গত বছরের জুন ও অক্টোবরের পর এ বছরের মার্চ। তৃতীয়, এবং জনসমাগমের নিরিখে বৃহত্তম যে ‘নো কিংস’ প্রতিবাদ আন্দোলন হয়ে গেল গত ২৮ মার্চ আমেরিকা জুড়ে, তার অভিঘাত অনুভূত হয়েছে ঘরে বাইরে— আমেরিকার ৫০টি প্রদেশ মিলিয়ে প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ পথে নেমেছিলেন বলে খবর। মিনিয়াপোলিস, ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, শিকাগো-সহ দেশের ছোট-বড় সব শহরের পথে দেখা গেছে জনস্রোত— ‘আমরা রাজা চাই না’ স্লোগান মুখে নিয়ে। ‘রাজা’ বলতে যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝানো হচ্ছে তা বলা বাহুল্য, কিন্তু সেখানেই এই প্রতিবাদের গুরুত্বের শেষ নয়। ‘রাজা’ বা ‘কিং’ শব্দটি এখানে একতান্ত্রিক, আধিপত্যবাদী, একচ্ছত্র ক্ষমতা হাতে পাওয়া বা চাওয়া শাসকের সমার্থক; এই প্রতিবাদ সেই শাসকের বিরুদ্ধে জনতার প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন-বিরোধী নিষ্ঠুরতা আমেরিকাবাসীদের সাম্প্রতিক কালে পীড়িত করেছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন জীবনে মাত্রাছাড়া খরচ, এবং সর্বোপরি বিনা প্ররোচনায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জেরে প্রবল জ্বালানি সঙ্কট। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক— নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব সম্প্রতি চরমে উঠেছিল বলেই জনগণ নেমে এসেছেন পথে: প্রতিবাদে।
লক্ষণীয়, এই সর্ববিস্তারী নাগরিক প্রতিবাদ শাসকের নীতির বিরুদ্ধে। রাজার নীতিই ‘রাজনীতি’, তবে কাল ও সভ্যতার নিয়মে যখন প্রত্যক্ষ রাজ-তন্ত্র মুছে গিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে তার জায়গা নিয়েছে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, তখন সেই ব্যবস্থায় শাসকের রাজার মতো আচরণ সাজে না। গণতন্ত্রের এইটিই হল মূল কথা: নাগরিকেরা মিলে রাজাকে শাসক করে তুলেছেন, শাসক এখন এমন নীতি নিয়ে চলবেন যা নাগরিকদের জন্য কল্যাণকর। প্রতিবাদীদের অভিযোগ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এই স্বতঃসিদ্ধ শুধু অস্বীকার নয়, লঙ্ঘন করেছেন— শাসনক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে ব্যবহার করছেন কেবলই নিজের পছন্দ বা অপছন্দের বিচারে; তাঁর সমস্ত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠছে জনবিরোধী, অনৈতিক, ঘরে এবং বাইরেও ক্ষতিকর। ‘নো কিংস’ আন্দোলনের অনুঘটক নিশ্চিত ভাবেই একাধিক, আমেরিকা-শাসকের সাম্প্রতিক একের পর এক কুনীতি-অপনীতির বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জিত অস্বস্তি, অসন্তোষ ও ক্ষোভই ব্যাপক জন-প্রতিবাদের রূপ ধরে পথে নেমেছে।
রাজপথে বিপুল জনসমাগম ও গণবিক্ষোভ মানেই যে তা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফল বা পরিবর্তন বয়ে আনবে, তা না-ও হতে পারে। সাম্প্রতিক কালে বিশ্বের নানা দেশে— ঘরের কাছে বাংলাদেশ, নেপাল থেকে ইরান; ইউরোপ-আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার নানা রাষ্ট্রেও শাসকের বিরুদ্ধে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন করেছেন— কিছু ক্ষেত্রে শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলন দমিত বা স্তিমিত হয়েছে। ফলাফল যা-ই হোক, এই প্রতিবাদ আন্দোলনগুলি অন্তত এই সত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, সহ্যের শেষ সীমা ছাড়ালে সাধারণ নাগরিকেরাও কী বিরাট কাণ্ড করে ফেলতে পারেন— একটি দিনে দেশ জুড়ে বৃহত্তম জমায়েতের ডাক দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে পারেন, এবং সবচেয়ে বড় কথা, শাসক ও ক্ষমতার চোখে চোখ রাখতে দ্বিধা করেন না। অতীতে ‘নৈরাজ্য’ বা ‘অরাজকতা’ শব্দগুলি ব্যবহৃত হত রাজাহীন পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত ও দুর্বৃত্ত প্রজাদের অবস্থা বোঝাতে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এখন গণতান্ত্রিক, কিন্তু দুর্নীতি, অপনীতি ও নীতিহীনতার নজির গড়ে দেশে দেশে ‘রাজা’ তথা শাসকেরাই হয়ে উঠেছেন অরাজক। ঘোষিত ভাবে একতন্ত্রী রাষ্ট্র হলে অন্য কথা, গণতন্ত্রে এ জিনিস চলতে পারে না। ‘রাজা চাই না’ দাবিতে আমেরিকান নাগরিকেরা তাঁদের প্রেসিডেন্টকে যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, কাছে-দূরে সব রাজারাই তা কান পেতে শুনেছেন নিশ্চয়।