শ্যামল চক্রবর্তীর ‘আদালত ও ঋতু-স্বাস্থ্যবিধি’ (২৭-২) শীর্ষক প্রবন্ধ বিষয়ে কিছু কথা। প্রত্যন্ত গ্রামে এক জন কন্যা থেকে মহিলা হয়ে ওঠার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ঋতুমতী হওয়া থেকে ঋতুনিবৃত্তি পর্যন্ত সমগ্র সময় পর্বটিতে প্রতি মাসে মেয়েদের কী অসম্ভব মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়। এখন গ্রামেগঞ্জে যদিও অনেক পরিবার মেয়েদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার স্বাভাবিক ভাবেই গ্রহণ করেছে, কিন্তু ঋতুমতী হওয়া কন্যাটি ওই দিনগুলিতে আজও ‘অস্পৃশ্য’ বলে গণ্য হয়। অনেক পরিবারেই সদ্য শৈশব কাটিয়ে ওঠা মেয়েটির বাবা-কাকা-ভাইকে ছুঁতে নেই, ঠাকুরঘরে ঢুকতে নেই, প্রসাদ খেতে নেই, রান্নাঘরে যেতে নেই— ইত্যাদি এক গুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা তার শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও কষ্টকর হয়ে যায়। তার উপর বাড়ির মহিলাদের সতর্কবার্তা তাকে শেখায়, ঋতুমতী হওয়া এক লজ্জাকর ঘটনা। তাকে লুকিয়ে রাখাই নিয়ম।
ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত, এমনকি পাঠ্যবই থেকে এর বিজ্ঞানসম্মত কারণ জানার পরও মেয়েটি আর এই বিষয়ে স্বাভাবিক হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ঋতু-সম্পর্কিত স্বাস্থ্য প্রত্যেক নারীর মৌলিক অধিকার। কিন্তু স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা বাস্তবে কতখানি কার্যকর হবে, সে বিষয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়। তবে শুধুমাত্র আইন করে এই সমস্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রত্যেকের একটা সামাজিক দায়িত্ব থেকে যায় এ বিষয়ে। প্রথমেই সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বুঝতে হবে মেয়েদের ঋতুচক্র স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এখানে কুসংস্কার বা লজ্জার কোনও অবকাশ নেই। বরং পরিচ্ছন্ন থাকা জরুরি।
আরও একটি জরুরি বিষয় হল, ন্যাপকিনের দাম সহজলভ্য করা। ‘এক টাকায় একটি ন্যাপকিন’ প্রত্যেক ওষুধের দোকানে রাখা যেমন বাধ্যতামূলক করতে হবে, তেমনই তার মান উন্নয়নের দিকেও নজর দিতে হবে। প্রত্যেক বাড়িতে মহিলাদের আরও এক বড় সমস্যা, ব্যবহৃত ন্যাপকিন ধ্বংসের কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকা। আবর্জনার সঙ্গে ছুড়ে দিলে সেগুলি রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায়। গ্রামের পুকুরেও ফেলে দেয় অনেকে, ফলে জলদূষণ ও পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধুমাত্র স্কুল-কলেজে নয়, এক-একটি এলাকায় ন্যাপকিন ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তি থাকা আবশ্যক।
কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি
সচেতনতা চাই
শ্যামল চক্রবর্তীর ‘আদালত ও ঋতু-স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও মেয়েদের ঋতুচক্র একটি স্বাভাবিক, নিয়মিত শারীরবৃত্তীয় ঘটনা, তা সত্ত্বেও এই বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় সমাজে লুকোচুরি করা এবং প্রকাশ্যে কথা না বলার অলিখিত বিধান রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ে অধিক জনসচেতনতা প্রয়োজন। আমার মতে প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে— সরকারি বা বেসরকারি— ঋতুচক্র নিয়ে একটি আবশ্যিক শিক্ষামূলক পাঠ থাকা প্রয়োজন। আধুনিক সমাজকে খোলা মনে ঋতুস্রাব সংক্রান্ত বিষয় লুকোনোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সামাজিক সচেতনতা নির্মাণের জন্য আরও একটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন— সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও তাদের কর্মসূচির মধ্যে ঋতুস্রাব নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
তৃণা ঘোষাল ভট্টাচার্য, কলকাতা-৭০
অশুচি কেন
কয়েক দশক আগে আমাদের মেয়েদের স্কুলে কোনও ছাত্রীর হঠাৎ ঋতুস্রাব শুরু হয়ে গেলে তাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হত। ফলে পরবর্তী ক্লাসগুলি তার আর করা হত না। এখন সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী নির্দেশ দিয়েছে যে, ঋতু সম্পর্কিত স্বাস্থ্য প্রত্যেক মেয়ের মৌলিক অধিকার এবং স্কুল-কলেজে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন দিতে হবে। কিন্তু কলকাতা শহরের কিছু নামকরা স্কুল-কলেজ ছাড়া মফস্সল বা গ্রামে এ নির্দেশ কতটুকু মানা হয়? এ ব্যাপারে রাজ্য সরকারের পর্যবেক্ষণই বা কোথায়? শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতির বেঞ্চের এই রায় ঋতু সম্পর্কিত স্বাস্থ্যকে ‘অধিকার’ ও ঋতুকে ‘অশুচি’ এবং ঋতুমতী মেয়েকে ‘অস্পৃশ্য’ বলার ভাবনাকে খারিজ করে দিয়েছে। অথচ, সামাজিক ভাবে এমন মানসিকতা এখনও দিব্যি বহাল আছে। ঋতুস্রাব যে একটি স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা এবং এর সঙ্গে শুচি-অশুচির কোনও যোগ নেই, এ কথা সমাজের বহু মানুষ মেনে নিতে পারেন না। এখনও দেশের অনেক মন্দিরে ঋতুমতী মেয়েদের ঢোকা নিষেধ। পারিবারিক ক্ষেত্রে রান্নাঘরে ঢোকা বা পুজো দেওয়ায় নিষেধ থাকে। এই ভাবনাকে পাল্টাতে হলে আদালতের নির্দেশই যথেষ্ট নয়, সামগ্রিক জনচেতনা বৃদ্ধির আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। এ বিষয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টেলিভিশনে প্রচার কার্যকর হতে পারে। এ ছাড়া যে সমস্ত শ্রমজীবী মেয়ে ইটভাটায়, খেতখামারে, কলকারখানায় কাজ করেন, আদালতের নির্দেশ মেনে সরকারের উচিত তাঁদের ঋতুস্বাস্থ্যে নজর দেওয়া। তাঁদেরও বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করা উচিত, তাঁদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রচার দরকার। আদালতের নির্দেশ না-মানার উদাহরণ রাজ্য সরকারের আছে। কিন্তু ঋতু-স্বাস্থ্যের মতো জরুরি বিষয়ে সরকার এবং সাধারণ মানুষের তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
জলের হিসেব
‘নিঃস্বতার মুখোমুখি, এখনই’ (৯-৩) শীর্ষক প্রবন্ধে গোপা সামন্ত বর্তমান বিশ্বের জলচিত্র সম্পর্কে একটি নিখুঁত বর্ণনা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের কথায় আমরা এখন ‘জল দেউলিয়া’র পর্যায়ে রয়েছি। সেই সময় আসতে আর দেরি নেই, যে দিন এই জল সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হবে ধনী গরিব নির্বিশেষে সকল বিশ্ববাসীকে।
উন্নততর জীবনযাপনের লক্ষ্যে ভূমিভাগকে অপরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করাই হচ্ছে বর্তমান সময়ের উন্নয়নের চাবিকাঠি। আর সেই ভূমির মধ্যে জলাভূমিও রয়েছে, যে জলাভূমি হ্রাসের তথ্য প্রবন্ধকার তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জ সাবধান করে, পরিবেশবিদরা পরামর্শ দেন, বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে তা স্থান পায়। কিন্তু প্রয়োগের জায়গা যৎসামান্য। ‘জল ডায়েরি’ এবং ‘জলের ফুটপ্রিন্ট’ বিষয়ে প্রবন্ধকার যথার্থই বলেছেন— আগে ঘর সামলাই, তার পর নাহয় বৃহত্তর ক্ষেত্রের কথা ভাবা যাবে। সচেতন মানুষদের প্রত্যেকে যদি দৈনিক জল ব্যবহারের হিসেব জলের ডায়েরিতে তুলে রাখেন, কিছুটা হলেও অতিরিক্ত জল ব্যবহার সম্পর্কে তাঁরা সচেতন হবেন। কিন্তু উল্টো দিকটিও সত্যি। এক জন কৃষক বিঘার পর বিঘা বোরো চাষের জন্য ভূগর্ভস্থ পানীয় জল ব্যবহার করে চলেছেন। তিনি ভাবছেন এই চাষের লভ্যাংশই হবে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় তাঁর মাসিক আয়ের প্রধান উৎস।
সঙ্কটের মোকাবিলায় চাই সুষ্ঠু সরকারি নীতি, ভূমি ব্যবহার, জল অপচয় বিষয়ক আইন। বর্তমান উদাসীন অবস্থায় থাকলে এই সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে।
নরসিংহ দাস, পশ্চিম মেদিনীপুর
জলে গেল
হাওড়া জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ডোমজুড়ের মাকড়দহ বাসস্ট্যান্ডে হাওড়া-আমতা রোডের পাশে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে একটি ‘ওয়াটার এটিএম’ তৈরি করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পরেই এটি বিকল হয়ে যায়। আর সারানো না-হওয়ায় মানুষের জলকষ্ট যেমন মেটেনি, তেমনই লক্ষ লক্ষ টাকা কার্যত জলে গেল।
অপূর্বলাল নস্কর, ভান্ডারদহ, হাওড়া