Jana Kalyan Shibir

কল্যাণের আশায়

প্রথম দুই দিনে সমগ্র রাজ্যের প্রতিটি শিবিরে উপচে পড়া ভিড় দেখেই বোঝা সম্ভব, জনসমাজের মধ্যে এই নিয়ে কী পরিমাণ প্রত্যাশা বহমান। যদিও ইতিমধ্যে কিছু হতাশা ও আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ০৬:২৮

তিন দিনব্যাপী জনকল্যাণ শিবির সমগ্র রাজ্যেই বিশেষ আগ্রহ ও উৎসাহের সঞ্চার ঘটিয়েছে। ভোটের ফল বেরোনোর মাসাধিক কাল অতিক্রান্ত, তার মধ্যেই যে এই শিবির রাজ্যব্যাপী কাজ শুরু করতে পারল, তাতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর প্রশাসনের বিশেষ সাধুবাদ প্রাপ্য। সাধুবাদ প্রাপ্য, যে ভাবে সব সরকারি দফতরকে এক ছাতার তলায় এনে পরিষেবা প্রদানের ভাবনা করা হয়েছে, তার জন্যও। তিন দিন ধরে এই কর্মসূচি এক বিরাট আকারের আয়োজন— রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন স্থানে ১১০০ শিবিরের মাধ্যমে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের পঞ্চান্নটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ফর্ম ও তথ্যাদি বিতরণ করার লক্ষ্যেই এই কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও রূপায়ণ।

প্রথম দুই দিনে সমগ্র রাজ্যের প্রতিটি শিবিরে উপচে পড়া ভিড় দেখেই বোঝা সম্ভব, জনসমাজের মধ্যে এই নিয়ে কী পরিমাণ প্রত্যাশা বহমান। যদিও ইতিমধ্যে কিছু হতাশা ও আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অনেক শিবিরেই নাকি অনেক বিষয়ে ফর্ম পাওয়া যাচ্ছে না। আপাতভাবে নাকি সেই সংবাদ মানুষের কাছে আগাম পৌঁছয়নি বলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁরা অহেতুক নাকাল হয়েছেন, এমনও অভিযোগ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে উপস্থিত ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একটি শিবিরে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন পূর্বতন সরকারের আমলে সরকারি টাকা যোগ্যদের কাছে পৌঁছত না, বর্তমান সরকার যে অন্যায়ের প্রতিকারে অঙ্গীকারবদ্ধ। অঙ্গীকারটি সুখশ্রাব্য, যদিও মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, পূর্বতন আমলেও কিন্তু ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পের শিবিরে এমনধারা প্রতিশ্রুতিই শোনা যেত, এবং শেষ অবধি যদি কোনও ‘যোগ্য’ তাঁর প্রাপ্য না পেতেন, বা ‘অযোগ্য’রা তা পেতেন, তার আভাস শিবিরের ব্যস্ত কর্মময়তায় মিলত না। অর্থাৎ অঙ্গীকারে নয়, জনতার ভিড়ের পরিমাণে নয়, আগ্রহের উত্তুঙ্গতায় নয়— সরকারি যোজনায় কতখানি জনকল্যাণ শেষ অবধি সাধিত হবে, তা শিবিরের শেষে যখন সত্যিই মানুষ তাঁদের প্রাপ্য হাতে পান, তখনই বোঝা সম্ভব। বিগত সরকারের আমলে কেবল রাজ্য সরকারি ভাতার সুবিধাই পেতেন মানুষ, এ বারে রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য-কেন্দ্র দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানো গিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরাট সংখ্যক সহায়তা প্রকল্পে আবেদন করার সুযোগ মিলছে, সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি পরিমাণে সহায়তা পৌঁছনোর কথা। যে-হেতু আবেদন করা আর সেই আবেদন সফল ভাবে গৃহীত হওয়ার মধ্যে কিছু দূরত্ব থাকে— সাধারণ দরিদ্র মানুষের কাছে সরকারি ভাতা পৌঁছনোর পথ ও পদ্ধতিটি সরল রাখাই বাঞ্ছনীয় ছিল। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে বহু অন্যায় ও দুর্নীতি সত্ত্বেও পদ্ধতিগত সরলতার ফলে লক্ষ্মীর ভান্ডার বা কন্যাশ্রী প্রকল্পের সুবিধা অনেক দূর বিস্তৃত হতে পেরেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। নতুন বিজেপি সরকারকেও দেখতে হবে, পদ্ধতিগত জটিলতার জন্য যাতে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষ সরকারি সহায়তা প্রকল্পের আওতা থেকে বাদ না পড়েন।

স্বভাবতই, অন্নপূর্ণা ভান্ডার ও আয়ুষ্মান ভারত, এই দুু’টি প্রকল্প নিয়েই সর্বাধিক আগ্রহ। দুই ক্ষেত্রেই সুবিধাপ্রাপকের যোগ্যতা নিয়ে কিছু আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আশঙ্কা আরও বেড়েছে বিভিন্ন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীর বক্তব্যে, যেখানে তাঁরা বলেছেন, ফর্মে যে সব তথ্য চাওয়া হয়েছে তা কেবল উদ্দিষ্ট প্রকল্পের জন্যই নয়, আরও অন্যান্য সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য সংগৃহীত হচ্ছে। অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পের ফর্মের দৈর্ঘ্য নিয়েও কিছু অসহায়তা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, ফর্ম প্রদান সম্পন্ন হয়ে গেলেও সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে না, ফর্ম পূরণেও সাহায্য লাগবে। সেই পরবর্তী পর্যায়ের সহায়তাও নতুন সরকারের কাছে পাওয়া যাবে, রাজ্যবাসীর আশা। এও আশা যে, তথ্যের যথাযোগ্য সঙ্গত বিচারে, সংবেদন সহকারে সরকারি সহায়তা প্রকল্পগুলি সত্বর কার্যকর হতে চলেছে।

আরও পড়ুন