population

জনসংখ্যার জুজু

উদ্বেগের কথা ইহাই যে, সেই কাজে বিরাট ফাঁকি পড়িতেছে। জনসংখ্যা যখন স্থিতিশীল, তখন শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান শ্রমশক্তি দেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে লইয়া যাইতে পারে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২১ ০৪:৫৮
প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

দেশে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের চিন্তায় যাঁহাদের রাত্রিতে ঘুম হয় না, এই প্রাথমিক সত্যটি তাঁহাদের জানিয়া লওয়া আবশ্যক যে, সাম্প্রতিক জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা বলিতেছে— ভারতের জনসংখ্যায় বিস্ফোরণের পরিবর্তে সঙ্কোচনের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। কোনও দেশের জনসংখ্যা অপরিবর্তিত রাখিতে গেলে প্রয়োজন গড়পড়তা প্রতি দম্পতির ২.১ সন্তান। ২০১৯-২০ সালে ভারতে সেখানে গড় সন্তানসংখ্যা ২.০। এই সংখ্যাটি আকাশ হইতে পড়ে নাই। স্বাধীনতার কালে গড় সন্তানের সংখ্যা ছিল ৫.৯, অতঃপর তাহা ক্রমাগত নিম্নমুখী হইয়াছে। রাজ্যে রাজ্যে তফাত আছে, কিন্তু সামগ্রিক বিচারে, এবং দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের পরিসরেই, জনসংখ্যা স্থিতিশীল হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, জনবিন্যাসের যে পর্বান্তর ঘটিতেছে, তাহাতে এখনও দুই-তিন দশক তরুণ প্রজন্মের মহিলা-পুরুষের মোট সংখ্যা তেমন হ্রাস হইবে না, অতএব দেশে কর্মক্ষম ব্যক্তির সংখ্যা থাকিবে যথেষ্ট। ইহা তারুণ্যের ঐশ্বর্য। এই ঐশ্বর্যের সদ্ব্যবহারে মনোনিবেশ করা এবং তৎপর হওয়াই এখন বড় কাজ।

উদ্বেগের কথা ইহাই যে, সেই কাজে বিরাট ফাঁকি পড়িতেছে। জনসংখ্যা যখন স্থিতিশীল, তখন শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান শ্রমশক্তি দেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে লইয়া যাইতে পারে। অথচ দেশ জুড়িয়া জনস্বাস্থ্য এবং শিক্ষায় বিপুল ঘাটতি ক্রমশ বাড়িয়া চলিয়াছে, তাহার ফলে যে তারুণ্য উন্নয়নের চালিকা শক্তি হইতে পারিত তাহা কর্মহীনতা এবং অযোগ্যতার বোঝা বহিয়া দাঁড়াইয়াছে, এবং পরিণামে সামাজিক সঙ্কট ও অশান্তি বাড়াইয়া তুলিতেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকে অবহেলা করিয়া যাঁহারা জনসংখ্যা বাড়িতেছে বলিয়া পাড়া মাথায় করিতেছেন, তাঁহাদের নির্বুদ্ধিতা দেখিয়া সত্যই অবাক মানিতে হয়। নির্বুদ্ধিতার পাশাপাশি অবশ্য দুর্বুদ্ধির প্রকোপও কম নহে। এবং স্বীকার করিতেই হইবে যে, জনবিস্ফোরণের জুজু দেখাইয়া যাঁহারা সমাজ ও রাজনীতির বীজখেতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বপন করিয়া আসিতেছেন, তাঁহাদের দুরভিসন্ধি দূর করা শিবের অসাধ্য। কিন্তু বিষবৃক্ষের ফল খাইয়া যাঁহারা নাচিতেছেন তাঁহারা অন্তত এই বার আপন প্রগাঢ় অজ্ঞতার কূপ হইতে মাথা তুলিতে চাহিবেন কি? কিংবা, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির কথা ছাড়িয়া দিলেও, দুর্মর অজ্ঞতার মন্ত্রণায় যাঁহারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘কঠোর অনুশাসন’ জারির পক্ষে সওয়াল চালাইতেছেন তাঁহারা কি বুঝিয়া লইবেন যে, তাঁহারা অতীতের ঠুলি চোখে আঁটিয়া বর্তমানকে দেখিতেছেন?

Advertisement

এই অজ্ঞতা এবং ভেদবুদ্ধির দ্বৈত প্ররোচনাতেই ভারতের বেশ কিছু রাজ্য সাম্প্রতিক কালে দুই সন্তান নীতি গ্রহণ করিয়াছে। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, অসম প্রভৃতি বেশ কিছু রাজ্যে দুইয়ের অধিক সন্তানের জন্ম দিয়া থাকিলে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রার্থী হইবার, সরকারি চাকরি পাইবার এবং বিবিধ সরকারি সহায়তা গ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া হইবে। এমন শাস্তির ভয় দেখাইয়া জন্মনিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কেবল অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক নহে, সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। পরিসংখ্যানই বলিয়া দেয়, যে সকল রাজ্যে এমন নিষেধের ভ্রুকুটি নাই, সেখানেও জনসংখ্যা সমান হারে, এমনকি আরও দ্রুত কমিয়াছে। এমনকি মেয়েদের কম বয়সে বিবাহের মাত্রায় দেশের মধ্যে ‘প্রথম সারিতে’ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের গড় জন্মহার ১.৬, তাহার একটি বড় কারণ প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর হার কমাইতে পারিবার সাফল্য। ভারতের দরিদ্র, স্বল্পশিক্ষিত নাগরিক বুঝাইয়া দিয়াছে, সে উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাইতে সক্ষম। রাষ্ট্র শিশুস্বাস্থ্য, নারীস্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও বুনিয়াদি শিক্ষার বিস্তারের কর্তব্যটি পালন করিলে সেই সক্ষমতার ব্যাপ্তি ও মাত্রা প্রসারিত হইবে। জবরদস্তির কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই।

Advertisement
আরও পড়ুন