ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বার বার দাবি করে এসেছেন যে, ইরানে তাঁর সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য একটাই— তেহরান যেন ‘কখনওই পারমাণবিক অস্ত্র না পায়’, তা নিশ্চিত করা। অথচ, আমেরিকা-ইরান সংঘাত পঞ্চম সপ্তাহে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করার উদ্দেশ্যে গৃহীত কৌশলটি শেষ পর্যন্ত শুধু ইরানেই নয়, বিশ্ব জুড়ে এর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বস্তুত, ইরানের উপর হামলা এখন ইউরোপ থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশকে তাদের পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। যে সব দেশ একদা আমেরিকার পারমাণবিক ছত্রছায়ায় নিজেদের নিরাপদ মনে করত, আজ তারাই আমেরিকার অনিশ্চয়তার মাঝে সার্বভৌম বিকল্প খুঁজতে ব্যস্ত। অন্য দিকে, যুদ্ধের মাঝে ইরানের আইনপ্রণেতারা ‘ট্রিটি অন দ্য নন-প্রলিফারেশন অব নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স’ (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সংসদে একটি বিল জমা দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, এনপিটি-তে চুক্তিবদ্ধ থাকার কোনও দায় তাঁদের নেই, যে-হেতু এটি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই পশ্চিম এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর অনুভূত হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ইরানের যুদ্ধকে তাঁর দেশের পারমাণবিক নীতির যথার্থতা প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। পিয়ংইয়্যাংয়ের অস্ত্রাগারকে ‘অপরিবর্তনীয়’ আখ্যা দিয়ে কিমের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। বলা বাহুল্য, এই মানসিকতাই আজ বিশ্বব্যাপী। বর্তমান আক্রমণ থেকে ইরান যদি টিকে যায়, তবে ধরে নেওয়া যায় যে তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও জোরদার হবে, যা সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সম্ভবত মিশরকেও নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করবে। পূর্ব এশিয়াতেও সমান অস্থিতিশীল চিত্র বিদ্যমান। তাইওয়ানের প্রতি চিনের মনোভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিতর্ককে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। অন্য দিকে, গত বছরের পহেলগাম সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও পাকিস্তানও আপাতত তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা কমাতে রাজি নয়। তা ছাড়া, গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে ট্রাম্পের ভাবনা ও ইরানের বিষয়ে তাঁর পদক্ষেপ ইউরোপেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আসলে, ইরান সংঘাত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক ব্যবস্থার সমস্যাগুলোকে উন্মোচিত করে দিয়েছে। এই অস্ত্রের বিস্তার রোধের লক্ষ্যে প্রণীত এনপিটি-র আসন্ন বৈঠকগুলোতে পারমাণবিক অস্ত্রধারী এবং অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রগুলোর মতবিরোধ এর ফলে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এনপিটি-র পরবর্তী সম্মেলন এ বছর ২৭ এপ্রিল থেকে ২২ মে পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পারমাণবিক সম্প্রসারণ-বিরোধী ব্যবস্থা আগেও কঠিন সময় পার করেছে। কিন্তু বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো যদি তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে এই ইঙ্গিত দিতে থাকে যে পারমাণবিক অস্ত্রই নিরাপত্তার একমাত্র নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা, তবে এই চুক্তি অনির্দিষ্ট কালের জন্য টিকে থাকতে পারবে না। আশঙ্কা, বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতি সেই দিকেই ধাবমান।