Transgender Rights

অশনিসঙ্কেত

সারা বিশ্বেই এখন যৌন পরিচিতিকে ‘পুরুষ-নারী’ দ্বৈতের সঙ্কীর্ণতা থেকে বার করে এনে লিঙ্গপরিচিতি, যৌনপরিচিতির নির্ধারণে উদার, নমনীয়, সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাব গ্রহণ করা হচ্ছে।

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪৮
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

এ বার রূপান্তরকামীদের সুরক্ষার জন্য আইনের সংশোধন দেশকে পিছনের দিকে এগিয়ে দিল। ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) অ্যাক্ট, ২০১৯-এ যে পরিবর্তনগুলি আনল কেন্দ্র, তাতে রূপান্তরকামীদের মানবাধিকার খর্ব হল, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে গোপনীয়তার অধিকার খারিজ হল। নানা অপ্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া আরোপ করে তাঁদের বিপন্ন করল সংশোধিত আইন। আইন পেশ করার আগে যে রূপান্তরকামী, ভিন্ন লিঙ্গ-যৌনতার মানুষদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি, তাঁদের মতামত গ্রাহ্য করা হয়নি, তা অন্যায় হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। তিনটি কৃষক আইন, চারটি শ্রম বিধি যে ভাবে পাশ হয়েছে, তা দেশবাসী দেখেছেন। কেন্দ্র আইন পাশ করবে, এবং তার পর নাগরিক শুরু করবেন প্রত্যাহারের আন্দোলন, এটাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সংশোধনী বিলটি লোকসভায় পেশ হওয়ার পর তার প্রস্তাবগুলি প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রূপান্তরকামীরা সারা দেশে প্রতিবাদে নেমেছেন। তাঁদের ক্ষোভ অত্যন্ত সঙ্গত। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায় (নালসা বনাম ভারত সরকার) এবং ২০১৯ সালে রূপান্তরকামীদের অধিকারের সুরক্ষার আইন, দু’টিই স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে নিজের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে কেবল ব্যক্তির। এই সংশোধনী প্রস্তাব কিন্তু ব্যক্তির থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তার হাতে ধরাতে চায় রাষ্ট্রের ‘সার্টিফিকেট’। চিকিৎসকদের বোর্ড কয়েক ধাপে পরীক্ষা করে এক ব্যক্তিকে ‘রূপান্তরকামী’ বলে চিহ্নিত করবে, জেলাশাসক তা অনুমোদন করবেন, তবে সেই ব্যক্তি নিজেকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বলে দাবি করতে পারবেন। এই নিয়ম যত অপ্রয়োজনীয়, ততই অসম্মানজনক। ব্যক্তি-স্বাধীনতা, ব্যক্তির অধিকার খর্ব করে রাষ্ট্রের হাতে ব্যক্তির লিঙ্গ নির্ণয়ের ক্ষমতা টেনে আনার মধ্যে যে পুরুষতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক, অমানবিক মানসিকতা কাজ করছে, তা ভারতের সংবিধানকেও অসম্মান করছে।

এমন একটি আইন মানবাধিকার, লিঙ্গ-সাম্যের প্রশ্নে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য। সারা বিশ্বেই এখন যৌন পরিচিতিকে ‘পুরুষ-নারী’ দ্বৈতের সঙ্কীর্ণতা থেকে বার করে এনে লিঙ্গপরিচিতি, যৌনপরিচিতির নির্ধারণে উদার, নমনীয়, সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাব গ্রহণ করা হচ্ছে। লিঙ্গ-যৌনতায় বৈচিত্রের প্রকাশকে অবদমিত করা, অপ্রচলিত যৌনতাকে অস্বীকার করার সাবেক মনোভাব আজ কোনও গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যাশিত নয়। আইনত লিঙ্গ নির্ধারণ কী ভাবে হবে, সে বিষয়ে নানা দেশে আদালতের রায়েও তার প্রতিফলন ঘটেছে। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের নানা আদালত স্পষ্ট করেছে যে আইনত লিঙ্গ নির্ধারণের কোনও ফর্মুলাবদ্ধ সমাধান থাকতে পারে না। লিঙ্গপরিচিতি রয়েছে ব্যক্তির আত্মপরিচিতির একেবারে কেন্দ্রে। কোনও ব্যক্তির জীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা, তাঁর মনোজগৎ, নিজের সম্পর্কে তাঁর যা দৃষ্টিভঙ্গি, এ সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনত সেগুলিকে মূল্য দিতে হবে। সেই সব সিদ্ধান্তকে বিবেচনায় রেখেই বিচারপতি কে এস রাধাকৃষ্ণন ‘নালসা’ মামলায় স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ব্যক্তির যৌনপরিচয় নির্ধারণ করার জন্য কোনও পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিই নির্ধারণ করবেন তাঁর লিঙ্গপরিচয় কী।

সংশোধিত আইন তার বিপরীতে হাঁটছে। মেডিক্যাল বোর্ড এবং জেলাশাসকের অনুমোদন না-পেলে কেউ নিজেকে ‘রূপান্তরিত’ বলে দাবি করতে পারবেন না। তৃতীয় লিঙ্গের যৌনপরিচয়কেও নয়া আইন সঙ্কীর্ণ করতে চেয়েছে ‘হিজড়া’ ‘কিন্নর’ ‘ইন্টার সেক্স’ এমন নানা বিভাগে। চিকিৎসক এবং রোগীর ভিতরে গোপনীয়তার শর্তকে খর্ব করে রাষ্ট্র দাবি করছে যে রূপান্তরিত হওয়ার অস্ত্রোপচারের প্রতিটি ঘটনা জানাতে হবে সরকারকে। তবে কি ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ও অধিকার সবই নস্যাৎ করে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যক্তিজীবনে প্রসারিত করতে চায় কেন্দ্র?

আরও পড়ুন