বিজেপি নেতারা সুকুমার রায়ের কবিতা পড়েননি, নাগাল্যান্ডবাসীও না— ধরে নেওয়া যায়। যদি পড়তেন, কার কেমন মুখের ভাবটি হত ভেবে আমোদ হয়। ভীষ্মলোচন শর্মার গানের চোটে যখন সবাই থরহরিকম্প, অনুরোধ-উপরোধেও কাজ হচ্ছে না, তখন এক অজশ্রেষ্ঠ শিং বাগিয়ে ‘মারলে গুঁতো পশ্চাৎ’, এবং “‘বাপরে’ বলে ভীষ্মলোচন এক্কেবারে ঠাণ্ডা।” সরকারি অনুষ্ঠানে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিজেপির উচ্চৈঃস্বর যখন মাত্রা ছাড়াচ্ছে, বিরোধীদের যুক্তিগ্রাহ্য তর্কও কানে উঠছে না, তখনই নাগাল্যান্ড আসল ‘গুঁতো’টি দিল। রাজ্যে শাসক দল নাগা পিপল’স ফ্রন্ট (এনপিএফ) এ ভাবে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার বিরোধিতা করেছে, তাদের বিধায়কেরা বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে কেন্দ্রের এ-হেন গানের গুঁতোর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। এহ বাহ্য, কয়েক দিন আগে নাগাল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মঞ্চে ‘বন্দে মাতরম্’ গান হওয়ার সময় অনেক ছাত্রছাত্রী সে-গান গাওয়া দূরস্থান, উঠেও দাঁড়াননি।
ভাবলেও আতঙ্ক জাগে, এই ঘটনা যদি নাগাল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে না হয়ে জেএনইউ-তে হত, এত ক্ষণে কী ধুন্ধুমার কাণ্ডই না শুরু হত। এনপিএফ না হয়ে এ ক্ষেত্রে যদি দলটির নাম কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস বা ডিএমকে হত, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা তাঁদের দেশপ্রেমী অস্ত্রভান্ডার থেকে আর কোন মর্মভেদী বাক্যবাণ নিক্ষেপ করতেন— ‘দেশদ্রোহী’, ‘আরবান নকশাল’, ‘মুসলিম লীগ’ ইত্যাদি তো ইতিমধ্যেই নিক্ষিপ্ত। অথচ, আশ্চর্যের ব্যাপার, নাগাল্যান্ডের জনপ্রতিনিধি ও ছাত্রসমাজের বিরোধিতার জবাবে বিজেপি নীরব, ‘এক্কেবারে ঠাণ্ডা’। তার কারণটি অবশ্য ভেবে ওঠা দুষ্কর নয়। রাজনীতি বড় বালাই, ভোট তারও বেশি। নাগাল্যান্ডে এনপিএফ-এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে বিজেপি, শাসনক্ষমতায় আসলে বিজেপি-জোট তথা এনডিএ, সে-রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রীও বিজেপির। এই পরিস্থিতিতে জোট-সঙ্গী এনপিএফ-এর বিধায়কেরা ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার বিরোধিতা করলেও নিজ রাজনৈতিক স্বার্থেই বিজেপির খোলার মতো মুখ নেই, চোটপাট তো পরের কথা। বিজেপি বিলক্ষণ জানে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের আগে যেমন ‘বন্দে মাতরম্’-এর জিগির তোলা তাদের কাজে দেবে, তেমনই নাগাল্যান্ডে এ নিয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়। কারণ ২০২৮-এ সেখানে ভোট, এর মধ্যে গত বছর অক্টোবরে নাগাল্যান্ডের পূর্বতন শাসক দল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি (এনডিপিপি) এনপিএফ-এর সঙ্গে মিশে গেছে, বিজেপি এখন এনপিএফ-এর জোট-সঙ্গী বলেই যে দু’বছর পরেও সেই বন্ধন অটুট থাকবে তা বলা চলে না, ‘বন্দে মাতরম্’ বা আর যে কোনও কিছু নিয়েই বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিজেপির সমস্যা হবে। এই সমস্যা এরই মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে উত্তর-পূর্বের অন্য রাজ্যেও: মেঘালয়ে ভিপিপি-র জনপ্রতিনিধি রাজ্য সরকারের কাছে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে আবেদন করেছেন, মিজ়োরামের ছাত্র সংগঠন এমজ়েডপি-ও প্রতিবাদে সরব।
উত্তর-পূর্বে যে ‘বন্দে মাতরম্’ সুবিধের হাতিয়ার হবে না, বিজেপি তা জানে বলেই নীরব। তদুপরি, নাগাল্যান্ড-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যবাসীর একটি বিরাট অংশ খ্রিস্টান, এবং জাতিগত ও সংস্কৃতিগত দিক দিয়েও এই রাজ্যগুলির স্বাতন্ত্র্য সংবিধান-স্বীকৃত, ৩৭১(এ) অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষিত। বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষের পাশে খ্রিস্টান-অপ্রীতি তত প্রকট ভাবে ফুটে না বেরোলেও, তার পরিমাণও কম নয়— বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে নেতা-মন্ত্রী ও সমর্থককুলের আচরণ ও কাজে ইদানীং তা নানা রূপে বিকশিত: ক্রিসমাস পালনে বাধা, চার্চ ও উৎসব প্রাঙ্গণে ভাংচুর, বিজেপি নেত্রীর দৃষ্টিহীন খ্রিস্টান ছাত্রীকে পীড়ন। এ হল ‘যেখানে যেমন সেখানে তেমন’ নীতি। নিজের পাড়ায় যে ‘বন্দে মাতরম্’ অস্ত্রে পেশি-ফোলানো দুর্বৃত্ত, বেপাড়ায় সে-ই রা না-কাড়া ভালমানুষ।