তেহরানে মার্কিন হামলায় গুঁড়িয়ে গিয়েছে ইমারত। ছবি: পিটিআই।
ইতিমধ্যে এক ভয়াল যুদ্ধে বিশ্ব সঙ্কটসঙ্কুল হয়ে পড়েছে। কোনও সাধারণ স্বার্থসংঘাত নয়, এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সমতুল্য, যা আরও খানিক বেড়ে গেলে চরম যুদ্ধের আকার নিতে পারে। অথচ ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্তের কোনও কূটনৈতিক যুক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ইরানের বিরুদ্ধে বহু গুরুতর অভিযোগ। অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিক দিক দিয়ে সদ্য-প্রাক্তন খামেনেই-জমানার সঙ্গে পশ্চিমি শক্তিসমষ্টির স্বার্থসংঘর্ষ বহুকালীন— বিশেষত খনিজ তৈল নামক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন একতরফা আগ্রাসন আটকানোর লক্ষ্যেই যে সব আন্তর্জাতিক রীতিনীতি নথিবদ্ধ হয়েছিল, তার ভিত্তিতে এই প্রত্যক্ষ আক্রমণ সমর্থনীয় নয়। ইরানের শীর্ষনেতা আয়াতোল্লা খামেনেই-কে দূরপাল্লার মিসাইল-অস্ত্র ঘরে ঢুকিয়ে হত্যা করা— বর্বরতার তুল্য। গভীর দুর্ভাগ্য, এই কাজ যে দু’টি দেশ করল, তারা নিজেরা গণতান্ত্রিক দেশ, এবং তাদেরই উপরে নাকি বিশ্বের তাবৎ গণতন্ত্রের সুরক্ষার ভার। গণতন্ত্র, সার্বভৌমতা— কোনও নীতিই যারা মানে না, এই স্ব-আরোপিত ভার যে তারা নিজেদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির আবরণ হিসাবেই ব্যবহার করে থাকে, এই দীর্ঘকালীন অভিযোগ হাতেনাতে প্রমাণিত হল। নেতানিয়াহুর রাষ্ট্রের চরিত্র গত আড়াই বছর ধরে প্যালেস্টাইন আক্রমণের নির্দয়তাতেই স্পষ্ট। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর যুদ্ধক্ষুধার্ত সহকারীরা ইজ়রায়েলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন এতটাই আগ্রাসী— হিসাব থেকেই সেটা স্পষ্ট। ১৩ মাস হল ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট-পর্ব চালাচ্ছেন, এর মধ্যে ৭টি দেশে তিনি আক্রমণ শাণিয়েছেন।
অন্য দিকে, ইরান পিছিয়ে থাকার দেশ নয়। ইরানের সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক ওজনও কম নয়। সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাঘাত চলেছে, পারস্য উপসাগর ও সন্নিহিত দেশগুলিতে। লাগাতার মিসাইল আক্রমণ ও বিস্ফোরণ চলেছে বেশ কয়েকটি আমেরিকার মিত্র দেশ বা অঞ্চলে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, যারা এর আগে কখনও প্রত্যক্ষত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি। ইরান-নিয়ন্ত্রণে যে হরমুজ় প্রণালী তৈলবাহী জাহাজ চলাচলের বিশেষ যাত্রাপথ বলে বিশ্ব-কূটনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল, অনেক দিনের অনেক হুমকি সত্ত্বেও যা গত কয়েক দশকে অবরোধ করা হয়নি, এ বার ইরান সেই প্রণালী আটকে দিল। বিমান চলাচলও সম্পূর্ণত ব্যাহত। পশ্চিম পৃথিবীর সঙ্গে পূর্ব বিশ্বের প্রধান বিমানযাত্রাপথগুলির ভরকেন্দ্র যে-হেতু গত আড়াই দশকে ইউরোপ থেকে পশ্চিম এশিয়ায় স্থানান্তরিত, গোটা বিশ্বযোগাযোগ ব্যবস্থাই আপাতত থমকে দাঁড়িয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্বে এই প্রবল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ও সামাজিক সঙ্কটাবস্থা তৈরি করার দায় কিন্তু প্রথমত ও প্রধানত ইজ়রায়েলকেই নিতে হবে। ‘প্রি-এম্পটিভ’ অর্থাৎ আগে থেকেই কোনও অবধারিত সংঘর্ষে নিজের চাল চেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা— এই যুক্তিই দেবে তেল আভিভ। কিন্তু তা ধোপে টেকানো মুশকিল। তেহরান মুখে একের পর এক হুমকি দিলেও নিজে থেকে এগিয়ে কোনও আক্রমণে শামিল হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক সময়ে, শূন্য। বরং গাজ়া সংঘর্ষ চলাকালীন ইরানের পরমাণুকেন্দ্র ধ্বংসের লক্ষ্যে যখন ড্রোন হানা চলেছে আমেরিকা-ইজ়রায়েল অক্ষের দিক থেকে, তার পরও তেহরান কোনও প্রতি-আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ করেনি। খামেনেই-এর স্পর্ধিত চরম কট্টরপন্থী শাসন পশ্চিম এশিয়ার মৌলবাদী ইসলামকে ব্যাপক সমর্থন জুগিয়ে চলত এবং এখনও চলছে, এ কথা প্রশ্নাতীত। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সেই সমস্যার সমাধান করতে চাইলে তো গোটা ইরান দেশটিকেই গুঁড়িয়ে দিতে হয়। তবে গাজ়ায় সদ্য-হাতপাকানো শক্তিসমূহের কাছে হয়তো এ সব কোনও যুক্তিই গ্রহণযোগ্য নয়। এ কেবল বর্বর ধ্বংস-উল্লাসের প্রহর।