Road Accidents

পথের কাঁটা

দেশের মোট সড়কের মাত্র ২% জাতীয় সড়ক হলেও, সড়ক-দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ৩০% এখানেই ঘটে। অন্ধকারে সড়ক জুড়ে দাঁড়ানো অতিকায় ট্রাকের সারির মৃত্যুফাঁদ, অন্ধকার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা রাজস্থান ও তেলঙ্গানায় দু’টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৭:১৮

মসৃণ, প্রশস্ত, দ্রুতগামী জাতীয় সড়ক জাতির উন্নতির প্রতীক। কিন্তু, ভারতে তা আতঙ্কের উৎস। দেশের মোট সড়কের মাত্র ২% জাতীয় সড়ক হলেও, সড়ক-দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ৩০% এখানেই ঘটে। অন্ধকারে সড়ক জুড়ে দাঁড়ানো অতিকায় ট্রাকের সারির মৃত্যুফাঁদ, অন্ধকার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা রাজস্থান ও তেলঙ্গানায় দু’টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এর পরে শীর্ষ আদালত সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের আওতায় সড়ক-নিরাপত্তাকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে বিধিনিয়ম কঠোরতর করেছে। নির্দেশানুযায়ী, সীমা নির্দিষ্ট করা পার্কিং এলাকা ছাড়া জাতীয় সড়কের যান চলাচলের পিচরাস্তায় কিংবা রাস্তার পাশের সমতল অংশে ভারী বা বাণিজ্যিক যান দাঁড় করানো নিষিদ্ধ হয়েছে। রাস্তা দখল করে দোকান বা বাণিজ্যিক কাঠামো নির্মাণও বন্ধ করা হয়েছে। অনুরূপ বেআইনি নির্মাণ উচ্ছেদ, প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি চালু করা ও ৬০ দিনের মধ্যে তা বাস্তবায়িত করার সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অব ইন্ডিয়া, পুলিশ এবং পরিবহণ দফতর একযোগে এই নিয়ম কার্যকর করবে এবং কার্যপদ্ধতি তৈরি ও প্রয়োগের জন্য দায়ী হবেন জেলাশাসকরা। নজরদারি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং দায়বদ্ধতার সমন্বয়ের মাধ্যমে সড়ক-নিরাপত্তা বাড়ানোর পক্ষে কাগজেকলমে বেশ সুসংহত, সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ এই রায়।

তবে বিচার বিভাগকে সম্মান জানিয়েই বলা যায় যে, অনিয়ন্ত্রিত গতিও কিন্তু বহুলাংশেই বিপদের অন্যতম হোতা। এর সঙ্গে জোড়ে ঠিক ‘লেন’-এ গাড়ি চালানোয় শৃঙ্খলার অভাব, চালকের ক্লান্তি, উজ্জ্বল ও দৃষ্টিগ্রাহ্য পথনির্দেশিকা, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে গতি নিয়ন্ত্রক এবং গাড়ির ‘রিফ্লেক্টর লাইট’ লাগানোয় গড়িমসি। অন্ধকারে ধাবমান যান হঠাৎ, স্থির, আলোকসঙ্কেতবিহীন কোনও বড় প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়লে সামান্য ভুল থেকেও মারাত্মক বিপদ ঘটে। নিয়মিত কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এই বিপদগুলি এড়ানো সম্ভব। কিন্তু, সেখানেই সমস্যা। দেশে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন বা নির্দেশের অভাব নেই, কিন্তু ‘ঘণ্টা বাঁধে কে’? আদালত নির্দেশিত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে সাফল্যের জন্যও প্রাতিষ্ঠানিক সক্রিয়তা, সদিচ্ছা নিশ্চিত করা জরুরি। বিভাগগুলির মধ্যে দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট বিভাজন, গতি নিয়ন্ত্রকের ব্যবহার, যান ও চালকদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাও প্রয়োজন। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্তকে চিহ্নিত করে শাস্তির অনমনীয়তা ও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত রাখলেও অবহেলা কমানো যাবে।

দেখা যায়, দূরপাল্লার ভারী যানের চালকেরা অনেক সময়ই পর্যাপ্ত বিশ্রামস্থলের অভাবে পিচরাস্তার পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হন। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তাঁদের জন্য পথের পাশে পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধাযুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্রামস্থল আবশ্যক। আদালতের নির্দেশে এই সমস্যার কথাও রয়েছে। সমাধানে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ। তাৎক্ষণিক অভিযানের পাশাপাশি নজরদারি নিয়মিত করা চাই। নচেৎ, আইনের কঠোরতা চালকদের শোষণ, জরিমানা ও উৎকোচ আদায়ের পন্থা রূপে ব্যবহার হবে। প্রতিটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয়, নিরীক্ষণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অবিলম্বে পরিকাঠামো নির্মাণের আয়োজন বিনা এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশও কালগর্ভে হারিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন