসগুলিতে তাই পরীক্ষা হবে, বিএনপি তার নির্বাচনী সাফল্যকে একটি কার্যকর শাসন-দর্শনে পরিণত করতে পারে কি না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি— বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক সূচকগুলিকে স্থিতিশীল করা, এবং বেকারত্বের হার নিয়ন্ত্রণ— দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অবস্থান যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে, সহযোগিতার মাধ্যমে তার অংশ হওয়া বাংলাদেশের নবনির্বাচিত নীতিনির্ধারকদের কাছে বিচক্ষণ পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা, আন্তঃসীমান্ত পরিকাঠামো এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের বিস্তার নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ, ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা কেবল একটি কূটনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নয়াদিল্লিকেও ঢাকার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে কৌশলগত বাস্তববাদ এবং কূটনৈতিক সংযমের সমন্বয়ে। ঐতিহাসিক ভাবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপরে নির্ভর না-করে সীমান্তের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতা এবং যৌথ নিরাপত্তা বিবেচনার উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সম্পর্ক যখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা, মৌলবাদবিরোধী প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক সংযোগের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হিসাবেই থাকবে।
একটি বিষয় স্পষ্ট ভাবে বলা প্রয়োজন— বাংলাদেশকে কোনও অবস্থাতেই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শত্রুতামূলক পরিকল্পনার সহযোগী হতে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আস্থা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার উপরে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের নতুন সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলায় আন্তরিক হয়, তা হলে ভারতের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা ও সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেওয়া স্বাভাবিক হবে।
সাংসদ, বিজেপি। ভূতপূর্ব ভারতীয় রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ