লজ্জা করতে নাই। লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, তিন থাকতে নয়— শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের উচ্চারিত এই ব্যাজবাক্যটি বাঙালি চেতনার অতি নিজস্ব অভিজ্ঞান। ফলে ধরে নেওয়া যায়, এখনও পর্যন্ত এই বচন দিল্লির বিজেপি নেতাদের অনধিগত। তাঁরা প্রাণপণ বাঙালিত্ব বোঝার প্রয়াস করে চলেছেন, এখনও অবধি ব্যর্থ প্রয়াস। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা থেকে ২০২৬ সালের ভোটের আগে ‘বঙ্কিমদা’-র গুণকীর্তন, একই সুতোয় বাঁধা বিজেপি বাঙালি-বীক্ষণ। তবে না জেনেও তাঁরা এই প্রবচনের অন্তর্নিহিত অর্থটি বিলক্ষণ অনুধাবন করেছেন। তাই অসত্যবাচনের রাজনীতিতে লজ্জাহীন ভাবে অবগাহন করেছেন। এই যেমন, পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ ‘৫০ লক্ষের বেশি অনুপ্রবেশকারী’র নাম কাটা গিয়েছে— গত রবিবার এ রাজ্যে এসে এ কথা সজোরে বললেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। গুরুত্বপূর্ণ এই পদাধিকারীর গলায় এ কথা শোনা গেল একাধিক বার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও গত সোমবার জনসভায় বলতে শোনা গেল, পশ্চিমবঙ্গে বিনা বাধায় অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকানো হয়েছিল, এখন তাদের নাম কাটা যাচ্ছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের তাড়ানো হবে। এসআইআর তালিকায় বাতিল নামগুলি দেখে আশ্চর্য হতে হয় এই মিথ্যাভাষণের সাহসে, ও লজ্জাবোধের অসামান্য অভাবে। কেননা, এত দিনে খররৌদ্রের মতো স্পষ্ট, এসআইআর-এ যে ৫০ লক্ষাধিক নাম প্রাথমিক খসড়াতেই বাতিল, তার মধ্যে মুসলমান নাম স্বল্প, এবং যে ৬০ লক্ষাধিক নাম ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র নতুন গুঁতোয় সন্দেহভাজন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, তার মধ্যে মুসলমান-হিন্দু অনুপাত উনিশ-বিশ। সুতরাং ‘রোহিঙ্গা’, ‘ঘুসপেটিয়া’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’র সংখ্যা তো মিলছেই না, বরং এত পরিমাণ হিন্দু নাম বাদ চলে যাওয়ার ঘটনাটি বিজেপি নেতারা স্বীকারও করছেন না।
এহ বাহ্য। লজ্জা যে থাকতে নেই, তার সম্যক উদাহরণ ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনও। চলমান সপ্তাহে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পশ্চিমবঙ্গ সফর সেরে ফিরে যাওয়ার সময় লিখিত সরকারি রিপোর্টে জানালেন যে রাজ্যের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই নাকি যে ভাবে এসআইআর চলছে, তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দাবিটি অতি মাত্রায় সন্দেহজনক— বদ্ধ দরজার ও-দিকে গোপন মোলাকাতে সত্যই কী হয়েছে তা জানা না থাকলেও। বিজেপি ছাড়া রাজ্যের প্রতি রাজনৈতিক দলই বিষম ক্ষুব্ধ, তীব্র প্রতিবাদে শামিল এসআইআর-এর ষাট লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’-এর তালিকা নিয়ে। তাঁরা সেই কথাই নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যক্ত করেছেন, এটাই অনুমেয়, এবং তাঁদের নিজেদের প্রদত্ত বক্তব্যে এ কথাই প্রকাশিত। তা হলে কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন ও তার প্রধান ব্যক্তি এমন মন্তব্য নথিবদ্ধ করতে পারলেন? এর মধ্যে কি সরাসরি অসত্যভাষণ নেই? বাস্তবিক, সিপিএম দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কমিশনের রিপোর্টের এই দাবির প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, এবং নিজেদের অবস্থান আর এক বার স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু কোনও এক অলক্ষ্য ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন এখন ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্যতম ‘প্রশ্নাতীত’ প্রতিষ্ঠান, তার কাছে কোনও সমালোচনা, প্রশ্ন, সংশয়, এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ-নির্দেশ, সবই তুচ্ছ, মায়া। সত্য কেবল অ-সত্যের অবারিত, অলজ্জিত প্রচার, প্রসার ও প্রতাপ।