RG Kar Hospital Incident

অপরাধী

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের অভ্যাস অনুযায়ী, কয়েক জন নিম্ন স্তরের কর্মীর উপর দোষ চাপিয়ে, তাঁদের শাস্তি দিয়ে কিন্তু এর প্রতিকার হবে না, পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা রোধ করা যাবে না।

শেষ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৮
গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।

গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।

সব মৃত্যু সমান নয়। কিছু কিছু মৃত্যু— হত্যার পর্যায়ে পড়ে। গত শুক্রবার আর জি কর হাসপাতালে লিফ্ট-দুর্ঘটনায় যে ব্যক্তি প্রাণ হারালেন, এবং গত রবিবার ওই হাসপাতালেই যে ব্যক্তি লিফ্ট না-থাকায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় অন্য তলার শৌচালয়ে হেঁটে উঠতে গিয়ে প্রাণ হারালেন, দুই জনই কার্যত নিহত হলেন। হত্যাকারী: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের একেবারে গোড়ার পরিকাঠামোগত অক্ষমতার জন্য এই দুই মর্মান্তিক মৃত্যু। দ্বিতীয়ত, এই হাসপাতাল যে-হেতু সরকারি, দায়িত্ব প্রথমত ও শেষত— খোদ রাজ্য সরকারের। আশা করা যায়, এই দায় তাঁরা বিনা প্রশ্নে স্বীকার করবেন— অন্য কোথায়, অন্য কোন সময়, অন্য কার আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে, একটিও প্রতিপ্রশ্ন তুলে রাজ্যবাসীকে অপমান করবেন না। তৃতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানেরও রকমভেদ আছে। হাসপাতাল যে কোনও সরকারি অফিস নয়, তা সর্বাধিক মনোযোগ দাবি করে। এবং এও স্পষ্ট যে, লিফ্ট বস্তুটি হাসপাতালে অতি আবশ্যিক, জরুরি এবং প্রাথমিক পরিষেবা। তাই সরকারি হাসপাতালের সর্বাধিক গুরুতর আপৎকালীন পরিষেবা যে বিভাগের দেওয়ার কথা, সেই ‘ট্রমা কেয়ার’ বিভাগে এমন একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও মৃত্যু— প্রকৃতই রাজ্য সরকারের মারাত্মক দায়হীনতার অভ্রান্ত পরিচায়ক। এ রাজ্যে সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোণে কোণে সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের যে বিপজ্জনক অবহেলা, যে চূ়ড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, তার স্পষ্ট ছাপ এই দু’টি উপর্যুপরি ঘটনার মধ্যে।

রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী— যিনি কি না মুখ্যমন্ত্রীও— তিনি কি বুঝতে পারছেন, তাঁর প্রশাসনের অগ্রপশ্চাৎবোধ কোন অতলে গিয়ে ঠেকেছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের অভ্যাস অনুযায়ী, কয়েক জন নিম্ন স্তরের কর্মীর উপর দোষ চাপিয়ে, তাঁদের শাস্তি দিয়ে কিন্তু এর প্রতিকার হবে না, পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা রোধ করা যাবে না। কেননা প্রকৃত দায় কেবল ওই কর্মীদের নয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। পশ্চিমবঙ্গবাসী মাত্রেই অবগত যে, আর জি করের এই সব সাম্প্রতিক ঘটনা কেবল একটি বিশেষ লিফ্টের ত্রুটি বা কোনও বিশেষ কর্মীর আকস্মিক দায়স্খলনের বিষয় নয়। এই রাজ্যে কাজ না-করে পার পেয়ে যাওয়াটাই হল আসল রীতি এবং নীতি— সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে তা দ্বিগুণ সত্য। ফলত প্রকৃত প্রশ্নটিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যাক। কেন, কী ভাবে এই সব দুর্ঘটনা ঘটল, তার বদলে বরং প্রশ্ন করা যাক— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালে অন্য লিফ্টগুলি কাজ করে কোন জাদুবলে?

‘আবার আর জি কর’— এই সমাপতনও বিস্ময়কর নয়। বার বার সরকারি হাসপাতালই বর্তমান সরকারের ‘অ্যাকিলিস হিল’ বা দুর্বলতম শরীরস্থান হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে, কেননা, সত্য উন্মোচিত হওয়ারও একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া থাকে, রাজনীতির শত রাখঢাকেও তা আবরিত করা যায় না। কেবল সুপারস্পেশ্যালিটি-র চাকচিক্য দিয়েই স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায় ঝেড়ে ফেলা যায় না। ব্যবস্থার অসুখ যে কত গভীর, তা বোঝা যায় যখন শত প্রতিশ্রুতির পরও বর্তমান সরকারের প্রধান ক্ষতস্থান আর জি কর হাসপাতালের পরিকাঠামো এতখানি নিম্নমানের থেকে যায়। লিফ্ট সুস্থ সচল রাখা, যন্ত্রপাতির দেখাশোনা করা— এগুলি নিশ্চয়ই দুঃসাধ্য কাজ নয়। অধিক অর্থ কিংবা উন্নত প্রযুক্তির কথা নিশ্চয়ই ভাবা যায়। কিন্তু সম্ভবত, বর্তমান সরকারের মতে, সরকারি হাসপাতালে মনঃসংযোগ, অর্থলগ্নি কিংবা প্রযুক্তি তত্ত্বাবধান, এগুলির তুলনায় অনেক জরুরি— চোখধাঁধানো মন্দির নির্মাণ ও উদ্বোধন। নিদেনপক্ষে বাংলার সংস্কৃতির নাম করে, দুর্গাঙ্গন পরিকল্পনা। আপাতত নির্বাচনী যুদ্ধ সমাগত। পশ্চিমবঙ্গের এ বারের ভোটলড়াই নানা কারণেই বিশেষ গুরুতর। কিন্তু তার মধ্যে একটি প্রশ্নের সাফ উত্তর দেওয়ার দায় শাসক দলের উপর বর্তায়। পনেরো বছর অতিবাহিত, সরকারি হাসপাতাল নামক প্রাথমিক সামাজিক পরিষেবার বিপুল গুরুত্ব কি এখনও তাঁদের রাজনীতিতে স্বীকৃত?

আরও পড়ুন