ভিত্তিহীন ভাবে কোনও মহিলার চরিত্রে কালিমালেপনকে সম্প্রতি ‘ক্ষতিকর সামাজিক হিংসা’ বলে চিহ্নিত করল কেরল হাই কোর্ট। একটি শিল্পী-সংগঠনের নির্বাচনে সভানেত্রী পদে লড়ার প্রাক্কালে অভিনেত্রী শ্বেতা মেননের বিরুদ্ধে সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে অশালীনতা ছড়ানোর অভিযোগ দায়ের করে তাঁর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এই উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগটি খারিজ করে আদালত শুধু ব্যক্তিগত পরিসরেই স্বস্তি ও সুবিচার নিশ্চিত করেনি, একটি দীর্ঘলালিত সামাজিক ব্যাধিকেও প্রতিরোধের পথ দেখিয়েছে স্পষ্ট আইনি ভাষায়। তবে, আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়েই বলা যেতে পারে যে বিচারব্যবস্থার সাম্প্রতিক কিছু পর্যবেক্ষণে নারীর আচরণ নিয়ে রক্ষণশীল মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। সেই প্রবণতার নিরিখে এই রায় তাৎপর্যপূর্ণ তো বটেই, ব্যতিক্রমী এবং আশ্বাসদায়ক। বস্তুত এই স্বীকৃতির মাধ্যমে আদালত ক্ষত ও ক্ষতির প্রচলিত পরিধিকে প্রসারিত করেছে, দৃষ্টিভঙ্গির এই স্বচ্ছতা বহুদিন যাবৎ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল।
স্বভাবতই এই রায়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশেষ উদ্বেগজনক। দেখা যায় যে, যখনই কোনও নারীর কৃতিত্ব ও সাফল্যকে সমাজের একাংশের মেনে নিতে অসুবিধা হয়, তাঁকে ‘নৈতিক’ ভাবে হেয় করার চেষ্টা শুরু হয়, এবং সেই নৈতিক বিচার অবধারিত মাপকাঠি হয়ে ওঠে তাঁর যৌন পরিচয় বা যৌন জীবন। এই নিকৃষ্ট সামাজিক অভ্যাস নারীর পেশাগত অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে, সুযোগ বুঝে ব্যবহার করা হয়। প্রকাশ্যে অপদস্থ করার যে কৌশল এই ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতেই প্রমাণিত যে নিয়ন্ত্রণ, ঈর্ষা, আধিপত্যকামী প্রবণতা ইত্যাদি হাতিয়ার হিসাবে পুরুষ-প্রাধান্যের সংস্কৃতিতে কত সযত্নরক্ষিত। এই দুষ্ট প্রবৃত্তিকে আরও উস্কানি দেয় ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির উগ্রতা— বর্তমান ভারতে যা প্রবল ভাবে উপস্থিত— যেখানে নারীদেহ ও যৌনতা আবার নতুন ভাবে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত। বিনোদন থেকে রাজনীতি— কোনও ক্ষেত্রেই ব্যত্যয় নেই। মহিলা প্রশাসকেরও একান্ত ব্যক্তিগত অতীত উত্থাপন করে তাঁকে মন্দ প্রতিপন্ন করার প্রয়াস দেখা যায়। ভুল করেও ভাবা যাবে না, কেবল পুরুষরাই এ কাজ করেন, এই শেষ দৃষ্টান্তই দেখিয়ে দেয় যে এই মানসিকতা নারীদের মধ্যেও কত পরিব্যাপ্ত। যে সমাজ এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে, নারী তো সেই সমাজেরই অঙ্গীভূত, সেই সমাজেরই নির্মাণ।
তবে কিনা, আদালত রায় দিতে পারে, ভর্ৎসনা করতে পারে, কিন্তু তাতে সমাজ ও তার নিয়ন্তাদের মনোভাব বদলাবে না। যত দিন সমাজ নারীর যৌন-স্বাধীনতাকে সুস্থ চোখে দেখতে শিখবে না, নারীর শরীর, তাঁর নিভৃত ইতিহাস এবং তথাকথিত ‘শারীরিক বিশুদ্ধতা’য় অপ্রয়োজনীয় ভাবে মনোযোগ ও গুরুত্ব আরোপ করবে— তত দিন এই প্রবণতা কমবে না। কোনও নারীর একাধিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীন সিদ্ধান্ত, অথবা সাহসী দৃশ্যে অভিনয় তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরেরই বিষয়। সামাজিক মঞ্চে তা আলোচনা বা বিচারের দরকারই নেই, ঠিক যেমন পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায়শই এগুলি ধর্তব্য হয় না। প্রশ্নটি সহজ— যদি এমন কোনও ঘটনা ঘটেও থাকে, তাতে কী যায় আসে? আদালত এই মৌলিক প্রশ্নটির উত্থাপন করেছে ও তাতে নিজের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছে। এ বার সমাজের উত্তর দেওয়ার পালা।