নিরাপত্তার নামে নাগরিক পরিসরে নজরদারির জাল ক্রমশ আরও বিস্তৃত করছে কেন্দ্রীয় সরকার, এই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার কোনও জায়গা নেই। যদিও সাইবার প্রতারণা রোধ, ডার্ক ওয়েব পর্যবেক্ষণ বা আর্থিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ, সবই রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, কিন্তু, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাম্প্রতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর পরিকল্পনা সেই সীমা অতিক্রম করে নাগরিক-প্রোফাইলিংয়ের দিকে এগোচ্ছে, এমন আশঙ্কা করার কারণ অতি প্রকট। ‘সাসপেক্ট স্কোরিং’, আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ, এমনকি যাত্রী-প্রোফাইলিংয়ের পরিকল্পনা— এই সমস্ত ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত যুক্তি একটাই: রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি নাগরিকই সম্ভাব্য অপরাধী, ফলে প্রত্যেকের প্রতিই রাষ্ট্রের সন্দেহের দৃষ্টি। আরও স্পষ্ট করে বললে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের সম্ভাবনা যে নাগরিকের যত বেশি, তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের সন্দেহও ততই তীব্র। অপরাধ দমন এবং নাগরিক-নজরদারির মধ্যে একটি মৌলিক সীমারেখা আছে; বর্তমান পরিকল্পনা সেই সীমারেখাকে ঝাপসা করে দিচ্ছে। এই পদক্ষেপকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখারও অবকাশ নেই। পেগাসাস বিতর্ক, ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের পুনঃপুনঃ প্রয়াস, ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন’ প্রযুক্তির বিস্তার, এবং আধার-তথ্য সুরক্ষায় বারংবার প্রশ্ন— বর্তমান বিজেপি সরকারের অতীত রেকর্ড নজরদারি-রাষ্ট্রের দিকে তার প্রবণতাকে স্পষ্ট করে। অন্য দিকে, আধার-এর মতো নাগরিক-তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে সরকার অতীতে ব্যর্থ হয়েছে, তার হাতে আরও উন্নত প্রোফাইলিং প্রযুক্তি কেন্দ্রীভূত হওয়া ভয়ঙ্কর। সে প্রযুক্তি ভুল লোকের হাতে পড়লে কল্পনাতীত বিপদ ঘটতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে নাগরিকের উপরে নজরদারির প্রবণতা দেখা গিয়েছে। তবে বহু ক্ষেত্রেই এই পদক্ষেপ তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। আমেরিকায় হোমল্যান্ড সিকিয়োরিটির এআই-নির্ভর পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা নিয়ে নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং প্রযুক্তি-নীতিবিদদের আপত্তি সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রেডিক্টিভ পোলিসিং, বায়োমেট্রিক নজরদারি, অ্যালগরিদমিক ঝুঁকি নির্ধারণ— এগুলি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কারণ এগুলি অপরাধ প্রতিরোধের নামে নাগরিককে সন্দেহের স্থায়ী কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। এই প্রসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সংস্থা অ্যানথ্রপিকের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় চাপ সত্ত্বেও গণ-নজরদারিতে এআই ব্যবহারের নিরাপত্তা-বেষ্টনী শিথিল করতে তারা অস্বীকার করেছে। প্রযুক্তি সংস্থার এই অবস্থান দেখিয়ে দেয় যে, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি-নৈতিকতা রাষ্ট্রের প্রতিটি দাবিকে মেনে না নিয়ে নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষার লক্ষ্যকে তুলে ধরতে পারে। অ্যানথ্রপিক রাজি না হলেও ওপেনএআই সে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। অধিকাংশ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে চটাতে সাহস করে না— গণতন্ত্রের পক্ষে এই কথাটি গভীর উদ্বেগের কারণ।
মনে রাখতে হবে যে, গণতন্ত্রের উপরে নজরদারির অভিঘাতটি তাৎক্ষণিক নয়; তা ধীরে ধীরে নাগরিকের মনোজগতে প্রবেশ করে। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, রাষ্ট্র তাঁদের আচরণ, মতামত, গতিবিধি— সবই পর্যবেক্ষণ করছে, তখন আত্ম-নিয়ন্ত্রণ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে তখন আর আইনের প্রয়োজন হয় না; মানুষের ভীতিই তাকে সে দিকে ঠেলে দেয়। এই পরিবেশই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি। বর্তমান বিজেপি সরকারের আচরণে সেই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা অনস্বীকার্য— সমালোচনাকে শত্রুতা হিসাবে দেখা, বিরোধী মতকে সন্দেহের চোখে বিচার করা, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিকে ব্যবহার করে প্রতিরোধের পরিসর সঙ্কুচিত করা। শাসকদের মনে রাখা দরকার যে, গণতন্ত্রে বিরোধিতা কোনও ‘সিকিয়োরিটি রিস্ক’ নয়; নাগরিকের অবাধ মতপ্রকাশই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি।