রাজ্যের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, অতঃপর ৫১টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (আইটিআই) বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার জোর দিচ্ছে শিল্পক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কর্মিবর্গ তৈরি করার দিকে— ফলে, শিল্প কারিগরি শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে দ্রুত উন্নয়ন প্রয়োজন। বেসরকারি পুঁজি সেই কাজটি করবে। সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানোই বিধেয়। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রটিতে বেসরকারি পুঁজির গুরুত্ব বিপুল। তার প্রধানতম কারণ, সে পুঁজি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক বেশি তৎপর, ফলে বাজারের প্রয়োজন অনুসারে প্রশিক্ষণের অভিমুখ নির্ধারণের কাজটি বেসরকারি হাতে অনেক দ্রুততর হয়। পশ্চিমবঙ্গ এখন শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখছে। দীর্ঘ খরার পরে সত্যিই যদি এ রাজ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে থাকে, তবে বিপুল সংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন ঘটবে— রাজ্যের বর্তমান প্রশিক্ষণ পরিকাঠামোয় তত কর্মীর জোগান দেওয়া অসম্ভব। কাজেই, কী ধরনের কাজে কোন সময়কালে কত কর্মী প্রয়োজন হবে, বাজার যদি সেই হিসাব কষে শিল্প-প্রশিক্ষণে পুঁজি লগ্নি করে, তাতে যুব সম্প্রদায়ের লাভ।
শিল্পক্ষেত্রে দীর্ঘকালীন স্থবিরতা এ রাজ্যের যুব সম্প্রদায়কে হতাশ করেছে। তাঁরা এই বিশ্বাস হারিয়েছেন যে, যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারলে লাভজনক কর্মসংস্থান সম্ভব। কাজেই, আইটিআই-গুলিকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলেই দায়িত্ব ফুরোবে না— তরুণ প্রজন্মের মনে আস্থা ফেরানোর কঠিন কাজটিও সরকারকে করতে হবে। তরুণ সম্প্রদায়কে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে কাজের দুনিয়ায় উথালপাথাল ঘটেছে— বহু পরিচিত, উচ্চ আয়সম্পন্ন কাজ ইতিমধ্যেই কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে, আরও অনেক কাজের ভবিষ্যৎ তেমনই। কিন্তু, এই আবহেও যে কাজগুলির গায়ে তেমন আঁচড় লাগেনি, পরিভাষায় তাকে বলে ‘ব্লু-কলার জব’, অর্থাৎ যে কাজে কায়িক শ্রমের ভূমিকাই প্রধান। শুধু নতুন শিল্পক্ষেত্রেই নয়, কারিগরি প্রশিক্ষণ এ রাজ্যের তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রচলিত ক্ষেত্রগুলিতেও নতুন কাজের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এবং, তা রাজ্যের ভৌগোলিক পরিধিতে সীমিত থাকবে না— প্রশিক্ষিত ব্লু-কলার কর্মীর চাহিদা এই মুহূর্তে বৈশ্বিক। সেই সুযোগের জন্য নিজেদের তৈরি করার কথা ভাবতে পারে পশ্চিমবঙ্গের যুব সম্প্রদায়।
তবে, আইটিআই বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারকে একটি অন্য কথাও ভাবতে হবে। যাঁরা এমন কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তাঁদের একটি বড় অংশই তুলনায় অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল পরিবার থেকে আসেন। ফলে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠগ্রহণের খরচ যদি তাঁদের সাধ্যের অতীত হয়, তবে উন্নয়নের গোটা পরিকল্পনাটিই ভেস্তে যেতে পারে। উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কাজটিতে বেসরকারি পুঁজির সঙ্গে সরকারের যৌথ অংশীদারি থাকবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কর্তব্য হবে, আর্থিক ভাবে দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের জন্য পড়ার খরচ সামর্থ্যের মধ্যে রাখা। সব ছাত্রছাত্রীর জন্য যদি পড়ার খরচ কম রাখা সম্ভব না-ও হয়, আর্থিক ভাবে দুর্বলদের জন্য প্রয়োজন-ভিত্তিক স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা যায়। নতুন জমানার সুযোগে যেন কেউ বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।