ভারতের গোটা রাজনীতির পরিমণ্ডলে বদল এসেছে। বদল এসেছে ‘আখ্যান’-এ। দিনের শেষে খেলা তো আখ্যানেরই। কথার মারপ্যাঁচ জানলেই রাজনীতির সাপলুডোয় উপরে যাওয়া যাবে। টেলিভিশন সাক্ষাৎকার এবং প্রিন্ট মিডিয়ার একঘেয়েমি থেকে অনেকটা আলাদা পডকাস্টে অজানা কথা উঠে আসছে। নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, ফলে কথোপকথনের গভীরতা বাড়ছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হচ্ছে। জীবনের অন্ধকার দিকও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। শ্রোতারা পাচ্ছেন রগরগে বিষয়। বদলাচ্ছে রাজনীতির মানচিত্র। একটা সময় যে রাজনীতিকরা শুধুমাত্র প্রিন্ট মিডিয়ার ছাপা খবরের কদর করতেন, তাঁরাই পডকাস্টে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। তুলে ধরছেন রাজনৈতিক আন্দোলনের অজানা কথা। প্রেমের, দলবদলের, ব্যক্তিগত আক্রোশের কথা। ফলে তাঁর সম্বন্ধে আমাদের ধারণা তৈরি হচ্ছে, সেই রাজনৈতিক দলের বিষয়ে জনমতও গড়ে উঠছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৪৫-৫০ কোটি মানুষ নিয়মিত দৃশ্যশ্রাব্য ‘কনটেন্ট’ দেখেন, যার বড় অংশ রাজনৈতিক পডকাস্টে আগ্রহী। অন্য দিকে, ইংরেজি ও আঞ্চলিক খবরের চ্যানেলের সম্মিলিত ‘প্রাইম টাইম’ দর্শকসংখ্যা গত পাঁচ বছরে ২০%-২৫% পর্যন্ত কমেছে। ১৮-৩৫’এর ভোটারদের মধ্যে টেলিভিশনে রাজনৈতিক সাক্ষাৎকারের উপরে আস্থা দ্রুত কমছে। এই প্রজন্মের প্রায় ৬০% রাজনৈতিক কনটেন্ট বেশি দেখেন পডকাস্ট-এ, যেখানে তাঁরা দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক নেতা, বিশেষজ্ঞদের কথা শুনতে আগ্রহী। ‘স্পটিফাই ইন্ডিয়া’-র তথ্য, ২০২০-র পর রাজনৈতিক পডকাস্টের শ্রোতা বেড়েছে প্রায় ৩০%-৩৫%। প্রবণতাটিতে স্পষ্ট যে, টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রিত, স্বল্প সময়ের ও আখ্যান-নির্ভর রাজনৈতিক সাক্ষাৎকারের বদলে ভারতীয় রাজনীতি ধীরে ধীরে পডকাস্ট-কেন্দ্রিক হচ্ছে।
শুধুই মত প্রকাশের মাধ্যম নয়, পডকাস্ট পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারের কার্যকর হাতিয়ারও হয়ে উঠছে। রাজনীতিবিদরা ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, আবেগের কথা তুলে ধরছেন, যা টেলিভিশনের আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় সম্ভব নয়। এই মানবিক উপস্থাপন ভোটারের সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরি করছে। পডকাস্টের মাধ্যমে দলগুলি দীর্ঘ আখ্যান প্রচার করছে, যেখানে সরকারি সিদ্ধান্ত, নীতি বা বিতর্কিত বিষয়গুলিকে সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। পডকাস্টের বক্তব্য ক্লিপ আকারে কেটে ইনস্টাগ্রাম রিল, ইউটিউব শর্টস ও ওয়টস্যাপ-এ ছড়ানো হচ্ছে, ফলে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার বহু দিন ধরে প্রচারের উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পডকাস্ট ভারতীয় রাজনীতির প্রচারকে তাৎক্ষণিক স্লোগান থেকে সরিয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বাস তৈরির, আবেগ নির্মাণের, নিয়ন্ত্রিত আখ্যান ছড়িয়ে দেওয়ার আধুনিক কর্পোরেট কৌশলে পরিণত হয়েছে।
পডকাস্টে বক্তব্যের উপরে কার্যত তাৎক্ষণিক তথ্য যাচাই বা প্রশ্নের চাপ থাকে না। কথোপকথনের আড়ালে অর্ধসত্য, বিকৃত ইতিহাস, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা জায়গা করে, যা শ্রোতাদের কাছে ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পডকাস্ট রাজনীতিকে নীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলছে, অথচ নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা সাংবিধানিক প্রশ্ন আড়ালে চলে যাচ্ছে। ভোটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যুক্তির বদলে আবেগে ভর করে। অনেক পডকাস্টই হয়ে উঠছে ‘সফ্ট ইন্টারভিউ’-এর নিরাপদ পরিসর, যেখানে প্রভাবশালী রাজনীতিকরা কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে নিজের মতো আখ্যান সাজিয়ে নিতে পারছেন, জবাবদিহির সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে। দীর্ঘ কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ কেটে শর্ট ভিডিয়ো বা ওয়টস্যাপ ফরওয়ার্ডে ছড়ানোর প্রবণতা প্রোপাগান্ডাকে তীব্রতর ও প্রসঙ্গচ্যুত করে তুলছে। পডকাস্ট ভারতীয় রাজনীতিকে গভীর ও আকর্ষণীয় করলেও, দায়িত্বহীন, অতিরিক্ত আবেগনির্ভর ও কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত আখ্যানের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গণতন্ত্রের পক্ষে উদ্বেগজনক।
প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে পডকাস্টকে ভোটের কাজে ব্যবহার করা হয় তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত ও বিষয়-কেন্দ্রিক উপায়ে। আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনৈতিক পডকাস্টে প্রার্থীরা ভোটার গোষ্ঠীর সামনে স্বাস্থ্যনীতি, অর্থনীতি, অভিবাসন, জলবায়ুর মতো স্পষ্ট নীতিগত প্রশ্নে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন, সাংবাদিক বা বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন। পডকাস্ট সেখানে আবেগী আত্মপ্রচারের নয়, বরং ভোটারকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সহায়ক আধুনিক গণতান্ত্রিক যোগাযোগ মাধ্যম। ভারতের রাজনীতিতে পডকাস্ট বর্তমানে এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে— এক দিকে তা বিকল্প মতপ্রকাশের মঞ্চ, অন্য দিকে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারের শক্তিশালী হাতিয়ার।
বর্তমানে পডকাস্ট মূলত শহুরে, শিক্ষিত ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রভাবশালী, যেখানে রাজনীতিকরা টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রিত কাঠামো এড়িয়ে ব্যক্তিগত গল্প, আবেগ, ব্যাখ্যা তুলে ধরছেন। এতে রাজনীতির ভাষা সহজ ও মানবিক হলেও জবাবদিহি, তথ্যযাচাই ও নীতিগত বিতর্ক অনেক সময় দুর্বল হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এই প্রবণতা গভীরতর হবে, পডকাস্ট ক্রমশ রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত হবে, ভাষা, বয়স, পেশা ও মতাদর্শ অনুযায়ী আলাদা আলাদা আখ্যান গড়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক নীতি, স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যম সাক্ষরতা না বাড়লে পডকাস্ট এক দিকে গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ বাড়ালেও, অন্য দিকে তা আবেগনির্ভর ও প্রতিধ্বনিনির্ভর রাজনীতিকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।