Union Budget 2026-27

রাজ্যের ভাগে

রাজ্যের ভোটের জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটকে ব্যবহার করার নীতি এমনই স্পষ্ট এবং ব্যবহৃত যে, এ সংক্রান্ত আলোচনায় সেই বাস্তবটিকে অস্বীকার করার কোনও অর্থ হয় না।

শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৯
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন।

অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। ফাইল চিত্র।

গত বাজেটে বিহারের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছিল। একে কেন্দ্রে এনডিএ-র সরকারের অস্তিত্ব অন্তত আংশিক ভাবে হলেও নীতীশ কুমারের জেডি(ইউ)-এর উপরে নির্ভরশীল, তায় ২০২৫-এ রাজ্যে বিধানসভা ভোট ছিল। এই বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও বিহারের ভাগ্যের পুনরাবৃত্তি হয় কি না, সে কৌতূহল ছিল। নির্মলা সীতারামন কার্যত শূন্য হাতে ফিরিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গকে। ডানকুনি থেকে সুরাত পণ্য করিডর, বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি হাই স্পিড রেল করিডর এবং দুর্গাপুরে ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডরের একটি বড় কেন্দ্র— এ বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনও উল্লেখই বাজেটে কার্যত নেই। হিমালয়ে ট্রেকিং-হাইকিং, অথবা উত্তর-পূর্ব ভারতে বৌদ্ধ সার্কিটের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গকে সযত্নে বাদ রাখা হল। অবশ্য, যে মেডিক্যাল টুরিজ়্ম কেন্দ্র তৈরির কথা বাজেটে রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; পর্যটন ক্ষেত্রে জোর পড়লে এ রাজ্যের ভাগেও ছিটেফোঁটা পড়বে না, সে কথাও বলা চলে না। তবে, গত বছরের বিহারের সঙ্গে তুলনা করলে পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্তি যে অতি সামান্য, তাতে সন্দেহ নেই। কেন, সেই প্রশ্নের একটি উত্তর হাওয়ায় ভাসছে— এ বছরের বাজেটে সার্বিক উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, এবং তাকে অনুসরণ করলে সব রাজ্যই লাভবান হবে, ফলে কোনও রাজ্যের জন্য আলাদা করে ভাবার প্রয়োজন নেই। কথাটি শুনতে ভাল, কিন্তু অর্থহীন। অর্থমন্ত্রী যে ভঙ্গিতেই বাজেট পেশ করুন, এর মধ্যে অতীতের সঙ্গে কোনও স্ট্রাকচারাল ব্রেক বা কাঠামোগত পরিবর্তন নেই। সরকারের নীতি আদৌ পাল্টায়নি— এখনও সাপ্লাই-সাইড ইকনমিক্স-ই অর্থব্যবস্থার নির্ধারক নীতি। কাজেই, গত বাজেটে আলাদা করে বিহারকে গুরুত্ব দিলে যদি সে নীতি বিঘ্নিত না হয়, এ বছর নীতির সত্যরক্ষায় পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চিত করতে হল, এমন কথা যুক্তির ধোপে টিকবে না। কেন এ রাজ্যের প্রতি এমন আচরণ, সে উত্তর খুঁজতে হবে।

রাজ্যের ভোটের জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটকে ব্যবহার করার নীতি এমনই স্পষ্ট এবং ব্যবহৃত যে, এ সংক্রান্ত আলোচনায় সেই বাস্তবটিকে অস্বীকার করার কোনও অর্থ হয় না। তা হলে প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় বাজেটে এ রাজ্যকে বঞ্চিত করার ঘটনাটিকে কী ভাবে পাঠ করা বিধেয়। সম্ভাবনা দু’টি। এক, বিজেপি মনে করছে যে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন জেতার জন্য আদৌ আর্থিক প্রলোভনের প্রয়োজন নেই— বরং, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গকে যেমন ধারাবাহিক ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেই প্রবণতা অব্যাহত রাখলেই লাভ। তাতে এই বার্তাটিও প্রবলতর হবে যে, যত ক্ষণ কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই সরকার প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, তত ক্ষণ অবধি রাজ্যকে এমন ভাবে ধুঁকতেই হবে। দ্বন্দ্বতত্ত্বের পরিভাষা ব্যবহার করলে, এটি ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ স্ট্র্যাটেজি। পাশাপাশি এ কথাও হয়তো বিবেচনায় রয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখল করার জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিই যথেষ্ট। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হল, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গে জয়লাভ বিষয়ে তেমন আশাবাদী নন— ফলে, এ রাজ্যের খাতে ‘বাজে খরচ’ করতে তাঁদের আগ্রহ নেই। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হাওয়ায় এই কথাটি বেশ ভালমতো ঘুরছে। সংবাদে প্রকাশ, বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বও নাকি এই বাজেট-বঞ্চনায় হতাশ। তবে, পশ্চিমবঙ্গ সম্বন্ধে বিজেপির দলীয় অবস্থান যা-ই হোক না কেন, রাজনীতির এই ঘোলা জলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজ্যের সাধারণ মানুষের স্বার্থ। খনিজ-সমৃদ্ধ রাজ্যের জন্য বিশেষ নীতি থেকে পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ— সবের থেকেই যদি ক্ষুদ্র রাজনীতির অঙ্কে পশ্চিমবঙ্গকে বাদ পড়তে হয়, তবে তা অতি দুর্ভাগ্যজনক। কেন্দ্রীয় বাজেটটি যে শাসকদের দলীয় বিবেচনার বিষয় নয়, এ কথা স্পষ্ট ভাবে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। রাজ্যের শাসকদের সঙ্গে কেন্দ্রের রাজনৈতিক সম্পর্ক-নির্বিশেষে রাজ্যবাসীর প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন