কাটা ঘায়ে কিসের ছিটে, বলা মুশকিল। তবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ— যে সব জায়গায় ভোটার তালিকা থেকে নাম-বাতিলের সংখ্যা বেশি, সেখানে ভোটের সময় অতি কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ জারি রাখতে হবে— শুনে এই পুরনো প্রবাদটি এক নতুন অর্থে উদ্ভাসিত হল। যেখানে এসআইআর-এ নাম-বাতিল বেশি, সেখানে রাজনৈতিক গুন্ডাবাহিনী মানুষকে তাতিয়ে উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করবে, এই আশঙ্কায় নির্বাচন কমিশন উদ্বিগ্ন। উল্টো দিকে, এমনও কি বলা যায় না যে কমিশন-চালিত স্থানীয় প্রশাসনের শক্তফাঁসে নাম-বাতিল মানুষকে টুঁ শব্দটিও করতে না দিয়ে, তাদের রাষ্ট্রীয় যথেচ্ছাচার মেনে নিতে বাধ্য করাই হল কমিশনের উদ্দেশ্য? বলা বাহুল্য, ভোটের সময় যদি কোনও অশান্তি বা হিংসা হয়, তা আটকানো কমিশন ও কমিশন-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের কাজ। কিন্তু তার বাইরে কঠোর হাতে জনসাধারণকে দমন করা নিশ্চয়ই কমিশনের লক্ষ্য নয়? এই নির্দেশের মধ্যে মানুষের প্রতি এমন একটি অশ্রদ্ধা আছে, এক প্রকার অমানবিক কর্তৃত্ববাদী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা অত্যন্ত আপত্তিকর।
পরিবর্তে নির্বাচন কমিশন কি এমন নির্দেশ দিতে পারত না যে, যেখানে বেশি নাম-বাতিল, সেখানে যেন স্থানীয় প্রশাসন দায়িত্ব নিয়ে শান্তি রক্ষা করে, প্রচার করে যে আতঙ্কের কোনও কারণ নেই, যা কিছু সমস্যা, ভোট-পরবর্তী সরকার তার সমাধানে সচেষ্ট হবে? এমন আশ্বাস বিতরণ কমিশন আগে কখনও করেনি, কেউ বলতে পারেন। কিন্তু উত্তরে বলা যায় যে, ভারতের ইতিহাসে আগে কখনও এমন বিপুল সংখ্যায় মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদও যায়নি, যাঁদের মধ্যে অনেকেই নিঃসন্দেহে বৈধ ভোটার। বাস্তবিক কিছু নাগরিক সংগঠনের তরফে আশ্বাস ধ্বনিত হয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরাও ইতিউতি আশ্বাসবাক্য উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে কোনও রা কাড়েনি। কেবল তা-ই নয়, মানুষই যেন কমিশনের প্রধান শত্রু, আগাগোড়া এমন ভাবে আদেশ-নির্দেশ দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এ বারের ভোটপর্বে নির্বাচন কমিশনের এই মানুষবিরোধী আস্ফালন এক অ-বিস্মরণীয় ও অ-ক্ষমণীয় ঘটনা হয়ে রইল।
ভোটের দিন সমাগত, এই অবকাশে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা ভাল। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর নামে বহু মানুষের উপর নিদারুণ হেনস্থা চললেও লক্ষণীয় যে, মোথাবাড়ি ছাড়া অন্যত্র তেমন কোনও হিংসা বা বিশৃঙ্খলা ঘটেনি, অন্তত এখনও পর্যন্ত। এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গবাসীর সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ। সাধারণ মানুষ অশেষ দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, তবু নৈরাজ্যের পথে পা বাড়াননি। সর্বোচ্চ আদালত অবশ্য তাতেও মনে করেছে, এই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অতি দুরবস্থা, দেশের অন্যত্র নাকি এমন ভাবাই যায় না। সম্ভবত মণিপুর, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার দিকে তাঁদের দৃষ্টি নিক্ষেপ করার সময় নেই। কিংবা বিজেপি-শাসিত রাজ্য মানেই সুশাসিত, এই অলীকদর্শন ইতিমধ্যেই ভারতের সমগ্র রাষ্ট্রীয় ব্যাখ্যায় খোদিত। সব মিলিয়ে, রাজ্যের স্বার্থ বা মঙ্গলের দিক দিয়ে দেখলে এ বারের বিধানসভা ভোটপর্ব পশ্চিমবঙ্গের উপর প্রায় একটি হানাদারির সমান। ভোটের ফল যা-ই হোক না কেন, এই পর্ব সমাপ্ত হলে রাজ্যবাসীর শান্তি, স্থিতি ও নিরাময়ের দিশা মিলবে, এই আশা রইল।