দিল্লির দুষণ।
যা প্রত্যাশিত, ফলাফলে তারই প্রতিচ্ছবি দেখলে চমক লাগে না। তাই কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে যখন ফিনল্যান্ডের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ) জানায় যে, গত শীতে ভারতের ২৩৮টি শহরের মধ্যে ২০৪টিই প্রবল দূষণের শিকার হয়েছিল, তখন মনে হয়— এ আর নতুন কথা কী? সমীক্ষার ফল বলছে, সবচেয়ে দূষিত শহর গাজ়িয়াবাদ। সেখানে প্রধান দূষণকারী কণা পিএম ২.৫-এর গড় মাত্রা থেকেছে প্রতি ঘনমিটারে ১৭২ গ্রাম, যা দেশের গড়ের (প্রতি ঘনমিটারে ৪০ গ্রাম) চেয়ে ঢের বেশি। এর পরেই রয়েছে নয়ডা, দিল্লি, এবং গ্রেটার নয়ডা। দেখা গিয়েছে, সর্বাধিক দূষিত শহরের তালিকার প্রথম দশটির মধ্যে উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানার শহরগুলিরই জয়জয়কার। এর মধ্যেও চমক নেই। প্রতি বছর দেওয়ালির মরসুম কাটলেই এই শহরগুলির ভয়ঙ্কর দূষণ নিয়মিত ভাবে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। দূষণ থেকে বাঁচার সরকারি নির্দেশিকা লকডাউন পরিস্থিতিকে মনে করায়। সিআরইএ-র বিশ্লেষণ সেই সব বিপদ-চিত্রেই ফের সিলমোহর দিয়েছে।
কিন্তু এই যে অপ্রত্যাশিতকে প্রত্যাশিত বলে ধরে নেওয়া, দূষণের ক্ষেত্রে মারাত্মক সম্ভাবনার ইঙ্গিতবাহী। অর্থাৎ, দূষণ ধারাবাহিক ভাবে ঘটেই চলেছে, এবং তা প্রতিরোধে হয় কোনও প্রচেষ্টা আশানুরূপ ফল দিচ্ছে না, নয়তো প্রতিরোধ যে পথে হওয়া প্রয়োজন ছিল, সরকার তার সন্ধানে যথেষ্ট উদ্যোগী হচ্ছে না। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি, বিশেষত দিল্লি এবং সংলগ্ন অঞ্চলগুলির ক্ষেত্রে এই দুই প্রবণতাই বাস্তব। পরিবহণের ক্ষেত্রে জোড়-বিজোড় সংখ্যা, মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইড জাতীয় রাসায়নিক এবং লবণের কণা ছড়িয়ে কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা প্রভৃতি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার পর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান’ (জিআরএপি) প্রয়োগ করেছে দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে। কিন্তু সেটি মূলত দূষণ নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে প্রয়োগ হওয়া নিয়মবিধি। দূষণের মূল কারণ অনুসন্ধান করে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এখনও বড়সড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
বরং, কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক কখনও দাবি করছে, বায়ুদূষণের নিরিখে বিশ্বতালিকায় শহরগুলির স্থাননির্ণয় কোনও ‘অফিশিয়াল অথরিটি’ দ্বারা সম্পন্ন হয় না; কখনও বলছে বায়ুদূষণ এবং মানুষের মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা যায়, এমন কোনও জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। দেশের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং কমিটিগুলির বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি। সুতরাং, সরকারি সদিচ্ছা বিষয়ে প্রশ্ন তোলা অসঙ্গত নয়। একই কথা অন্য শহরগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কলকাতার বাতাসেও পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। মনে রাখা প্রয়োজন, কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বৃহৎ কলকারখানার সংখ্যা তুলনায় কম। তা সত্ত্বেও এমন অবস্থা উদ্বেগজনক। প্রশ্ন জাগে, বাতাসে ক্ষতিকর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি কমাতে জাতীয় নির্মল বাতাস প্রকল্প তবে কোন উদ্দেশ্য সাধন করছে? অবশ্য যেখানে খাস সংসদে দিল্লির বায়ুদূষণ সংক্রান্ত আলোচনা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না, অন্য কারণ দেখিয়ে অধিবেশন মুলতুবি করে দেওয়া হয়, সেখানে দেশের বায়ুদূষণ চিত্রটি অন্য রকম হলেই বরং আশ্চর্য বোধ হত। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেই সুযোগ রাখেননি।