Political Power

চলমান ঘটমান

একই রকম প্রতাপে বিরাজ করত দুর্নীতিও— সেই অখণ্ড বাংলায়। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর স্মৃতিকথায় ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে কলকাতা কর্পোরেশনের দুর্নীতিবাজির কাহিনিমালা রয়েছে, আছে পুরনিগমের নির্বাচিত সদস্যদের দুর্নীতির বহু বিবরণ।

শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ০৪:২৯

মহাভারতে বনপর্বে যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্চর্য কী। উত্তরে প্রথম পাণ্ডব বলেছিলেন প্রতি দিন চোখের সামনে অসংখ্য জীব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে দেখেও যারা বেঁচে আছে তারা মনে করছে যে তারা চিরকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে— এমন আশ্চর্য আর কী আছে। যুধিষ্ঠির যদি আজকালকার দিন দেখতেন, হয়তো উত্তর হত অন্য রকম। প্রতি দিন চোখের সামনে ক্ষমতার অস্থায়িত্ব দেখেও, ক্ষমতাকে মায়াজাদুর মতো মিলিয়ে যেতে দেখেও, অসংখ্য মানুষ যারা ক্ষমতা লাভ করছে তারা ভাবে যে তারা চিরকাল ক্ষমতা ভোগ করে যাবে— এই হল আসল বিস্ময়! এত দিনে স্পষ্ট, ক্ষমতাই সম্ভবত সেই আশ্চর্যতম বস্তু, যার মোহপাশে প্রায় প্রতিটি মানবপ্রাণ বদ্ধ, এমনকি অবরুদ্ধ। যত রকম ‘তন্ত্র’ই বিশ্বদুনিয়া তৈরি করুক না কেন, শেষ অবধি ক্ষমতার তীব্র অভিলাষ ও অভিঘাত সব তন্ত্রকেই ভেঙে দেয়, যে কাউকে নিমেষে সিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে কাঙাল করে দেয়। গণতন্ত্রের উচ্চতা, ন্যায্যতা, গ্রাহ্যতা নিয়ে যত রকম উচ্চ ধারণাই থাক না কেন, তাকেও ক্ষমতার তরবারি এক কোপে দু’টুকরো করে দিতে পারে। বাঙালি আজ তা পলকে পলকে প্রত্যক্ষ করছে।

তবে ক্ষমতার এই তরবারির খেলা বাংলা নামে দেশে যে কত আগে থেকে চলছে, সে ধারণা হয়তো বাঙালির স্পষ্ট নয়। গণতন্ত্র যখন পুরোপুরি সর্বসাধারণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যখন স্বাধীনতা ও দেশভাগও হয়নি, যখন আজকের পশ্চিমবঙ্গ প্রাক্-স্বাধীনতা অবিভক্ত বঙ্গের এক অংশ, তখন থেকেই কিন্তু কলকাতা বিধানসভা ক্ষমতার মাদারি-খেল দেখছে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে যখন ১৯৩৬-৩৭ সালে প্রথম প্রাদেশিক আইনসভা তৈরি হল, সেই সময় থেকেই চলছে শাসক ও বিরোধী দলের ক্ষমতার দড়ি টানাটানি, এবং অনেক সময়েই সেই টানাটানি চলে— টাকার জোরে, ভয় দেখানোর পথে। ১৯৩৬ সালে বাংলার গভর্নর অ্যান্ডারসন ভাইসরয় লিনলিথগোকে গোপন রিপোর্টে জানিয়েছিলেন, “আমার কাছে তথ্য আছে আগের পর্ষদে বিরোধী নেতা কী ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভোটের জন্য কংগ্রেসের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা নিয়েছিলেন, অর্ধেক অগ্রিম আর বাকি অর্ধেক নির্দিষ্ট লবিতে যাওয়ার পর।” সেই সময়েও টাকা হাতবদল হত— যখন কোনও প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি চলত। তখনও তাকে বলা হত ঘোড়া কেনাবেচার খেলা। মুসলিম লিগ দলের নেতা ইস্পাহানি মহম্মদ আলি জিন্নাকে ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেছিলেন, “বিরোধী গোষ্ঠীর নেতাদের মাধ্যমে বিধানসভায় কেনাবেচা চলছে, অর্থের জোগান দিচ্ছে মাড়োয়ারিরা।” প্রসঙ্গত, মুসলিম লিগ মন্ত্রিসভা তখন ক্ষমতায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে। সেই সময়ে স্বল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল তাঁর। কিন্তু তারই মধ্যে আঠারো জন সরকারি পক্ষের বিধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিলেন, যার ফলে সরকার পড়ে গেল। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। চলতে চলতে এখন বিরোধী পক্ষও পড়ে যায়।

একই রকম প্রতাপে বিরাজ করত দুর্নীতিও— সেই অখণ্ড বাংলায়। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর স্মৃতিকথায় ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে কলকাতা কর্পোরেশনের দুর্নীতিবাজির কাহিনিমালা রয়েছে, আছে পুরনিগমের নির্বাচিত সদস্যদের দুর্নীতির বহু বিবরণ। ভুয়ো নির্বাচনী তালিকা তৈরির কথা। চাকরির জন্য বড় থেকে ছোট নানা পরিমাপের ঘুষ নেওয়ার কথা। রাজনৈতিক নেতাদের পছন্দসই লোকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা। কনট্রাক্ট প্রদানের ক্ষেত্রে আইন এড়ানো এবং বেআইনি পদ্ধতি গ্রহণ করার কথা। তাঁর ভাষায়, “কলকাতা পুরনিগমের দুর্নীতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এতটাই ট্র্যাজিক যে তা নিম্নমানের প্রহসনের পর্যায়ে চলে গেছে, সে বিষয়ে রাগ করাটাই শক্ত।” শরৎচন্দ্র বসু, যিনি নিজে দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন, নীরদ চৌধুরীর বর্ণনায় তিনি “একে দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হিসাবেই দেখেছিলেন।” অন্যান্য সরকারি নথি ও বেসরকারি লেখাপত্র থেকেও তখনকার বাংলা ও কলকাতার এই ছবিটিই মেলে, ইতিহাসবিদরা খতিয়ে দেখেছেন। ১৯৩১ সালে বিধানচন্দ্র রায় বল্লভভাই পটেলকে একটি ব্যক্তিগত পত্রে লিখেছিলেন, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত নিজে স্বচ্ছতার লড়াই চালিয়েছিলেন ও কলকাতা পুরনিগমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন বটে, তবে তাঁর নিজের আমলেও কিন্তু প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বিস্তর অভাব ছিল। প্রসঙ্গত, বিধানচন্দ্র ও যতীন্দ্রমোহন বাংলা কংগ্রেসের দুই মেরুতে বিরাজ করতেন। ফলে এ কথার কিয়দংশত বাতিলযোগ্য হতেই পারে। তবে তাতে মূল বিষয়টি হয়তো বাতিল হয় না— দুর্নীতিও ট্র্যাডিশন, চলছে চলবে।

আরও পড়ুন