২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী বিজেপি অন্যতম প্রধান নির্বাচনী বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছে— নারীসুরক্ষা। প্রথম থেকেই বিজেপির কর্মধারা ও চিন্তাধারার সঙ্গে বিষয়টির সাযুজ্য নিয়ে অনেক সমালোচনা ও রঙ্গব্যঙ্গ শোনা গিয়েছে। তবে ভোটের দ্বিতীয় দফার ঠিক মুখে এসে গৈরিক বাস্তুতন্ত্র নিজেই নিজের স্লোগান ও অবস্থানকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণ করে দিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এমন একটি ‘মিম’ শেয়ার করল, যা কোনও সভ্য সমাজে কল্পনারও অতীত। সেই মিমে শুধুই ঘিনঘিনে নারীবিদ্বেষ। ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির নেতা-সমর্থকরা মহিলাদের কোন চোখে দেখেন, এই মিম-কে তার নির্দেশক বলে ধরে নিলে ভুল হবে না, কেননা দলীয় নেতানেত্রী বা সমর্থক বাহিনী, এমনকি বাঙালি বিজেপি-মনস্ক সমাজ, কোনও দিক থেকে এর বিরুদ্ধে সরবতা দেখা যায়নি। যাঁর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিল্লি থেকে ডেরাডান্ডা তুলে বাংলায় পড়ে থাকতে হচ্ছে, যাঁর সঙ্গে টক্কর নিতে একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে উড়িয়ে আনতে হচ্ছে, সেই দাপুটে শক্তিশালী বর্ষীয়সী নেত্রীও শেষ পর্যন্ত বিজেপির কাছে একটি নারী শরীরমাত্র— যাঁকে কাবু করার অস্ত্র হল যৌন আক্রমণ। পন্থাটি অতি চেনা— পুরুষতন্ত্র ঠিক এ ভাবেই নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে, শাসন করতে, শাস্তি দিতে অভ্যস্ত। গোটা দেশ জুড়ে ধর্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য গৈরিক রাজনীতির বহু দিনের। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, এই রাজ্যে এমন এক জন প্রার্থী এ বার এই দলের পক্ষে ভোটপ্রার্থনা করছেন, যিনি একটি মর্মান্তিক ধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত ভাবে লড়ছেন। তিনি ও তাঁরা যদি বিশ্বাস করে থাকেন যে, উত্তরপ্রদেশ-মহারাষ্ট্র-হরিয়ানায় বিজেপি যা-ই করুক না কেন, এই বঙ্গে এসে নারীসম্মান রক্ষার লড়াইয়ে নামবে, এই মিম-কাণ্ড তাঁদের বিশ্বাসের ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করে দেয়।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন এলেই গৈরিক নেতারা ‘বিদ্বজ্জন’ সাজতে চান— এ বারও তাঁরা ‘বঙ্কিমদা’, ‘রবীন্দ্রশঙ্কর’ ইত্যাদি আওড়েছিলেন; গঙ্গাবক্ষে নৌকাবিহার করেছিলেন। কিন্তু, সংস্কৃতির চাদর দিয়ে আর কত ক্ষণই বা অন্তরের কুৎসিত রূপ চাপা দেওয়া যায়? কেউ বলতে পারেন, এই মিম শেয়ার করেছে কোনও ব্যক্তি— সেই দায় কি দলীয় নেতৃত্বের উপরে বর্তায়? এই প্রশ্নের উত্তর দ্ব্যর্থহীন— ‘হ্যাঁ’। কোন কাজটি করা যায় আর কোনটি কোনও মতেই করা চলে না, দলের অভ্যন্তরে সেই সীমারেখাটি নির্ধারণ করার কাজ শীর্ষনেতৃত্বের। অথচ রাজনৈতিক বা সামাজিক, কোনও পরিসরেই যে এমন কুৎসিত যৌন আক্রমণের কোনও স্থান নেই, এই কথাটি বিজেপির নেতারা দলীয় পরিসরে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাই করেননি। বরং বুঝিয়ে দিয়েছেন, যে কোনও আক্রমণই বৈধ, সঙ্গত। গত বার প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ‘দিদি, ও দিদি’ বলে টিটকিরি কেটেছিলেন, এ বারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি অভব্য ডাক শোনা গিয়েছে। এক দিকে অন্তরে সুতীব্র নারীবিদ্বেষ, অন্য দিকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক আচরণের ছাড়পত্র— দুইয়ে মিলে তৈরি হয়েছে এই মিমটি। তার নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় দলীয় নেতৃত্বকে নিতে হবে বইকি।
এই কুৎসিত আঁধারেও একটি আশার কথা, দলমত নির্বিশেষে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই আক্রমণের প্রতিবাদ হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর কট্টর বিরোধী, এমন বহু মানুষ নির্দ্বিধায় বলেছেন, এই বর্বরতাকে কোনও মতেই সহ্য করা যায় না। এক নারীর বিরুদ্ধে এমন যৌন আক্রমণ আসলে সব মহিলার অপমান, সবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া। তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের আবহেও দলের ঊর্ধ্বে উঠে এমন জোরালো প্রতিবাদ পশ্চিমবঙ্গ সম্বন্ধে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। বিদ্বেষের রাজনীতি বহু দূর শিকড় ছড়িয়েছে, কিন্তু তার পরও পশ্চিমবঙ্গ সীমা টানতে জানে। এখনও।