উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, না কি ধর্মীয় মেরুকরণ
West Bengal Election Results 2026

তৃণমূলের পতন কেন

পরিবর্তন চাওয়ার দুটো মূল কারণ অনুমান করা যায়। প্রথম অনুমান, আইনের শাসনের অভাব। তৃণমূল স্তরে অরাজকতা, স্থানীয় নেতাদের দৌরাত্ম্য, ঔদ্ধত্য, দুর্নীতি, অত্যাচার, সন্ত্রাস ও তোলাবাজি সম্ভবত সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

অভিরূপ সরকার
শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৭:৪১

২০১১ সালে যখন পশ্চিমবঙ্গে পালাবদল ঘটেছিল, তার আগে থেকেই পরিবর্তনের কিছু কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। বিধানসভা-পূর্ববর্তী পঞ্চায়েত, লোকসভা এবং পুর-নির্বাচনে একটু-একটু করে কমছিল বাম ফ্রন্টের আধিপত্য। এ বারে কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তেমন জোরালো কোনও সঙ্কেত ছিল না। এটা ঠিক যে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটপ্রাপ্তির অনুপাত ৪৮% থেকে কমে হয়েছিল ৪৫%-এর কিছু বেশি। কিন্তু যে-হেতু আসনসংখ্যায় তার প্রতিফলন ঘটেনি, এবং যে-হেতু তৃণমূলের ভোটের অনুপাত কমার পরও তা যথেষ্টই বেশি ছিল, তাই পরিবর্তনের এই সামান্য আভাস অনেকের চোখ এড়িয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। অথচ ভিতরে ভিতরে মানুষ যে একটা পরিবর্তন চাইছিলেন, তা নিয়ে এখন আর কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না।

পরিবর্তন চাওয়ার দুটো মূল কারণ অনুমান করা যায়। প্রথম অনুমান, আইনের শাসনের অভাব। তৃণমূল স্তরে অরাজকতা, স্থানীয় নেতাদের দৌরাত্ম্য, ঔদ্ধত্য, দুর্নীতি, অত্যাচার, সন্ত্রাস ও তোলাবাজি সম্ভবত সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। শীর্ষ নেতারা এই অসন্তোষের গভীরতাটা হয় আন্দাজ করতে পারেননি, অথবা করতে চাননি। আত্মতুষ্টির কারণে হয়তো কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে ছিলেন। আবার কেউ কেউ হয়তো নিজেরাই অরাজকতা থেকে লাভবান হচ্ছিলেন। বস্তুত, ভ্রষ্টাচার যে তৃণমূল স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না, সংক্রামক ব্যাধির মতো কিছু কিছু শীর্ষ নেতার মধ্যেও ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, স্কুলশিক্ষক নিয়োগের অবিশ্বাস্য দুর্নীতি তার অন্যতম উদাহরণ। কর্মরত শিক্ষক এবং শিক্ষক পদপ্রার্থীদের উপরে এই দুর্নীতির মর্মান্তিক পরিণামের কথা সকলেই জানি।

অন্য দিকে, আইনের শাসন নেই বলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ তেমন ঘটছিল না। বড় বিনিয়োগ দূরের কথা, ছোট এবং মাঝারি বিনিয়োগও কমে আসছিল। এর ফলে রাজ্যে ভাল কাজের তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছিল। কাজের খোঁজে মানুষকে ভিন রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছিল। সারা ভারতের গড় মাথাপিছু আয়ের তুলনায় ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের গড় মাথাপিছু আয়। স্কুল-পড়ুয়ারা ভাবছিল যে, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেও যখন উপযুক্ত কাজ পাওয়া কঠিন তখন কষ্ট করে স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর কী দরকার? এই ভাবনার ফলে স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছিল, এবং সেই সঙ্গে বাড়ছিল অল্পশিক্ষিত, অদক্ষ শ্রমিকদের অনুপাত।

এই অরাজক অবস্থার পরিবর্তন মানুষ চাইতেই পারেন; এবং, সেই চাওয়ার প্রতিফলন যে ভোটবাক্সে পড়বে, এটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এখানে দু’-একটা প্রশ্ন আছে: অরাজকতা তো হঠাৎ গত কাল গজিয়ে ওঠেনি, কিছু দিন ধরেই চলছে। তা হলে এত দিন ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি কেন? ২০২৬-এ পৌঁছেই বা কী এমন ঘটল, যাতে ভোটাররা দল বেঁধে অরাজকতার বিরুদ্ধে ভোট দিলেন?

দুর্নীতি এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তৃণমূল যে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল, তার অন্তত তিনটে কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, অরাজকতার পাশাপাশি একগুচ্ছ অনুদান এবং কল্যাণমূলক প্রকল্প সরকার চালু করেছিল, যেগুলো হয়ে উঠেছিল গরিবদের বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন। এদের মধ্যে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডার ইত্যাদি প্রকল্প তো সারা দেশে নারী ক্ষমতায়নের পথিকৃৎ, বিদেশেও উচ্চ-প্রশংসিত। এ সব নিয়ে তৃণমূলের আসল সমর্থক গরিব মানুষ মোটের উপরে খুশিই ছিলেন। অপর পক্ষে, উচ্চবিত্তরা কোনও দিনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ করে উঠতে পারেননি। গরিবদের খুশি থাকার আর একটা কারণ, রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রের বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ফলে এই রাজ্যে খাবারদাবারের দাম এবং বেঁচে থাকার ন্যূনতম খরচ ছিল অন্যান্য বহু রাজ্যের তুলনায় কম। বেঁচে থাকার কম খরচ ভিন রাজ্যের গরিব শ্রমিকদেরও পশ্চিমবঙ্গে আকর্ষণ করত। তৃতীয়ত, তৃণমূলের ধর্মনিরপেক্ষতা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিত। ফলে এঁরাও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্ক।

এ ভাবে একের পর এক নির্বাচনী বৈতরণি পার হচ্ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ইতিমধ্যে দেশের অন্যান্য রাজ্যে অন্য রাজনৈতিক দলগুলিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখানো রাস্তায় গরিবদের অনুদান দিয়ে ভাল ফল পেতে শুরু করল। বস্তুত, অনুদান দেওয়াটা এখন রাজনৈতিক ভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরিব মানুষ বিশ্বাস করছেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক অনুদান তাঁদের দিতেই হবে, কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো চালিয়ে যেতেই হবে। কাজেই অনুদান এবং কল্যাণমূলক প্রকল্প থেকে যে একচেটিয়া সুবিধাটা তৃণমূল পেত, এখন আর সেটা পাচ্ছে না। বিশেষ করে তৃণমূলের প্রতি মহিলা ভোটারদের যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, হয়তো তাতে একটা চিড় ধরেছে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে উন্নততর রাজ্যগুলিতে কাজ করতে গিয়ে মানুষ উন্নতির ছবিটা নিজের চোখে দেখছেন। ফলে আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো বদলাচ্ছে, রাজনৈতিক দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বাড়ছে। পরিবর্তনের ভোট এই বদলে যাওয়া প্রত্যাশার চিহ্ন।

এ ছাড়াও এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের একটা ভূমিকা আছে। ভোটার তালিকা সংক্ষেপিত হওয়ার ফলে এক দিকে যেমন অবৈধ ভোটার কমেছে, তেমনই তুলনামূলক ভাবে বেশি কমেছে সংখ্যালঘু ভোটার। অবৈধ ভোটাররা সবাই তৃণমূলকে ভোট দিত, এটা প্রমাণ করা না গেলেও সংখ্যালঘু ভোটারদের অনুপাত কমার ফলে তৃণমূল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। উপরন্তু নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অবাধ এবং ভয়হীন নির্বাচন মানুষকে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। অভূতপূর্ব সংখ্যায় ভোটে অংশগ্রহণ করে মানুষ তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দ জানাতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিগত যুগের কংগ্রেসের মতো সিপিএমের হাতে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার তুলে দিয়ে বিজেপি পরম নিশ্চিন্তে দিল্লিতে বসে থাকেনি। ভোটে জেতার জন্য আপ্রাণ লড়াই করেছে, পরিশ্রম করেছে।

এ বার পরিবর্তনের দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণে আসি। বিজেপির কোনও কোনও নেতা মনে করছেন, এ বারের ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণের ছাপ স্পষ্ট। তাঁদের মতে, হিন্দুরা একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন বলেই বিজেপির এই সাফল্য। উল্টো দিকে, ভোটের ফলাফল থেকে এটাও পরিষ্কার যে, মুসলমানদের সকলে না হোক, অনেকেই পুরনো আনুগত্য মেনে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপির কোনও কোনও শীর্ষস্থানীয় নেতা কোনও রকম রাখঢাক না করে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাইছিলেন। প্রশ্ন হল, ধর্মনিরপেক্ষতার সমস্ত ঐতিহ্য ভেঙে পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সত্যিই কি এ বার ধর্মের ভিত্তিতে ভোট দিয়েছেন?

একেবারে সরাসরি ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেননি, এমন মনে করার কিছু যুক্তি আছে। ধরা যাক, পরিবর্তনের প্রথম কারণটাই আসল। অর্থাৎ, অরাজকতা এবং যথেষ্ট উন্নতির অভাবই পরিবর্তনের মূল কারণ। এখন, উন্নতি এবং আইনের শাসনের অভাব হিন্দু এবং মুসলমান দুই গোষ্ঠীকেই নিশ্চয় সমান ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু এর ফলে হিন্দুরা যতটা সহজে পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারছেন, মুসলমানরা তা পারছেন না। কারণ, বিকল্পটা বিজেপি। মুসলমান ভোটাররা ভাবছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে যদি আর্থিক উন্নয়নের গতি কিছুটা বৃদ্ধিও পায়, একই সঙ্গে তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে। সম্ভবত, এই সংশয়ের বশবর্তী হয়ে মুসলমানদের একটা বড় অংশ এ বারও তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। এই বিশ্লেষণ ঠিক হলে, বেশির ভাগ হিন্দু ধর্মের কারণে নয়, অধিকতর উন্নয়নের প্রত্যাশায় বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন। মুসলমানরাও তাই দিতেন, যদি বিকল্পটা বিজেপি না হত। বস্তুত, কিছু কিছু অঞ্চলে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এ সব ক্ষেত্রে বলতে হবে যে, মুসলমান ভোটারদের উন্নয়নের প্রত্যাশা তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার ভয়কে ছাপিয়ে গেছে।

ভবিষ্যতের গবেষণা হয়তো আরও পরিষ্কার করে পরিবর্তনের কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারবে। আমাদের বিশ্লেষণ অনেকটাই অনুমানভিত্তিক। সেটুকু মেনে নিয়েও বলব, পরিবর্তনের যে দু’টি সম্ভাব্য কারণ আমরা অনুমান করেছি, তাদের মধ্যে একটা মৌলিক গুণগত তফাত আছে। উচ্চতর জীবনযাত্রার প্রত্যাশা কিংবা আইনহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সামাজিক উন্নতির লক্ষণ। এর অভাবে সমাজে স্থবিরতা আসে।

কিন্তু ভোট যদি সত্যিই ধর্মের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তবে বলতে হয়, পশ্চিমবঙ্গের সমাজ পিছন দিকে হাঁটছে। আশা করব, যে নতুন সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় আসছে তারা জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সমস্ত বঙ্গবাসীর উন্নতির কথা ভাববে। ধর্মীয় বিভাজনকে প্রশ্রয় দেবে না। দ্বিতীয়টার কারণে পরিবর্তন ঘটলে সত্যিই ভয়ের কথা। লজ্জার কথাও বটে।

আরও পড়ুন