Bengali Language

সম্পাদক সমীপেষু: ভাষার অহঙ্কার

আমাদের বাঙালিদের অহঙ্কার যে, ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে ‘বাংলা’ পৃথিবীতে সপ্তম বৃহৎ মাতৃভাষা। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাকে ‘ধ্রুপদী ভাষা’র সম্মান দিয়েছে। এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গ্ৰামের কথ্য ভাষা!

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪১

তৃপ্তি সান্ত্রার ‘অন্য ঘর, অন্য স্বর’ (রবিবাসরীয়, ২২-২) প্রবন্ধটি যথার্থ। তথ্য ও উদাহরণ সহযোগে প্রয়োজনীয় কথাটি সুন্দর ভাবে পরিবেশন করেছেন তিনি। সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা। কাঁথি মহকুমার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামে জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা। ওড়িশা-ঘেঁষা এই গ্ৰামগুলির কথ্য ভাষায় ওড়িয়া ভাষার প্রভাব বেশি। বাংলা ভাষার আঞ্চলিক কথ্যরূপ হরেক রকম। কর্মসূত্রে এক সময় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েছি। আর এখন বিশেষ কাজে পূর্ব মেদিনীপুরের অনেক গ্রামে যেতে হয়। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলা ভাষার কথ্যরূপ বদলে যায়। বদলে যায় কিছু শব্দ, কথার টান, ধ্বনি। নতুন নতুন কত শব্দ কানে আসে! কোথাও বাংলাদেশের ভাষা, কোথাও হিন্দি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। সবাই কিন্তু বাংলায় কথা বলে, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। অন্য দিকে, লেখাপড়ায় শুদ্ধ বাংলা ভাষাই তাদের মাধ্যম। বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস আনুমানিক ১৩০০ বছর পুরনো। ‘চর্যাপদ’ এ ভাষার আদি নিদর্শন। বাংলা সাহিত্যে সাধু এবং চলিত ভাষা ব্যবহার করা হয়। আধুনিক বাংলা শব্দভান্ডারে মাগধী প্রাকৃত, পালি, সংস্কৃত, ফারসি, আরবি এবং অস্ট্রো-এশীয় ভাষা-সহ অন্যান্য ভাষা পরিবারের শব্দ স্থান পেয়েছে। এই কথা প্রমাণ করে বাংলা ভাষা মূলত সংস্কৃত থেকে সৃষ্ট হলেও ভিন্ন ভিন্ন ভাষার শব্দ এর মধ্যে ঢুকে আছে। সেই শব্দগুলি কথ্য হিসেবে এবং সাহিত্যে নিয়মিত ব্যবহৃত হতে হতে বাংলা ভাষার সংসারে জায়গা করে নিয়েছে। তেমনই বাংলা শব্দও ইংরেজি, হিন্দি, ওড়িয়া, উর্দু, ফারসি ভাষায় জায়গা পেয়েছে। ভাষা বিজ্ঞানীদের মতে, সব ভাষাই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে। নতুন নতুন শব্দ সংযোজনের মাধ্যমে ভাষা উন্নত হয়। ভাষার শব্দভান্ডারকে নতুন ধারণা প্রকাশের সুবিধার্থে নতুন শব্দ দিয়ে সমৃদ্ধ করা উচিত। ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ১৯৫১-৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বাংলা ভাষা আন্দোলন করেছিলেন। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাংলাকে মাতৃভাষা করার দাবিতে বহু ছাত্র নিহত হন। এই ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূলাধার।

আমাদের বাঙালিদের অহঙ্কার যে, ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে ‘বাংলা’ পৃথিবীতে সপ্তম বৃহৎ মাতৃভাষা। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাকে ‘ধ্রুপদী ভাষা’র সম্মান দিয়েছে। এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গ্ৰামের কথ্য ভাষা! একে সম্মান জানানো ও গুরুত্ব দেওয়া আমাদের কর্তব্য। আর এই ভাষায় কিছু নতুন শব্দ ঢুকলে, ভাষার শুদ্ধতা বা গরিমা নিয়ে ‘গেল গেল’ রব তোলা উচিত নয়।

গৌতম পতিতমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

ভাষার লড়াই

‘নিজের ভাষা রক্ষার দায়’ (২৩-২) শীর্ষক তূর্য বাইনের লেখাটি খুবই সময়োপযোগী। ভাষা চিন্তার বাহন। ভাষা উন্নত হলে চিন্তাও উন্নত হয়। ফলে নিজের ভাষা রক্ষা করা এবং তাকে উন্নত করার দায় আমাদের সবার। কিন্তু অনেক শাসকই শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য কোনও এক শ্রেণির স্বার্থে কোনও নির্দিষ্ট ‘ভাষা’কে নানা কায়দায় ব্যবহার করে বিভাজনের পরিস্থিতি তৈরি করে। যদিও সাধারণ জনগণের সচেতনতার উপর নির্ভর করে, শাসক কত দূর সফল হবে। যেমন, অতীতে পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) উপর জোরপূর্বক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে সচেতন ছাত্র, যুবক-সহ সাধারণ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছে। শাসক পিছু হটেছে এবং বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

বর্তমানে সারা দেশে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলা বললেই বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যে নির্যাতনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ এবং শাসক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয়, অথবা অত্যাচারীর ভূমিকায়। এর অর্থ কী, বুঝতে অসুবিধা হয় না। দোষীদের কোনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। এ রাজ্যের বিজেপি নেতারাও নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার না-করে অন্য অজুহাত দেখাচ্ছেন। সংবাদে প্রকাশ— ভিন রাজ্যে থাকা বাংলার মানুষ বাংলায় কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে সেখানে বাংলাভাষা অস্তিত্ব সঙ্কটের দরজায়। এর জন্য সচেতন নাগরিকদের রাস্তায় বেরোতেই হবে।

যে ভাষা অন্য ভাষাকে ঘৃণা করে, বা আত্মগরিমায় নিজের গণ্ডির বাইরে বেরোতে চায় না— সেই ভাষা উন্নত হয় না। বাংলা ভাষা ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে হতে আজকে বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিয়েছে। অন্য ভাষার সঙ্গে না মিশলে, এটা সম্ভব হত না। যদিও এখনও বাংলা ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বত্র সচলতা আসেনি। গত শতাব্দীর আশির দশকের প্রথমে রাজ্যের শাসক প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি ভাষা তুলে দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে সুকুমার সেন, প্রমথনাথ বিশী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নীহাররঞ্জন রায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বুদ্ধিজীবী রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, মাতৃভাষার বিকাশের স্বার্থেই ভাল ভাবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা চাই। দাবি উঠেছিল, এই ইংরেজি ভাষা শেখাতে গেলে শিশুবয়সই হল প্রকৃত এবং উপযুক্ত সময়। বিশ্বের বহু শিশু-মনস্তত্ত্ববিদ শিশুবয়সকেই একাধিক ভাষা শেখার উপযুক্ত সময় বলেছেন। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার তা মানেনি। দেখা গেল, প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল গজিয়ে উঠতে লাগল। পয়সা যার ইংরেজি তার— এই বিভাজনের পর্যায় শুরু হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সাধারণ সচেতন জনগণের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে উনিশ বছর পর সরকারকে পিছু হটতে হয়েছিল এবং পুনরায় ইংরেজি ভাষা চালু করতে হয়েছিল।

নিখিল কবিরাজ, শ্যামপুর, হাওড়া

শরৎভবন

কলকাতার শরৎভবন (২৪ অশ্বিনী দত্ত লেন, কলকাতা-২৯) বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় ও স্মৃতিধন্য স্থান। কারণ ভবনটি তিনি অতি যত্নে নির্মাণ করান এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত এখানে তিনি অতিবাহিত করেন। এখানে রবীন্দ্রনাথ, জলধর সেন, নরেন্দ্র দেব, শঙ্খ ঘোষ, নবনীতা দেব সেন প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি এসেছিলেন। শরৎ সমিতি বহু কষ্টে অতি যত্নে বাড়িটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখেছে। সারা বছর এখানে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। অনেক গুণীজন আসেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভবনটিকে ‘হেরিটেজ বিল্ডিং’ বলে ঘোষণা করেছে। অথচ, কয়েক বছর ধরে এখানে নির্বাচনী বুথ করে সুন্দর দেওয়ালে কাগজ সেঁটে এবং চার দিকে ময়লা ছড়িয়ে সবাই চলে যান। শরৎচন্দ্রের সম্মান যেমন নষ্ট হয়, তেমনই সব পরিষ্কার করতে সমিতির প্রাণান্ত হয়। তাই বিনীত অনুরোধ, ভবনটিকে যেন ভবিষ্যতে নির্বাচনী কেন্দ্র না করা হয়। তা হলেই প্রিয় সাহিত্যিকের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

অভিযান বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা-১৪

ভগ্নদশা

রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার বর্তমান বেহাল রাস্তা বিষয়ে কিছু কথা। বিগত বেশ কিছু সময় ধরে বিভিন্ন ওয়র্ডে পানীয় জল ও গ্যাসের পাইপ বসানোর কাজ চলছে। উন্নয়নের এই কাজ সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু পরিকল্পনাহীন ভাবে মাটি খোঁড়াখুঁড়ির ফলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। অধিকাংশ রাস্তারই ভগ্নদশা। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা অসুস্থ ও প্রবীণদের। হাসপাতালে যাতায়াতের জন্য কোনও অ্যাপ-ক্যাব বা যানবাহন এই খানাখন্দ ভরা রাস্তায় ঢুকতে চাইছে না। অনুরোধ, পাইপ বসানোর কাজের সমান্তরালে দ্রুত রাস্তা সংস্কারের কাজটুকুও সম্পন্ন করা হোক।

সুমেধ ঘোষ, কলকাতা-১৪৯

আরও পড়ুন