West Bengal Assembly Election 2026

ভোট-বন্দি

কমিশনের কাছে, বিজেপি ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলের মূল দাবি: ভোটার তালিকা থেকে এক বড় অংশ মানুষকে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ (এলডি) দেখিয়ে আলাদা রেখে ভোট সংঘটিত হতে পারে না। বরং সেটাই তখন হবে ‘যৌক্তিক ভাবে অসঙ্গত’।

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৬:৩০

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ কলকাতা সফর শেষ করে ফিরলে পশ্চিমবঙ্গের ভোট নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার কথা। এ দিকে, এই সফরকালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং ধর্নায় আসীন। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ‘বিচারাধীন’দের চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠানোর দাবিতে রাস্তা জুড়ে সরব। বিরোধী দল সিপিআইএম সিইও দফতরের সামনে রাতভর অবস্থানে বসে। বিরোধী কংগ্রেস ও আইএসএফ-ও যথাসাধ্য উচ্চরবে প্রতিবাদে শামিল। সাধারণ মানুষ যত্রতত্র বিক্ষোভ প্রদর্শনে উত্তাল। একষট্টি লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর ষাট লক্ষের বেশি নাম ‘বিচারাধীন’ ঘোষণার প্রতিবাদে সব রাজনৈতিক পক্ষের— অবশ্যই বিজেপি ছাড়া— নিশানায় এখন নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যে রাতারাতি, কোনও আগাম ইঙ্গিত ছাড়াই, রাজ্যপাল বদল হয়ে গেল ‘মধ্যরাতে’, এসে গেলেন গোয়েন্দাপ্রবর পরিচয়খ্যাত নতুন রাজ্যপাল। তন্মধ্যে রাষ্ট্রপতির রাজ্য সফর নিয়ে চলমান অবাঞ্ছিত চাপান-উতোর। সব মিলিয়ে ভোটের আগের পশ্চিমবঙ্গে যে পরিস্থিতি— তাকে কেবল ঘটনাবহুল বললে নিতান্ত সামান্য বলা হয়, অনায়াসে একে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে ‘ঐতিহাসিক’। একটি রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে এই পরিমাণ অহেতুক উত্তেজনা অনাকাঙ্ক্ষিত। বিপজ্জনক। গভীর দুর্ভাগ্য।

কমিশনের কাছে, বিজেপি ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলের মূল দাবি: ভোটার তালিকা থেকে এক বড় অংশ মানুষকে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ (এলডি) দেখিয়ে আলাদা রেখে ভোট সংঘটিত হতে পারে না। বরং সেটাই তখন হবে ‘যৌক্তিক ভাবে অসঙ্গত’। কেননা, কয়েকটি খুব বড় প্রশ্নের উত্তর একমাত্র কমিশনের কাছেই আছে, অথচ তারা এখনও পর্যন্ত সেই উত্তরগুলি দিতে অনিচ্ছুক বা অপ্রস্তুত। এক, কেন পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য কোনও রাজ্যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র বাক্সটি খোলা হল না? দুই, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই কমিশনই জানিয়েছিল, ২০০২-এর তালিকায় নাম থাকলে কোনও কাগজ দেখাতে হবে না। তা হলে কেন তেমন ভোটাররাও বহু সংখ্যায় বিবেচনাবন্দি হলেন? এমনকি নির্বাচনে দাঁড়ানো নেতারাও, ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে আসা মন্ত্রীরাও? তিন, বাম নেতারা সঙ্গত ভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন, কোনও বিবেচনাধীন ভোটারের নাম কেন বিবেচনাধীন, তা স্পষ্ট করে জানানো না হলে পরবর্তী কালে কী ভাবে ফর্ম-৬ ব্যবহার করে নাম তোলার চেষ্টা হতে পারে, কেননা সেখানে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয় নাম বাতিলের কারণ। চার, স্পষ্টতই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এত সংখ্যক বিবেচনাধীনের ‘বিবেচনা’ শেষ যদি না হয়, তবে কমিশন কি এতসংখ্যক ভোটার বাতিলের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ছাড়াই ভোট সংঘটিত করবে? কেন? কেন জনবহুল পশ্চিমবঙ্গে এই কাজের জন্য এত কম সময় নির্ধারিত হল, কিসের তাড়ায়? পাঁচ, মতুয়া জনগোষ্ঠীকে বলা হচ্ছে, তাঁরা যথাসময়ে নাগরিকত্বের শংসাপত্র পাবেন, কিন্তু সে ক্ষেত্রে কেন এ বারের ভোট থেকে তাঁদের বাইরে রাখা হবে? শংসাপত্র তৈরির কাজ যদি সহজসাধ্যই হয়, কেন এসআইআর নামক রাজসূয় যজ্ঞের আগে তা করা হল না? তাঁদের ভোটাধিকার এ বারের জন্য ‘বন্দি’ করতে?

রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দাবি উঠুক। কিন্তু তার বাইরে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক পরিসর থেকেও স্পষ্ট দাবি তোলা দরকার, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রতি বার্তা দেওয়া দরকার। গণতন্ত্রে ভোটার-কে বাদ দিয়ে ভোট হতে পারে না। এবং ভোটার বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে অপারগ হয়েছে বলে রাজ্যে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে ঘোর অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক। রাজ্য ও রাজ্যবাসীকে এই সঙ্কটে ফেলার পূর্ণ দায় নির্বাচন কমিশনের, এবং তৎসূত্রে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। অন্য কোনও সিদ্ধান্তের আগে— পশ্চিমবঙ্গবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার ফেরত চাই।

আরও পড়ুন