West Bengal Assembly Election 2026

ভোটভৈরবের ধ্বনি

কলকাতার ক্ষেত্রে এই বিধিভঙ্গের প্রভাবটি বিশেষ রকম ক্ষতিকারক। কারণ, একদা রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টেই স্পষ্ট হয়েছিল, বিশ্বের সর্বাধিক কোলাহলপূর্ণ শহরের তালিকায় কলকাতার স্থান ১১ নম্বরে। একই বিষয়ে ভারতের মধ্যে কলকাতার স্থানটি দ্বিতীয়।

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১৩

নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠিটি আগামী দিনে যাঁদের হাতে যাওয়ার কথা, তাঁরা নিজেরাই যদি বেলাগাম হন, আইনকানুনকে কাঁচকলা দেখান, তবে সাধারণ মানুষের হাতে দিনের শেষে ‘শূন্য’ই পড়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-রাজনীতির ‘শব্দদূষণ’ বিষয়ক পৃষ্ঠাটিতে এখন সেই শূন্যের রাজপাট। ভুক্তভোগীমাত্রেই জানেন যে, এই দেশে, এবং এই রাজ্যে নির্বাচনের আগমন ঘটে স-শব্দে ঢাক-ঢোল সহযোগে প্রচার, স্লোগান ও ‘থিম সং’-এর উচ্চৈঃস্বর, এবং মাইকের দাপট অতিষ্ঠ করে তোলে, প্রচারের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। বাদ পড়ে না ‘সাইলেন্ট জ়োন’-এর অন্তর্ভুক্ত হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চত্বরও। কিন্তু বাজির শব্দসীমা নিয়ে যতখানি চর্চা হয়, নির্বাচনী শব্দদূষণের ভাগ্যে তার ছিটেফোঁটাও জোটে না। সেই নাগরিক নীরবতার অবকাশে গণতন্ত্রের নামে শব্দ-উৎপাত প্রবীণ, অসুস্থ এবং শিশুদের বিশেষ যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিকারের দায়িত্বটি যাঁদের হাতে থাকার কথা, তাঁরা স্বয়ং বিধিভঙ্গের এই উৎসবে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করে। লাগাম তবে টানবে কে?

কলকাতার ক্ষেত্রে এই বিধিভঙ্গের প্রভাবটি বিশেষ রকম ক্ষতিকারক। কারণ, একদা রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টেই স্পষ্ট হয়েছিল, বিশ্বের সর্বাধিক কোলাহলপূর্ণ শহরের তালিকায় কলকাতার স্থান ১১ নম্বরে। একই বিষয়ে ভারতের মধ্যে কলকাতার স্থানটি দ্বিতীয়। সাধারণ সময়েই এই অসামান্য খেতাবটি যে শহর অর্জন করতে পেরেছে, তার ক্ষেত্রে উৎসব, নির্বাচন নাগরিক অস্বাচ্ছন্দ্যকে বহু গুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম। বাস্তবেও ঠিক তেমনটিই দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলে, গত লোকসভা ভোটে সারা দেশ থেকে নির্বাচনী বিধিভঙ্গের ৪ লক্ষ ২৪ হাজার ৩১৭টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। এর এক বৃহৎ অংশ জুড়েই ছিল বিনা অনুমতিতে লাউডস্পিকারের ব্যবহার এবং প্রচারের সময়সীমা লঙ্ঘন। কমিশনের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত লোকসভা নির্বাচনের সময় মাত্র ১০০ মিনিটের মধ্যে তারা ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার ১৬টি অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছিল। তাতে অবশ্য শব্দবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কর্মকুশলতার প্রমাণ মিলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব সুফলদায়ী হয়েছে কি না, প্রশ্ন থেকে যায়। অন্তত এ বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্ব দেখে ইতিবাচক কিছুর প্রমাণ মিলছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্ষেত্রবিশেষে ৬০ ডেসিবেল শব্দও মানুষকে সাময়িক ভাবে আর ১০০ ডেসিবেল শব্দ মানুষকে পুরোপুরি বধির করে দিতে পারে। তাদের নির্দেশিকায় আবাসিক এলাকার জন্য দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতের জন্য ৪৫ ডেসিবেল শব্দসীমা নির্ধারিত। কলকাতা নিশ্চিত ভাবেই সেই সীমাকে বহু পিছনে ফেলেছে। এমনকি জাতীয় গ্রিন ট্রাইবুনাল-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতার কিছু অঞ্চলে এমনিতেই দিনের তুলনায় রাতে শব্দদূষণ বেশি। নির্বাচন এলে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। প্রচারের সময়সীমা নির্দিষ্ট থাকলেও হামেশাই তা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় জীবনের অধিকার প্রসঙ্গে কোলাহল এবং দূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাঁচার অধিকারটি স্বীকৃত। গণতন্ত্রের ঘোষিত পূজারিরা তাঁদের কাজকর্মে ওই সব অধিকার মনে রাখতে রাজি নন, স্পষ্টতই।

আরও পড়ুন