Children

লটারি

ছোটদের যে শুধু যুদ্ধ-বিরোধিতার পাঠই দেওয়া যায়, তা নয়। সমাজের সমুদ্রমন্থনে প্রতিনিয়ত যে বিদ্বেষবিষভাণ্ড উঠে আসছে, এবং শিশুরা কিছু না-জেনেই সেই বিষ পান করছে আকণ্ঠ, সে বিষয়েও তাদের সচেতন করে দেওয়া চলে।

শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩৬

বাড়িতে ছোটদের বুঝিয়ে বলুন, যুদ্ধ খুব খারাপ একটা জিনিস। কলকাতার কিছু স্কুল নাকি অভিভাবকদের এমন পরামর্শ দিচ্ছে। সত্যিই যদি অভিভাবকরা গল্পের ছলে ছোটদের বলতে থাকেন যুদ্ধের অমানবিকতার কথা, অপরিমেয় ক্ষতির কথা, অথবা যদি স্কুলগুলোও সে আলোচনার অংশী হয়ে ওঠে, তার চেয়ে ভাল কথা আর কী হতে পারে? বহু যুগ ধরে ছোটদের হাতে খেলনা বন্দুক তুলে দিয়ে যে ক্ষতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের অভিভাবকরা করেছেন, দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমের প্রতিটি প্রান্ত থেকে যে ভাবে হিংস্রতাকে পৌরুষের সমার্থক করে তোলা হয়েছে, সে বিষ সম্পূর্ণ মুছে ফেলা দীর্ঘ সাধনার বিষয়। কিন্তু, কোথাও তো একটা শুরু করতে হয়। এই যুদ্ধের পটভূমিকাকেই সেই সূচনামুহূর্ত হিসাবে বেছে নেওয়া সম্ভব। হিসাবের ভুলে আছড়ে পড়া ক্ষেপণাস্ত্র কী ভাবে ধ্বংস করে দিল ছোটদের স্কুল, কী নির্মম ভাবে মারা গেল তাদেরই সমবয়সি পড়ুয়ারা, এই আখ্যান— ভয়াবহ, বীভৎস আখ্যান— হয়তো ছোট পড়ুয়াদের মনে চিরকালের মতো যুদ্ধের প্রতি অনীহা তৈরি করে দিতে পারে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীরা কী অসহায় ভাবে মারা গেলেন বিরুদ্ধ রাষ্ট্রের বোমারু বিমানহানায়, সে কথা হয়তো ছোটদের করে তুলবে ভবিষ্যতের যুদ্ধবিরোধী নাগরিক। তারা বুঝতে শিখবে যে, যুদ্ধে রাষ্ট্রনায়কদের নয়, ক্ষতি হয় অগণন সাধারণ মানুষের— ছোটদের, বয়স্কদের, সাতে-পাঁচে না-থাকা জনতার। সিনেমার পর্দায় দেখা যুদ্ধের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক বহু যোজন।

তবে, ছোটদের যে শুধু যুদ্ধ-বিরোধিতার পাঠই দেওয়া যায়, তা নয়। সমাজের সমুদ্রমন্থনে প্রতিনিয়ত যে বিদ্বেষবিষভাণ্ড উঠে আসছে, এবং শিশুরা কিছু না-জেনেই সেই বিষ পান করছে আকণ্ঠ, সে বিষয়েও তাদের সচেতন করে দেওয়া চলে। তাদের বোঝানো যায় যে, এই বিদ্বেষ তৈরি করে কিছু মানুষ, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে। শুরু করা যায় একেবারে মৌলিক প্রশ্ন থেকেই— ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে কিছু শরীরগত ফারাক বাদে আর কোনও প্রভেদ নেই, কারও দক্ষতা বা ক্ষমতাই লিঙ্গানুসারী নয়, এই কথাটি যদি বাড়িতে শিশুদের গল্পের ছলে বুঝিয়ে বলা যায়? পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর একেবারে ভিতে আঘাত করা যায় তবে। অথচ, অভিজ্ঞতা বলে যে, পুত্রসন্তানের মা-বাবাই হোন অথবা কন্যাসন্তানের, এই মৌলিক কথাগুলি উচ্চারণ করার বদলে অনেকেই পিতৃতন্ত্রের যুক্তিগুলোই গেঁথে দিতে থাকেন সন্তানের মাথায়। আবার, ধর্মও যে মানুষকে মূলগত ভাবে পৃথক করে না— কেউ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বলেই মন্দ হয়ে যায় না— এই কথাটিই বা ক’জন অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে বলেন? বর্ণব্যবস্থার বিষের কথাও কি সচেতন ভাবে সন্তানকে বুঝিয়ে বলেন, তার অন্যায্যতা চিনতে শেখান? অথবা, যে কোনও মাপকাঠিতে যিনি প্রান্তিক, তাঁর প্রতি সমানুভূতির কথা? যুদ্ধবিরোধিতার পাঠ দিয়েই নাহয় এই পরিবর্তনের সূচনা হোক, এবং তার পর খুলতে থাকুক এক-একটি আলোচনার পরিসর। সন্তানকে ভবিষ্যতের সুস্থ নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার দায়িত্বটি ক্রমশ অধিকতর সংখ্যক অভিভাবক নিজেদের হাতে তুলে নিন।

যে কথাগুলি শেখানো প্রয়োজন, এক কালে সে কথার একটি সহজ নাম ছিল— মূল্যবোধ। আরও অনেক কিছুর মতোই এই শব্দটিও বিদায় নিয়েছে নাগরিক পরিসর থেকে। কেবলমাত্র ক্ষুদ্র ব্যক্তি-স্বার্থের সাধনা মানুষকে আর সব কিছুই ভুলিয়ে দিয়েছে। ফলে, যে অভিভাবকরা সন্তানকে গল্পের ছলে সুশিক্ষা দেবেন, গোড়ায় তাঁরা এক বার যাচাই করে নিন যে, নিজেদের মূল্যবোধের কম্পাসটির অভিমুখ ঠিক আছে তো? কী ভাবে তা বোঝা সম্ভব, সে কথাও কিন্তু লৌকিক জ্ঞানেই রয়েছে। খুব সহজ কথায় বললে, অন্য কারও প্রতি নিজের অবস্থান স্থির করতে হলে প্রতি বার সর্বাগ্রে ভেবে নিতে হবে যে, ওই লোকটির জায়গায় যদি আমি থাকতাম, তা হলে আমি কোন আচরণ প্রত্যাশা করতাম? ঠিক সেই আচরণটিই তাঁর প্রতি করা বিধেয়। কারণ, আজকের ‘আমি’-টি যে ‘এই আমি’, তা নিতান্তই জন্মকালীন লটারির ফল— তাতে আমার কোনও নিজস্ব কৃতিত্ব নেই। লটারির ফল অন্য রকম হলে আমার জন্ম হতে পারত সেই ‘অপর’ হিসাবে, শুধুমাত্র এই কথাটুকু মনে রাখলেই মূল্যবোধ আপনি তৈরি হবে। দার্শনিক জন রলস তাঁর বণ্টনের ন্যায্যতার তত্ত্বে ব্যবহার করেছিলেন এই ধারণাটিই, যার পোশাকি নাম ‘ভেল অব ইগনোর‌্যান্স’। তত্ত্ব জানার দরকার নেই, কিন্তু সন্তানকে মূল কথাটি এখনই শিখিয়ে দেওয়া যায়, দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই।

আরও পড়ুন