‘বড়রা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন’ (১৬-৪) শীর্ষক প্রবন্ধে অন্বেষা দত্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে তুলে ধরেছেন। একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে ছেলেমেয়েদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পথে বেশ কয়েকটি দেশ ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। হয়তো আমাদের দেশেও এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে।
এই প্রসঙ্গে বড়দের দায়িত্ব কতটা এবং বড়রা বাচ্চাদের কী শেখাচ্ছি— এই প্রশ্ন অবশ্যই ওঠা দরকার। গৃহকোণে বাবা-মা ও অন্য বড়রা, বিদ্যালয়ে মানুষ গড়ার কারিগরগণ সকলেই কারণে-অকারণে মোবাইলে মশগুল। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ভুলিয়ে রাখার জন্য বড়রা তাদের হাতে মোবাইল দিয়ে নিজেরা নিশ্চিন্তে থাকেন। শৈশব-কৈশোরে স্মার্টফোনের প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলছি আমরা বড়রা। গ্ৰামাঞ্চলে গরিব পরিবারের বাবা-মায়েরা হয়তো নিজেদের সংসার চালানোর দায় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই এত সময় বা সুযোগ নেই স্মার্টফোন নিয়ে মেতে থাকার, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করেও সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। তার পরে একটু বড় হলে রাজ্য সরকারও এত দিন স্কুলপড়ুয়াদের স্মার্টফোন উপহার দিয়েছে। ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারের ভাল-মন্দ বোঝার আগেই তাদের হাতে চলে আসছে এক আনন্দময় জগতের হাতছানি।
এখন ট্রেনে-বাসে পরিচিত জনেরা পাশাপাশি থাকলেও কেউ কাউকে খেয়াল করেন না, কারণ সকলের মন থাকে সেই আশ্চর্য যন্ত্রের পর্দায়। বাড়িতে ছোটরা বড়দের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয় ওই একই কারণে। উপযুক্ত সময় ও মনোযোগ না পেয়ে তারা অনেক সময়ই বিপথগামী হয়। এর জন্য সব দায়িত্ব তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার আগে বড়দের দায়িত্বটি বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয় স্তরে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা দরকার। বাড়িতেও অভিভাবকদের ফোনের ব্যবহার নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ করে সেই সময় সন্তানকে দিতে হবে। বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত জানানো হোক স্মার্টফোন ব্যবহারের ভাল-মন্দ দিকগুলির বিষয়ে। এতে সামাজিক সচেতনতা তৈরি হবে।
সন্দীপ সিংহ, হরিপাল, হুগলি
আসক্তি নয়
‘বড়রা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন’ শীর্ষক অন্বেষা দত্তের প্রবন্ধ সম্পর্কে কিছু কথা। ১৫-১৬ বছরের নীচে সমাজমাধ্যম ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার শুরুটা বিদেশে হলেও এ দেশেও যে তার আংশিক প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া পড়েছে, তা কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। প্রবন্ধেও সেটি উল্লিখিত। শিশু ও কিশোরদের উপর স্মার্টফোনে সমাজমাধ্যম, ইউটিউব ইত্যাদির প্রভাব নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ বছরের নীচে ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য পৃথক নিয়ম আনার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুসারে ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের তিনটি আলাদা বিভাগে ভাগ করার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মতে বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা আলাদা নিয়ম করলে তা কার্যকর করা কঠিন। প্রতিটি বয়সের জন্য সমাজমাধ্যম ব্যবহারের নিয়ম আলাদা হতে পারে। পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিবর্তে বয়স অনুযায়ী সীমিত নিয়ন্ত্রণ বেশি কার্যকর হতে পারে বলেও সমীক্ষাতে উঠে এসেছে।
প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়। সচেতন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবহার আমাদের বিপন্মুক্ত করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, এবং পড়াশোনার জন্য কিছুটা বাধ্য হয়ে সন্তানদের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে স্মার্টফোন। তবে ফোনের প্রতি অতিনির্ভরতা যেন ধীরে ধীরে আসক্তিতে পরিণত না-হয়, লক্ষ করতে হবে। অভিভাবক এবং শিক্ষক শিক্ষিকাদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক সময় বাবা-মা সন্তানদের দীর্ঘ সময় ফোনে ব্যস্ত দেখেও চুপ থাকেন। এই চুপ থাকা বিপজ্জনক। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকালেই যদি দীর্ঘ ক্ষণ ফোনে মগ্ন থাকার অভ্যাস তৈরি হয়, তা হলে তার কথা বলায় বিলম্ব ঘটে। শিশুদের স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠার পথে এই অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম এক ধরনের ‘নীরব মহামারি’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, দীর্ঘ ক্ষণ স্ক্রিনের সামনে থাকা, ক্রনিক মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ তরুণ প্রজন্মের হার্টের মারাত্মক ক্ষতি করছে। বর্তমানে কিশোর কিশোরীরা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম ঘুমোয়। তার প্রধান একটি কারণ গভীর রাত পর্যন্ত স্মার্টফোনের ব্যবহার। ফলে তাদের মানসিক স্থিতি এবং সামাজিক আচরণ ধাক্কা খাচ্ছে। সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণ বর্জন নয়, গ্রহণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি।
সুব্রত পাল, কলকাতা-৩৮
ভারসাম্য
‘বড়রা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই বলতে হয়, স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন সমাজমাধ্যম ব্যবহারের নেশা অন্যান্য নেশার দ্রব্যের মতো মস্তিষ্কের একই রকম কার্যকারণ অনুসারে চলে। সমাজমাধ্যমের প্রতি অতি আসক্তির কারণে মানসিক বিপর্যয়ের কথা চিকিৎসাবিদ্যা বলছে। পাশাপাশি অপরাধ প্রবণতা ও সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধির কথা পরিসংখ্যান জানাচ্ছে। মোবাইলে সমাজমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার তিন দশক ধরে একটু-একটু করে মানুষকে সামাজিকতার পরিসর থেকে ক্রমশ সরিয়ে এনেছে। তাই এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক। তবে, আজকের দুনিয়ায় বড়দের আসক্তিই এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের আসক্তির বড় কারণ। তাই অভিভাবকরা যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ না করতে পারেন, তা হলে শুধুমাত্র সরকার নির্দেশিত নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ ফল পাওয়া মুশকিল।
অভিভাবকদের দায়িত্ব নিয়ে সামাজিক ক্ষেত্রের মেলামেশায় শিশুদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। প্রশাসনকে সমাজমাধ্যম ও মোবাইল ফোন অতি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাবের দিকগুলি বেশি করে প্রচার করতে হবে, যাতে শিশু এবং কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা হয়। পাশাপাশি তারা যাতে ডিজিটাল বিশ্বে ভারসাম্য বজায় রেখে সঠিক ভাবে চলাচল করতে পারে, সেটাও দেখতে হবে।
স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০
ছোট প্রাণ
প্রকৃতির ভারসাম্য টিকে থাকে অসংখ্য ছোট প্রাণীর উপর, যাদের অনেককেই আমরা চোখেই দেখি না বা গুরুত্ব দিই না। মৌমাছি, প্রজাপতি, ফড়িং, গুবরে পোকা, পিঁপড়ে, কেঁচো, মাকড়সা, ব্যাঙ, পাখি, ছোট মাছ— এই সকল জীব এক সঙ্গে মিলে এক জটিল বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে। এর মধ্যে পরাগ মিলনে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্যকারী মৌমাছি। মৌমাছি কমে গেলে ফলন কমে, খাদ্য সঙ্কটের সম্ভাবনা বাড়ে। একই ভাবে প্রজাপতি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গও এই কাজে সাহায্য করে।
কেঁচো মাটির উর্বরতা বাড়ায়, মাটি ঝুরঝুরে করে। ব্যাঙ ও ফড়িং মশা ও ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে রোগের ঝুঁকি কমে। পাখিরা বীজ ছড়ায়, যা নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে। কিন্তু মানুষের কার্যকলাপ এই পুরো ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে উপকারী কীটপতঙ্গ ও মাটির জীববৈচিত্র কমে যাচ্ছে। বনভূমি ধ্বংস ও নগরায়ণের কারণে পাখি ও ছোট প্রাণীদের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। জলাশয়ে প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্য ফেলার ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীরা মারা যাচ্ছে। এই ক্ষতি আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না, কারণ এটি ধীরে ধীরে ঘটে। কিন্তু এর প্রভাবে ফসল উৎপাদন কমে যায়, মাটির গুণগত মান নষ্ট হয়, পোকার উপদ্রব বাড়ে এবং খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ, ছোট প্রাণীর ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেই প্রভাবিত করে।
সন্দীপন সরকার, পাল্লা রোড, পূর্ব বর্ধমান