Pakistan-Afghanistan Conflict

আরও এক সংঘাত

সঙ্কটের মূল নিহিত রয়েছে ১৮৯৩ সালে নির্ধারিত ২,৬৪০ কিলোমিটার সীমানা ‘ডুরান্ড লাইন’-এর অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে, যেটিকে পরবর্তী আফগান সরকারগুলি একটি অবৈধ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার মনে করে কোনও কালেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩১

এশিয়া এখন যুদ্ধভূমি। বধ্যভূমিও বলা যায়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন বিস্তৃত হওয়ার মাঝে এ বার দক্ষিণ এশিয়াতেও আর একটি সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে, যা আগামী দিন গোটা অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন বরাবর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলা উত্তেজনা বর্তমানে প্রকাশ্য সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি নাঙ্গারহার, পাক্তিকা এবং খোস্ত-এ পাকিস্তান বিমান হামলা শুরু করে এই দাবিতে যে ওই সব স্থানে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং আইসিস-কে’র মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর ঘাঁটি ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য। এর কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের একাধিক প্রদেশে স্থল আক্রমণের মাধ্যমে প্রত্যুত্তর দেয় কাবুল। এর জেরে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন গজ়ব লিল হক’ শুরু করেছে পাকিস্তান, যে-হেতু পাকিস্তানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের মতে, কাবুল তাঁদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। আপাতত দুই তরফে দেওয়া হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের জেরে আফগানিস্তানে এ-যাবৎ প্রায় ৬৬,০০০ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। পরিস্থিতি যা তাতে এই সংঘর্ষ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।

লক্ষণীয়, এই সঙ্কটের মূল নিহিত রয়েছে ১৮৯৩ সালে নির্ধারিত ২,৬৪০ কিলোমিটার সীমানা ‘ডুরান্ড লাইন’-এর অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে, যেটিকে পরবর্তী আফগান সরকারগুলি একটি অবৈধ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার মনে করে কোনও কালেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। রেখাটি এই অঞ্চলের পশতুন জনজাতি গোষ্ঠীর ভূমিকে দ্বিখণ্ডিত করায় আজও উষ্মা রয়েছে এখানকার জনজাতিভুক্তদের মধ্যে। এ দিকে, ২০২১-এ তালিবান আফগানিস্তানে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর, পাকিস্তান প্রাথমিক ভাবে কৌশলগত লাভের প্রত্যাশা করেছিল। তারা আশা করেছিল যে, কাবুল টিটিপি-কে দমন করবে। কিন্তু তা ঘটেনি। বরং দেখা গেল, সময়ের সঙ্গে তীব্রতর হয়ে উঠল টিটিপি-র আক্রমণ, যার ফলে শুধুমাত্র ২০২৫-এই ২,৪০০ জনেরও বেশি পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন। এমতাবস্থায়, ইসলামাবাদ কেবল হতাশ নয়, তারা বিলক্ষণ বুঝেছে, তালিবানের উপর এত কাল তাদের যে প্রভাব ছিল, তা ক্রমহ্রাসমান। এর জেরে আঞ্চলিক পক্ষগুলির মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা ভেস্তে গিয়েছে। আফগান তালিবানরা টিটিপি-র উপর লাগাম টানতে অনিচ্ছুক— ইসলামাবাদ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ায় সংলাপ সংঘাতের রূপ নিয়েছে।

সামরিক দিক থেকে, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান কোনও ভাবেই সমতুল্য নয়। বস্তুত, তালিবানদের কোনও প্রকৃত বিমান বাহিনীও নেই। কূটনৈতিক দিক দিয়েও আফগানিস্তান বেশ একা। কিন্তু এই অসম সমীকরণই যে লড়াইকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রচলিত সামরিক সংঘর্ষের বাইরের কার্যকলাপে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, অ্যাবটাবাদ, সোয়াবি এবং নওশেরা-সহ বেশ কয়েকটি শহরের দিকে ড্রোন হামলা করেছে আফগানিস্তান। হতাহতের ঘটনা ঘটার আগে ড্রোনগুলিকে রুখে দেওয়া হয়েছে বটে, তবে এই উত্তরণ দক্ষিণ এশিয়াকে এক উদ্বেগজনক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে— পশ্চিমের মতো এই দুই রাষ্ট্রও কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পথে এগোচ্ছে?

আরও পড়ুন