অন্তত একটি বিষয়ে সুদিনের দেখা পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের দিগন্তে— গ্রামগুলিতে ফের শুরু হচ্ছে একশো দিনের কাজের প্রকল্প। চলতি মাসেই মনরেগা শুরু হওয়ার কথা। যদিও বর্ষা সমাগত, এ সময়ে চাষের কাজে মজুর নিয়োগের প্রয়োজন হয়, ফলে সরকারি প্রকল্পের কাজ শুরু হলে মজুরের ঘাটতিতে চাষির কপালে ভাঁজ পড়তে পারে। তবু চার বছরের কাজের খরা কাটার স্বস্তি, বকেয়া মজুরি পাওয়ার আশা এ রাজ্যের গ্রামগুলিকে আশান্বিত করবে, সন্দেহ নেই। কেন্দ্রীয় সরকার দেড় হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যেই মঞ্জুর করেছে রাজ্যের জন্য, তার প্রায় অর্ধেক কেবল জুন মাসেই খরচ করার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য। সংবাদে প্রকাশ, প্রায় আড়াই কোটি জব কার্ড উপভোক্তার সকলকেই কাজ দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এ ছাড়াও গ্রামীণ রোজগার নিশ্চয়তার নয়া প্রকল্পের (বিকশিত ভারত-গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন— গ্রামীণ, সংক্ষেপে ভিবি-জিরাম-জি) জন্য সাড়ে বারো হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থবর্ষের জন্য পাওয়া যাবে প্রত্যাশা করছে রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গে ডাবল এঞ্জিন সরকার আনার যে সব সুবিধার কথা প্রচার করেছিল বিজেপি, গ্রামের মানুষের জন্য সরকারি প্রকল্পে কর্মসংস্থান বাড়লে নিঃসন্দেহে সেই প্রতিশ্রুতির খানিকটা পূরণ হবে। রাজনীতির বিচারে এ হয়তো অবিমিশ্র সুসংবাদ নয়— কেন্দ্রের শাসক দলকে সমর্থনের মূল্যে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে হল রাজ্যবাসীকে। গত চার বছর তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি দর্শিয়ে মনরেগার টাকা আটকে রেখেছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার, হাই কোর্ট-নির্দিষ্ট তারিখেও শুরু হয়নি প্রকল্প। গণতান্ত্রিক এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় সরকারি প্রকল্পের এই দল-নির্ভরতা দুশ্চিন্তার বিষয়।
উল্লেখ্য, মনরেগা যে গ্রামীণ মজুরি, বিশেষত মহিলাদের মজুরিতে বৃদ্ধি আনতে পেরেছে, নানা সমীক্ষায় তা প্রমাণিত। দীর্ঘ দিনের অচলাবস্থার ফলে গ্রামীণ মজুরির বৃদ্ধি শ্লথ হয়েছে, পরিযায়ী শ্রম বেড়েছে। এমনকি মহিলারাও পরিবারের সঙ্গে অথবা একক ভাবে ঘরের থেকে দূরে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তার ফলে সন্তানদের পড়াশোনায় ছেদ পড়ছে, ভিন রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিক মেয়েরা চিকিৎসা-সহ নানা অত্যাবশ্যক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অতএব পর্যাপ্ত কাজ, নিয়মিত মজুরি নিশ্চিত করে নিরুপায়-পরিযাণ কমানো নবপর্যায়ের মনরেগা তথা ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পের উদ্দেশ্য হওয়া দরকার। পাশাপাশি, গ্রামে স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যটিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। অতীতে বার বার দেখা গিয়েছে, কাজ তৈরি এবং মজুরি বিতরণই প্রধান হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের দ্বারা খনন করা পুকুরগুলিতে জল থাকছে কি না, তা গ্রামের সেচ এলাকা বাড়াচ্ছে কি না, তার হিসাব রাখা হয়নি। পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় ‘চেক ড্যাম’-এর মতো জলসংরক্ষণ পরিকাঠামো তৈরি হওয়ায় ভূগর্ভের জলস্তর বাড়লেও, ‘জল ধরো জল ভরো’ রাজ্যে ভূগর্ভের জলস্তর কতটা বাড়িয়েছে, জানা নেই। সামাজিক বনসৃজন যত কাজ তৈরি করেছে, সবুজ আচ্ছাদন তত বাড়িয়েছে কি না, দ্রুতবর্ধনশীল ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো গাছগুলি জীববৈচিত্রে সহায়তা করেছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়।
এই অপচয়ের পিছনে রয়েছে দুর্নীতি, অবহেলা, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ফারাকও অন্যতম কারণ। দু’দশক এক নাগাড়ে প্রকল্প চলার পরে নতুন পথ নির্মাণ, নতুন পুকুর খননের সুযোগ কতটুকু রয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। অন্য দিকে, দুর্নীতির আশঙ্কায় ব্যক্তিগত পুকুর সংস্কার কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অধিকাংশ পুকুর অপরিচ্ছন্ন, ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে রয়েছে। রাজ্যের সরকারের উপর ভরসা করে কেন্দ্র যদি কাজের শর্তে নমনীয়তা আনে, এবং এলাকার চাহিদা অনুসারে কাজ হয়, তা হলে গ্রামবাসীর শ্রমে তৈরি সম্পদ বাস্তবিক গ্রামবাসীর কাজে লাগতে পারে।