Partition of Bengal

ইতিহাস শিক্ষার বিড়ম্বনা

প্রথমে সব সদস্যের ভোটে ১২৬-৯০ ব্যবধানে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে অবিভক্ত বাংলা নতুন পাকিস্তান সাংবিধানিক পরিষদে যোগ দেবে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ ০৭:০১
দায়: বাঙালি কংগ্রেস সদস্যরা বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করছেন বঙ্গবিভাগের প্রস্তাবে মতদানের পরে, জুন ১৯৪৭

দায়: বাঙালি কংগ্রেস সদস্যরা বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করছেন বঙ্গবিভাগের প্রস্তাবে মতদানের পরে, জুন ১৯৪৭

ক’দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের নেতাদের মুখে সঠিক ইতিহাস মনে রাখার আবশ্যকতা নিয়ে অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা শোনা যাচ্ছে। তারই মধ্যে সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন বিভ্রাট দেখিয়ে দিল, ঐতিহাসিক তথ্য যাচাই না করে প্রচলিত গালগল্পের ভিত্তিতে হুকুম জারি করলে হাস্যকর ভুল হয়ে যায়। যদিও নেতারা যে সে-জন্য বিন্দুমাত্র লজ্জিত, তা মনে হচ্ছে না। যা-ই হোক, বিজেপি নেতাদের ইতিহাসতত্ত্ব আলোচনার উপলক্ষ অবশ্য ছিল ২০ জুন তারিখে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সেই আলোচনাও নানা বিকৃতি, অর্ধসত্য আর অজ্ঞতার কাঁটায় জর্জরিত।

২০ জুন ১৯৪৭ তারিখে বাংলার আইনসভায় একটি নয়, তিনটি ভোট হয়। প্রথমে সব সদস্যের ভোটে ১২৬-৯০ ব্যবধানে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে অবিভক্ত বাংলা নতুন পাকিস্তান সাংবিধানিক পরিষদে যোগ দেবে। দ্বিতীয় ভোট হয় কেবল অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলির সদস্যদের মধ্যে। তাঁরা ৫৮-২১ ভোটে পৃথক প্রদেশ হিসেবে ভারতের সাংবিধানিক পরিষদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তৃতীয় ভোটে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার সদস্যরা ১০৭-৩৪ ভোটে রায় দেন যে বাংলা অবিভক্ত থাকবে এবং পাকিস্তান সাংবিধানিক পরিষদে যুক্ত হবে। সাম্প্রতিক প্রচারে কেবল দ্বিতীয় ভোটটির কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু সেটি ছিল কেবল পশ্চিমবঙ্গের সদস্যদের ভোট। এ দিকে বাংলা ভাগের পক্ষে ছিলেন পশ্চিম আর পূর্ব মিলিয়ে ৯০-৯২ জন হিন্দু সদস্য। তাঁদের মধ্যে ৮৪ জন কংগ্রেস দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জিতেছিলেন। আর ছিলেন চার জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, এক জন ভারতীয় খ্রিস্টান, এক জন নির্দল (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) আর তিন জন কমিউনিস্ট (জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ ও রূপনারায়ণ রায়)। কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে ছিলেন পঁচিশ জন তফসিলি সদস্য। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল যিনি বলতেন বর্ণহিন্দুর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নমশূদ্রদের পাকিস্তানে বাস করাই শ্রেয়, তিনি মাত্র পাঁচ জন শেডিউলড কাস্টস ফেডারেশন সদস্যকে সঙ্গে পেয়েছিলেন। সুতরাং এই ভোটে দলনির্বিশেষে বাঙালি হিন্দুর মত ছিল বাংলা ভাগের পক্ষে।

এই ঐকমত্য এক দিনে তৈরি হয়নি। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তার আগে অন্তত মাস ছয় ধরে একটি ‘বঙ্গবিভাগ আন্দোলন’ দানা বাঁধছিল। বাংলা ভাগের দাবিতে প্রচার আর জনমত সৃষ্টির জন্য বেঙ্গল পার্টিশন লিগ নামে একটি সংগঠনও তৈরি হয়।

মনে রাখতে হবে, এই সময় ভারত আর পাকিস্তান নামে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রস্তাব আদৌ ওঠেনি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান, যেখানে সুপারিশ করা হয় যে কেন্দ্রীয় সরকার শুধু বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষা, মুদ্রাব্যবস্থা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার তদারকি করবে। তার নীচে থাকবে তিনটি প্রাদেশিক গ্রুপ— প্রথমটিতে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের ছয়টি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, দ্বিতীয়টিতে পশ্চিমের চারটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, আর তৃতীয়টিতে বাংলা ও অসম। প্রতিটি গ্রুপের স্বতন্ত্র সাংবিধানিক পরিষদ গঠিত হবে। এই সুপারিশ কার্যকর হলে বাংলার হিন্দুরা একটি মুসলিম-নির্ধারিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার কবলে পড়বে, এই আশঙ্কাতেই বাংলা ভাগের দাবি উঠেছিল।

১৯৪৭-এর ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করলেন যে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনার পরিণতি যা-ই হোক না কেন, ৩০ জুন ১৯৪৮-এর মধ্যে ব্রিটেন ভারত ছেড়ে চলে আসবে। এই ঘোষণার পরই বঙ্গবিভাগ আন্দোলন জোরকদমে এগোতে থাকে। ২২ ফেব্রুয়ারি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একটি বিবৃতিতে বলেন, বাংলার হিন্দুদের দাবি করা উচিত যে ব্রিটিশ শাসকেরা যেন একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে। অন্যথা একটি পৃথক সাংবিধানিক গ্রুপে থাকলে বাংলার হিন্দুরা স্থায়ী দাসত্বে বাঁধা পড়বে।

 শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

সাংগঠনিক দিক দিয়ে বাংলার হিন্দু মহাসভা কিন্তু এই সময় খুবই দুর্বল অবস্থায় ছিল। ১৯৪৫-৪৬’এর নির্বাচনে ছাব্বিশটি অমুসলিম আসনে তারা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়। এক জনও জেতেনি। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আসন থেকে শ্যামাপ্রসাদ নির্দল হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

গোটা মার্চ মাস জুড়ে প্রধানত কলকাতা, তার পার্শ্ববর্তী জেলা, মেদিনীপুর, বর্ধমান, বাঁকুড়া আর বীরভূমে বাংলা ভাগের দাবিতে দেড়শো-দু’শো সভা হয়। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার পাতায় দেখছি, প্রতি দিন বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক দল, বার অ্যাসোসিয়েশন, সাংস্কৃতিক সংগঠন অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ডাকা সভার খবর। এর মধ্যে কিছু বড় আকারের জনসভা। রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল জেলা স্তরের কংগ্রেস নেতাদের হাতে। সরকারি রিপোর্টে বঙ্গ বিভাগের দাবিতে রাজনৈতিক দলের ডাকা ৭৬টি প্রকাশ্য সভার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে ৫৯টি কংগ্রেসের ডাকা, বারোটি হিন্দু মহাসভার, আর পাঁচটি দুই দলের যৌথ উদ্যোগ। এই সময় বঙ্গবিভাগের দাবিতে একটি পিটিশন আন্দোলনও পরিচালনা করেন বাংলার কংগ্রেস নেতারা। কংগ্রেস সভাপতি জে বি কৃপালনীকে উদ্দেশ করে লিখিত এই পিটিশনগুলির ৭০ ভাগ এসেছিল বর্ধমান ডিভিশনের জেলাগুলি থেকে। বস্তুত এই বিষয়ে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার মধ্যে মতপার্থক্য ছিল না, বরং যথেষ্ট সহযোগিতা ছিল। যেমন ১৫ মার্চ কলকাতার ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন হলে শ্যামাপ্রসাদের সভাপতিত্বে এক সভায় বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী ও অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩০ মার্চ দক্ষিণ কলকাতার একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন আইনজীবী অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বক্তৃতা করেন হিন্দু মহাসভার ব্যারিস্টার নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ফরওয়ার্ড ব্লকের হেমপ্রভা মজুমদার। দলীয় উদ্যোগের বাইরে হিন্দু পেশাদার মধ্যবিত্তের নানা অংশ থেকেও বঙ্গ বিভাগের দাবি ওঠে, বিশেষত আইনজীবী মহল থেকে। ১২ মার্চ কলকাতা হাই কোর্টের পঞ্চাশ জন হিন্দু ব্যারিস্টার এবং তিন দিন পর শতাধিক হিন্দু সলিসিটর বিবৃতি দিয়ে বাংলা ভাগ দাবি করেন। পশ্চিমের জেলাগুলির প্রতিটি বার অ্যাসোসিয়েশন একই দাবি করে। সুতরাং মার্চের মধ্যেই কলকাতা ও পশ্চিমের জেলাগুলির হিন্দু মধ্যবিত্ত যে দলনির্বিশেষে বাংলা ভাগের পক্ষে মনস্থির করে ফেলেছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

পূর্ববঙ্গের হিন্দু নেতাদের মধ্যে কিন্তু যথেষ্ট অনিশ্চয়তা ছিল। ২২ ফেব্রুয়ারির এক বিবৃতিতে ত্রিপুরা (কুমিল্লা), নোয়াখালী, বরিশাল আর বগুড়া জেলার বেশ কয়েক জন এমএলএ, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং ব্যবসায়ী বঙ্গবিভাগ আন্দোলনের বিরোধিতা করে বলেন, এই প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিবিরোধী আন্দোলন আসলে মুসলিম লিগের বিভাজন নীতিকেই মেনে নিচ্ছে। এর ফলে পূর্ববঙ্গের অন্য হিন্দুদের সঙ্গে বিশেষ করে তফসিলি হিন্দুদের স্বার্থ গুরুতর ভাবে ব্যাহত হবে। এই আশঙ্কা দূর করার জন্য বঙ্গবিভাগ আন্দোলনের পক্ষ থেকে বারে বারে বলা হতে লাগল যে, বাংলার পশ্চিমে হিন্দুপ্রধান অংশে যদি ভারতীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পৃথক প্রদেশ গঠিত হয়, তবে তা পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। ১৯ মার্চ এক দীর্ঘ বিবৃতিতে শ্যামাপ্রসাদ বলেন, পৃথক প্রদেশ গঠিত হলে বাংলার দুই-তৃতীয়াংশ হিন্দু সেখানে নির্বিঘ্নে বাস করতে পারবে। ভারতীয় ইউনিয়ন ও বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকারের শক্তিতে পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু হিন্দুও সুরক্ষিত থাকবে। “ব্যবচ্ছেদ কথাটিতে ভীত হইয়া মূর্ছা যাওয়া আমাদের উচিত নহে”। তিনি আরও বলেন, কংগ্রেস দল ঘোষণা করেছে যে কোনও অনিচ্ছুক অঞ্চলের উপর শাসনতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া হবে না। সুতরাং বঙ্গবিভাগ এখন সর্বদলীয় বিষয় হয়ে গেছে।

কিছু দিন আগে কর্মসূচিতে বিজেপি দাবি করেছে যে, এপ্রিল ১৯৪৭-এ তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসম্মেলন থেকেই শ্যামাপ্রসাদের দেওয়া ডাকে যে জনমত গড়ে ওঠে, তার চাপেই পৃথক পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই ঘটনা স্মরণ করে ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তারকেশ্বরে জনসভা করেন। ইতিহাস ঘাঁটলে কিন্তু তারকেশ্বরের হিন্দু সম্মেলনের বিশেষ কোনও তাৎপর্য দেখতে পাওয়া যায় না। ওই সম্মেলনে শ্যামাপ্রসাদ সভাপতিত্ব করেননি, করেছিলেন হিন্দু মহাসভার আর এক শীর্ষস্থানীয় নেতা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ৪ এপ্রিলের বক্তৃতায় তিনি বঙ্গবিভাগের দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন। শ্যামাপ্রসাদ ওই দিন ছিলেন কলকাতায়, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির কার্যনির্বাহী সমিতির বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে। সেই সভায় প্রস্তাব গৃহীত হয় যে বাংলার কোনও অংশ যদি পৃথক হয়ে ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হতে চায়, তা হলে তাকে সেই অধিকার দিতে হবে। এই প্রস্তাব দিল্লিতে নেহরুর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়। পর দিন শ্যামাপ্রসাদ তারকেশ্বরে যে বক্তৃতা করেন, তা নতুন কিছু নয়, বঙ্গবিভাগ আন্দোলনের পরিচিত বক্তব্য। অর্থাৎ এই আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেই ভূমিকা এই আন্দোলনের নির্ণায়ক ছিল, এ কথা বললে বড় রকমের অত্যুক্তি হয়।

গত সপ্তাহে তারকেশ্বরের সভায় প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও বলেছেন, যখন পুরো বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করার চেষ্টা হচ্ছিল, তখন কংগ্রেস নাকি ষড়যন্ত্রকারীদের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ছিল। বিভাজনের সময়ে বাংলাকে অবহেলায় ফেলে রাখতে চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে অর্ধসত্যও বলা চলে না— তা সর্বৈব অসত্য। বাংলা ভাগের প্রশ্নে প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ বা হিন্দু মহাসভার কোনও মতদ্বৈধ ছিল না। মার্চ মাস থেকেই বাংলার কংগ্রেস নেতারা সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতাদের কাছে বাংলা ভাগের দাবি সমর্থন করার আর্জি জানাচ্ছিলেন। ২৬ মার্চ দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বাংলার অমুসলমান সদস্যদের একটি বৈঠকে স্থির হয়, সাম্প্রদায়িক নিষ্পেষণ থেকে জাতীয়তাবাদী বাংলাকে রক্ষা করার জন্য বাংলা বিভাগ এবং একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন আবশ্যক। এর ক’দিন পরেই সর্বভারতীয় কংগ্রেস বাংলা বিভাজনের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৪৭-এর মে মাসে শরৎচন্দ্র বসু ও শহিদ সোহরাওয়ার্দি বাংলার অখণ্ডতা রক্ষা করে স্বাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু কংগ্রেস অথবা মুসলিম লিগ কোনও পক্ষ থেকেই সমর্থন পাওয়া যায় না। ২৭ মে প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবং কংগ্রেস সভাপতি কৃপালনী দু’জনেই বলেন, যুক্ত বাংলা তবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে যদি তা সম্পূর্ণ ভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। জনসাধারণের দিক থেকেও এই প্রস্তাবের পক্ষে বিশেষ সাড়া পাওয়া যায় না। এর পর শরৎ বসু নিজেই এই প্রস্তাব থেকে সরে আসেন।

৩ জুন ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন রেডিয়ো ভাষণে ঘোষণা করেন, ১৫ অগস্ট ভারত আর পাকিস্তান, দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হবে। বঙ্গীয় আইনসভায় ২০ জুনের ভোটের পর বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়ে যায়। এর পর আসে র‌্যাডক্লিফ কমিশনের সীমান্ত নির্দিষ্ট করার পালা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আর সংগঠনের কাছ থেকে প্রস্তাব চেয়ে পাঠানো হয়। বঙ্গীয় কংগ্রেস এক বিশেষ কমিটি গঠন করে যার সভাপতি হন অতুলচন্দ্র গুপ্ত, সেক্রেটারি নির্মলকুমার বসু। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, অর্থনীতিবিদ প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভূগোল-বিশেষজ্ঞ এস পি চট্টোপাধ্যায়। এই কমিটির পক্ষ থেকে অতুল গুপ্ত বাংলা বিভাজনের যে স্কিম দেন, তা মোটামুটি র‌্যাডক্লিফের চূড়ান্ত সীমানারই অনুরূপ। ভাগীরথী-সহ দক্ষিণ বাংলার নদীগুলির উৎসমুখ ভারতে রাখার জন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদকে পশ্চিমবঙ্গে রাখার দাবি জানানো হয়। বদলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ খুলনা জেলা ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্য দিকে, হিন্দু মহাসভার প্রস্তাবে পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের বহু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকেও পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার অবাস্তব দাবি ছিল। এই প্রস্তাব রচনায় শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ছিল বলে জানা যায় না। ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট তিনি দিল্লিতে নেহরুর মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।

২০ জুন ১৯৪৭-এ আইনসভার ভোট যে ঐতিহাসিক, তা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে না। এই ভোট প্রমাণ করে যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুই সর্বান্তঃকরণে বাংলার বিভাজন চেয়েছিল। আর কেউ তার জন্য দায়ী নয়। পরবর্তী ইতিহাস থেকে এটাও প্রমাণিত যে ভারতে অন্তর্ভুক্ত পশ্চিমবঙ্গ যে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের রক্ষাকবচ হবে, শ্যামাপ্রসাদ এবং অন্য নেতাদের এই আশ্বাস ভুল ছিল। স্বাধীনতার পর দুই দশকে অন্তত আশি লক্ষ বাস্তুহারা পূর্ব থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসেন। তাঁদের মধ্যে একটা অংশ নানা মধ্যবিত্ত পেশায় উপার্জনের ব্যবস্থা করে নেন। আর একটি অংশ কলকাতা আর শহরতলিতে জবরদখল কলোনি স্থাপন করেন। আরও একটি অংশকে যেতে হয় ক্যাম্পে, দণ্ডকারণ্যে, আন্দামানে। এগুলিও সেই ২০ জুনের ভোটের পরিণাম। সুতরাং ঐতিহাসিক হলেও সেই দিনটি ধুমধাম করে স্মরণ করার যোগ্য কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায়। ইতিহাসের শিক্ষা প্রায়শই সরল হয় না।

আরও পড়ুন