জার্মানির এক মিউজ়িয়মে বিশেষ এক জন গাইডের ‘ডিউটি’ মাসে দু’বার, বহু দর্শক সেই দিনগুলোয় তাঁর তত্ত্বাবধানেই মিউজ়িয়ম ঘুরে দেখতে চাইছেন। এতই চাহিদা যে, দেখা যাচ্ছে পরের কয়েক মাসের ওঁর সব ‘শো’ হাউসফুল। বহুমূল্য ঐতিহাসিক শিল্পকর্মে ভরা মিউজ়িয়মকে এই গাইড গুলে খেয়েছেন; তাঁর জ্ঞান, বাক্ভঙ্গি, আন্তরিকতার টানেই নিশ্চয়ই সবাই ভিড় জমাচ্ছেন— মনে হওয়া স্বাভাবিক। আসল কারণ ভিন্ন। মানুষটি গোমড়ামুখো, সর্বদা বিরক্ত, যে দর্শকদের নিয়ে তিনি মিউজ়িয়ম ঘুরিয়ে দেখান, তাঁদের প্রতি তাঁর তাচ্ছিল্যভরা উপেক্ষা নিক্ষিপ্ত হতে থাকে পুরো সময় জুড়ে। দর্শকেরা ফোন ঘাঁটলে বা হাঁটার মাঝে একটু বসলে তিনি ভর্ৎসনা করেন, প্রায়ই দর্শকদের উদ্দেশে ছুড়ে দেন কঠিন সব প্রশ্ন— অতিথিদের জ্ঞানগম্যির ন্যূনতা বুঝিয়ে ছাড়াই যেন উদ্দেশ্য। মিউজ়িয়ম-কর্তৃপক্ষও তাঁর সম্পর্কে বর্ণনায় লিখেছেন ‘বদমেজাজি’, ‘অতি নীরস’। তা সত্ত্বেও কেন তাঁরই প্রতি আকৃষ্ট এত দর্শক? কারণ, এই পুরোটাই আসলে একটা ‘শো’, দর্শনার্থীরা মিউজ়িয়মের মধ্যে একটি পারফরম্যান্স দেখছেন, তারই অঙ্গ হয়ে। তা বলে মানুষটির মিউজ়িয়ম ঘুরে দেখানো, প্রতিটি শিল্প-প্রদর্শ সম্পর্কে তাঁর তথ্যদান কিন্তু মিথ্যে নয়: সব তাঁর অধীত বিদ্যা, ওই শিল্পজ্ঞান অর্জন ও তার বিতরণও তাঁর পারফরম্যান্স-এরই অঙ্গ। এবং সর্বোপরি ওই গোমড়ামুখ, তিরিক্ষি মেজাজ, কঠোর তিরস্কারও— অভিনেতা যেমন বিশেষ এক চরিত্রের খোলে ঢুকে গিয়ে আনখশির তা-ই হয়ে ওঠেন, ইনিও তা-ই করছেন, শুধু মঞ্চে নয়, প্রকৃত এক মিউজ়িয়মের অন্দরে, শিল্পোৎসাহী দর্শকের সামনে। অনেকে জেনেবুঝে আসছেন, অনেকে হয়তো না জেনেই; কিন্তু প্রত্যেকের আসল লক্ষ্য যে মিউজ়িয়ম ঘুরে দেখা তা পূরণ তো হচ্ছেই, উপরন্তু পাওয়া যাচ্ছে এক ভিন্ন ‘অভিজ্ঞতা’।
কেন এই অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হল? স্বাভাবিক ভাবে মিউজ়িয়ম ঘুরে দেখানোই যেখানে প্রত্যাশিত, সেখানে এমন এক উদ্ভট তরিকায় দর্শকেরা কেন জেনেবুঝে (বা অজানতে) গাইডের বেশে এক শিল্পী-অভিনেতার কাছে ভর্ৎসিত হবেন? আসল সত্য হল, এ এক উদ্ভাবনী বিপণন-কৌশল। কোভিডকালে দু’বছর সব বন্ধ থাকায় গড়পড়তা দর্শকের মিউজ়িয়ম যাওয়ার অভ্যাস চলে গেছে, ছোট-বড় বহু সংগ্রহশালা ঘরে বসে ডিজিটাল ব্যবস্থায় দেখে নেওয়া যায়। উপরন্তু দেশে দেশে নানা সরকার মিউজ়িয়মে ব্যয়-বরাদ্দ কমিয়েছে, নিজেদের খরচ নিজে তোলার নিদান দিয়েছে— এই পরিস্থিতিতে মানুষকে মিউজ়িয়মে ফেরাতে ছকভাঙা উপায় ছাড়া গতি নেই। এই কর্তৃপক্ষও তা-ই করেছেন, মিউজ়িয়মে আসা দর্শক ও তাঁদের গাইডের মধ্যে সচরাচর যে একঘেয়ে একটেরে সম্পর্কই দস্তুর, সেখানে বদল এনে। আর তাতেই ফলেছে দুর্দান্ত ফল, মানুষ আসছেন দলে দলে।
অর্থনৈতিক অবস্থা যখন প্রতিকূল, তখন কোনও প্রতিষ্ঠান কী ভাবে ভাববে, জার্মানির মিউজ়িয়মটি শুধু তারই উদাহরণ নয়। তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, তাঁরা মানব-মনস্তত্ত্বের একটি জটিল ও বিতর্কিত জায়গা স্পর্শ করেছেন— গড় মানুষের ‘শাসিত’ হতে চাওয়ার ইচ্ছা। মনে রাখতে হবে, মিউজ়িয়মের গাইডরূপী শিল্পী যে তিরিক্ষি মেজাজের অভিনয় করছেন, আগত দর্শকদের শিল্পজ্ঞানকে কাঠগড়ায় তুলে তাঁদের অবজ্ঞা করছেন, দর্শকেরা তা দিনের শেষে ‘উপভোগ’ করছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা, এবং অন্য আরও দর্শক ফিরে আসছেন ওই বিশেষ গাইডের কাছেই— ভর্ৎসিত, তিরস্কৃত হবেন জেনেও। বাংলা প্রবাদে যে ‘শক্তের ভক্ত’-এর উল্লেখ, সেই মনস্তত্ত্বই কি এখানে প্রমাণিত? গড় মানুষ কি আসলে কর্তৃত্বপ্রবণ, আধিপত্যবাদী, স্বৈরতন্ত্রী একনায়ককে ভক্তি করেন, তাঁর ‘শাসন’-এ পীড়িত হতেও পছন্দ করেন? মিউজ়িয়মের দর্শক-অভিজ্ঞতা এই বিতর্কিত ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে। মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন মানবমন রহস্যময়, তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা আচরণের যৌক্তিক ব্যাখ্যা সর্বদা মেলে না। মিউজ়িয়মের বহু দর্শক বদমেজাজি গাইডের মধ্যে ছেলেবেলার রুক্ষ শিক্ষক, বাড়ির কঠোর অভিভাবক, যৌবনের একদা-প্রণয়ীরও ছায়া দেখতে পারেন; হয়তো সেই রুক্ষতা ও কঠোরতার প্রতি তাদের এক ব্যাখ্যাতীত মায়া রয়ে গেছে। অপরাধবিজ্ঞানেও আছে ‘হাইব্রিস্টোফিলিয়া’র কথা, কুখ্যাত অপরাধীর প্রতি মানুষের দুর্নিবার আকর্ষণ। অসম্মানিত হবে জেনেও অপমানকারীর কাছেই মানুষের এই ছুটে যাওয়া— মিউজ়িয়মে, পরিবারে, সমাজে, বা রাষ্ট্রেও— তা কি তার ক্ষমতার প্রতি ভক্তির, এবং ক্ষমতার হাতে পীড়িত হতে চাওয়ারই প্রমাণ?