‘যোগবিয়োগের খেলা’ (৪-১২) শীর্ষক প্রবন্ধে প্রেমাংশু চৌধুরী ভোটার লিস্টে ভুয়ো ভোটারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যে যুক্তি তুলে ধরেছেন, তা অকাট্য। ভুয়ো ভোটার ঢোকানোর দরজা এ দেশে বরাবরই খোলা। এ বারের এসআইআর-এও তা খোলাই রাখা হয়েছে। অন্য রাজ্যের কেউ এসে যদি এই রাজ্যের রেসিডেনশিয়াল সার্টিফিকেট জোগাড় করে তা দেখিয়ে এখানকার ভোটার হতে চান, তবে আইনত তাঁকে আটকানো যায় না। এঁরা হবেন ভুয়ো বৈধ ভোটার। সারা বছর চুপচাপ থেকে ভোটের ঠিক আগে এসআইআর দফতর খুলে বসলে এই সম্ভাবনা স্বাভাবিক ভাবেই বহুগুণ বেড়ে যায়। ভোটসর্বস্ব রাজনৈতিক দলগুলি ভোটের স্বার্থেই এই সুযোগকে কাজে লাগায়। সে কারণেই বোধ করি ২০২৪-এ মহারাষ্ট্রে লোকসভা নির্বাচন থেকে বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ছ’মাসে ভোটার তালিকায় অন্তত ৩০ লক্ষ নতুন ভোটার যোগ হয়েছিলেন। রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে হাজার চিৎকার করলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে— ব্যাপারটা এমন নয়।
প্রবন্ধকার বিহারের ভোটার লিস্টের বহু নাম বাদ যাওয়া এবং যোগ হওয়া নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা থেকেও এসআইআর-এর প্রকৃত স্বরূপ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক কিছু বোঝার আছে। বিহারের ভোটার তালিকায় নাকি লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি, নেপালি, রোহিঙ্গা ছিলেন। বিহারে ৭.৮৯ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রথমেই ৬৫ লক্ষের নাম বাদ পড়েছিল। তার মধ্যে ২২ লক্ষ মৃত, ৩৬ লক্ষ স্থানান্তরিত এবং ৭ লক্ষ ‘ডুপ্লিকেট’। তা হলে অনুপ্রবেশকারীরা গেলেন কোথায়? অগস্টের খসড়া তালিকায় আরও ৩.৬৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। তার মধ্যেও কত জন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, তা জানা যায়নি। আর এক রিপোর্ট অনুযায়ী বিহারে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যাটা ৩১৩। এর মধ্যে ৭৮ জন মুসলমান এবং বাকি ২৩৫ জন নেপালি হিন্দু। এর বাইরে কোনও অনুপ্রবেশকারী নেই। এ অনেকটা কালো টাকা উদ্ধারের মতো, যেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও কালো টাকার পরিমাণ কত তা জানা যাচ্ছে না, বা যা ঢাক পিটিয়ে বলা হচ্ছে তার ধারে কাছেও নয়।
তা হলে জনগণের দেওয়া কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে, এত প্রাণের বিনিময়ে যে এসআইআর হচ্ছে বা হল, তার স্বচ্ছতা কোথায়? সবটাই কি ভোট-রাজনীতির সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত? ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ মানুষের প্রত্যেককে নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হল তাঁরা অনুপ্রবেশকারী নন। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশকারী খোঁজার যে দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র দফতরের পালন করার কথা, তার দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে তাঁদেরই প্রমাণ করতে বলা হল যে তাঁরা ভারতীয় নাগরিক। এটা অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য থেকে, না কি মানুষকে আতঙ্কিত করে, তাঁদের চিন্তাভাবনা থেকে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, দারিদ্র, দুর্নীতি, মহিলাদের অমর্যাদা-নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষা-চিকিৎসার সমস্যার মতো বিষয়কে দূরে সরিয়ে রেখে ভোট-রাজনীতিতে সুফল তোলার কৌশল?
গৌরীশঙ্কর দাস, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর
স্বশাসিত
প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘যোগবিয়োগের খেলা’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলি, নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষন সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র চালু করেন। তার পর গঙ্গা পদ্মার অনেক জল বয়ে গিয়েছে আজ অবধি। ২০০২-০৩ সালে শেষ বার এসআইআর হওয়া সত্ত্বেও আজ অবধি ভুয়ো ভোটার আটকানো গেল না। এত মন্ত্রী সান্ত্রি পাইক বরকন্দাজ ভোটের আঙিনায় নামিয়েও মৃত ভোটারের নামে ভোট, স্থানান্তরিত ভোটারের ভোট, অনুপ্রবেশকারীদের ভোট বন্ধ করা যায়নি। এমনকি জীবিত ভোটারদের ভোটও কখনও-কখনও অন্য মানুষ দিয়ে চলে যায়। এই সব কিছুই বন্ধ করা যায় যদি নির্বাচন কমিশন সব রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ভাবে চালনা করে। এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হবে, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, মাইক্রো-পর্যবেক্ষকদের সকলকে পুরোদস্তুর নিরাপত্তা প্রদান। ভোটকর্মীরা সেক্টর অফিসে রিপোর্ট করে ভোটের সরঞ্জাম নেওয়ার পর তাঁদের সশস্ত্র পুলিশি পাহারাতে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া থেকে ভোট শেষ হওয়ার পর ভোটবাক্স নিয়ে সেক্টর অফিস গিয়ে জমা দেওয়ার পরে পুলিশপাহারা সহকারে তাঁদের গন্তব্যস্থল অবধি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভোটের দিন যে কেন্দ্রীয় বাহিনী বুথ পাহারায় হাতে আধুনিক বন্দুক নিয়ে থাকে, তারা সাধারণত কোনও বড় গোলমাল হলে ঠেকানোর জন্য থাকে। ভোটকর্মীদের সুরক্ষা তারা দেয় না। এ ক্ষেত্রে রাজ্য পুলিশকে এই ভোটকর্মীদের পাহারার দায়িত্ব দিতে হবে। মহিলা পুলিশকর্মীদের রাখতে হবে। কারণ, বহু বুথে অনেক মহিলাকর্মী ভোট পরিচালনা করতে যান। ভোটকেন্দ্রে সকাল ছ’টায় মক পোল হয়ে গেলে অনেক সময়ই শাসক দল ছাড়া অন্য দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বুথ ছেড়ে চলে যান। বিশেষত মফস্সল ভোট কেন্দ্রে এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সেই ক্ষেত্রে সকল দলের প্রার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোট যত ক্ষণ না শেষ হচ্ছে তত ক্ষণ অবধি ভোট কেন্দ্রে থাকতে হবে। এঁরা এলাকার সকল ভোটারকে চেনেন। তাই নকল বা ভুয়ো ভোটার চিনিয়ে দিতে এঁরা সাহায্য করতে পারেন।
দেবানন্দ গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা-৩২
অস্বচ্ছতা
‘বিমা করলেও সুরক্ষা কোথায়’ (৮-১২) শীর্ষক নীলাঞ্জন দে-র প্রবন্ধটি পড়লাম। অসুরক্ষিত স্বাস্থ্যবিমায় রকমারি নিয়মগুলি মানুষ ঠকানো। সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে তবেই চিকিৎসকের কাছে যান, হাসপাতালে চিকিৎসকদের পরামর্শে ভর্তি হন এবং প্রয়োজনে অপারেশন করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। নির্ধারিত কিছু সংখ্যক সচেতন মানুষ এই স্বাস্থ্যবিমার আওতায় থাকেন, নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত টাকা সেই সংস্থাকে দিয়ে থাকেন। তার পর ক্লেম হলে নির্ধারিত প্রমাণপত্র প্রদান করে ডাক্তারবাবু, হাসপাতালের বিল, ওষুধের বিল প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক সেটলমেন্ট হয়। পলিসি অনুযায়ী প্রদেয় অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সেটাই সাধারণ মানুষজন জানেন বা বোঝেন।
কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, স্বাস্থ্যবিমা কর্তৃপক্ষ বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, নির্দিষ্ট কিছু অসুখ তাঁদের বিমা চুক্তির মধ্যে পড়ে না। সাধারণ বিমাকারীদের পক্ষে আগাম এ বিষয়টি জানা সম্ভব নয়। এজেন্টও এই বিষয়ে সব সময় আলোকপাত করেন না। স্বাস্থ্যবিমা সব রোগের জন্যই হওয়া উচিত। মানুষকে এমন বিভ্রান্তির হাত থেকে মুক্তি দিতে সরকার হস্তক্ষেপ করুক।
দেবাশীষ দত্ত, কলকাতা-৬৩
নতুন বছর
আবার একটা বছর শেষ হল। একটা তো বছরই। যেমন প্রতি বছর হয়, তেমনই। কিন্তু প্রতি বছর একটা কী পেলাম আর কী হারালাম গোছের আলোচনা সব জায়গায় শুরু হয়ে যায়। যেমন বলা হচ্ছে, ২০২৫ সাল কারও ভাল কাটেনি। চার পাশে নাকি কেবলই খারাপ খবর। আসলে সময় কখনও নিখুঁত হয় না। তা সত্ত্বেও আমাদের মন মানে না। আসলে কী তাই? এত খারাপ ঘটনার মাঝেও নিজেকে কি নতুন ভাবে চিনিনি? একটু হলেও কি বদলাইনি নিজেকে? বদলে যাওয়াই তো অলিখিত নিয়ম। কিন্তু যা বদলাচ্ছে না, তার কথা উঠছে কই। বেঁচে থাকার জন্য আজকাল একটু বেশিই কড়ি খরচ হচ্ছে না কি? নব্বই পেরিয়ে যাওয়া টাকার মূল্য অবশ্য আমজনতা বুঝবে না, কিন্তু আলু পটল মুলো উচ্ছে কিনতে গেলে তাঁদেরও পকেটে ছ্যাঁকা লাগে। ২০২৫-এও লাগত, ২০২৬-এও লাগবে। জীবন মানে শুধু পার্ক স্ট্রিটের শ্যাম্পেন নয়, ঝিটাবেড়ার দেওয়ালে আগড় দেওয়া দরজার ফাঁকে ফুরফুরে হাওয়ায় রেশনের চাল সেদ্ধ চেবোনোর গল্পও হোক। নতুন বছর তো তাঁদেরও।
শঙ্খ অধিকারী, সাবড়াকোন, বাঁকুড়া